জনগণের স্বার্থের পক্ষে সম্মতি তৈরি
করবে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য
পোস্টের তারিখঃ ০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশ ও জনগণের প্রতিটি গভীর সংকটের মুহূর্তে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁরা উচ্চারণ করেছেন প্রতিবাদের ভাষা, হয়ে উঠেছেন জনগণের কণ্ঠস্বর। কিন্তু চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সেই ঐতিহ্যের এক বেদনাদায়ক ব্যত্যয়ও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান ধারা হিসেবে পরিচিত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতারা আন্দোলনকারী জনতার পাশে না দাঁড়িয়ে শাসক দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার যখন কারফিউ জারি করে দেশের মানুষকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, যখন ‘দেখামাত্র গুলি’র নির্দেশে হত্যার উৎসব চলছিল, তখন এই সংস্কৃতিনেতাদের কেউ কেউ সেই কারফিউকে স্বাগত জানিয়ে কার্যত হন্তারকদের পক্ষেই অবস্থান নেন।
অথচ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের জন্ম হয়েছিল সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই সময় দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা সাহসী ও সংগঠিত ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান সংগঠন হিসেবে জোটটি জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর একটি দল আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
এই বিচ্যুতি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গৌরবময় ধারার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ এবং পরবর্তী সময়ে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (IPTA)সহ অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মকাণ্ড কেবল সাহিত্য, সংগীত বা নাট্যচর্চায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থেকে তারা জনগণের পক্ষে ভূমিকা পালন করেছিল। সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার থেকেই উদীচীসহ অন্যান্য সংগঠন শেখ হাসিনার শাসনামলের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নিজ নিজ ব্যানারে নানা কর্মসূচি পালন করে।
এক পর্যায়ে ৩১টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ২০২৩ সাল থেকে ‘প্রতিবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ’ নামে ঐক্যবদ্ধ হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, গুম-খুন-নির্যাতনের অবসান, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে এবং ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা ধারাবাহিক আন্দোলন পরিচালনা করে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা সরকারের হত্যা-নির্যাতনসহ চরম ফ্যাসিবাদী তৎপরতার এক পর্যায়ে কারফিউ জারি হলে ২৬ জুলাই প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদী গানের মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই মোর্চাই প্রথম কারফিউ ভঙ্গ করে। ৩০ জুলাই নূর হোসেন চত্বর থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত গানের মিছিল জনমনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর ২ আগস্ট ‘দ্রোহযাত্রা’ সরকার পতনের আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে ওঠে। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। দীর্ঘ ১৫ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে।
মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও সংস্কৃতির দায়
পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক দ্বি-জাতি তত্ত্ব এবং শোষণ-বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছিল, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও তার বাস্তবায়ন ঘটেনি। বরং বহু ক্ষেত্রে দেশ পরিচালিত হয়েছে তার বিপরীত ধারায়।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে সীমাহীন দুর্নীতি, লুটপাট, স্বজনপ্রীতি, গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং সামরিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ফলে শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের একটি বড় অংশ ক্রমে হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সেই বোধের প্রতিফলন ঘটেছে সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রের নানা মাধ্যমে। লেখক-শিল্পীরা বারবার হয়ে উঠেছেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।
কিন্তু লেখক-শিল্পীদের একটি অংশ যখন সরকারি ভাষ্য কিংবা শাসকগোষ্ঠীর মহাত্ম প্রচারে নিজেদের নিয়োজিত করেছে, তখন শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে জনগণের মধ্যে একটি ভুল বার্তা তৈরি হয়েছে। মানুষ শিল্পীদের আপনজন হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাদের শত্রু হিসেবে ভাবতে প্ররোচিত হয়েছে। এই সুযোগে স্বাধীনতা ও প্রগতিবিরোধী শক্তি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে।
বাউল সংগীত ও বাউল শিল্পীদের ওপর আক্রমণ আজকের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর শিকড় গভীরে, ইতিহাসও দীর্ঘ। শেখ হাসিনার শাসনামলে রাজবাড়ীর পাংশায় বাউলদের চুল, দাড়ি ও গোঁফ কেটে দেওয়ার বর্বর ঘটনা এখনো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে একের পর এক বাউল নিপীড়নের ঘটনা। প্রায় দুই দশক ধরে যাত্রাপালা যেন একরকম নিষিদ্ধই হয়ে আছে।
অথচ বাউলগান, যাত্রাপালা কিংবা লোকজ সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়, এগুলো আমাদের মাটি, মানুষের জীবন, লোকায়ত দর্শন এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য উত্তরাধিকার।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই বছরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছিল। দেশের শতাধিক মাজার ও দরগায় প্রকাশ্য হামলা হয়েছে। বাউলগান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উদীচী, ছায়ানটসহ সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ও আক্রমণের শিকার হয়েছে। নৌকাবাইচের মতো বাংলার প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর আয়োজন ও উৎসবও প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে। কয়েকটি স্থানে সিনেমা প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একটির পর একটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে— বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতি আজ গভীর ও সুপরিকল্পিত আক্রমণের মুখোমুখি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক তৎপরতা। নদী ও সমুদ্রবন্দর বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া, অসম বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া দেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড় ও সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর ওপর নিপীড়নও অব্যাহত আছে।
এই সংকটের সময়ে নীরব থাকার আর কোনো অবকাশ নেই। আঘাত লেগেছে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক অস্তিত্বে। তাই এই লড়াই শুধু বাউলদের নয়, শুধু শিল্পীদেরও নয় এটি সব লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর সম্মিলিত লড়াই।
এই দুঃসময়ে অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও মুক্ত সংস্কৃতির পক্ষে আমাদের একই কণ্ঠে দাঁড়াতে হবে। সেই সম্মিলিত প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য। উদীচী, চারণ, বিবর্তন, প্রগতি লেখক সংঘসহ ত্রিশটির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন এই ঐক্যের পথে সমবেত হয়েছে।
আমরা বিশ্বাস করি, সংস্কৃতির ওপর নেমে আসা অন্ধকার প্রতিরোধ করতে পারে মানুষের ঐক্য, শিল্পের শক্তি এবং মুক্তচিন্তার দুর্জয় সাহস। বাংলার মাটি থেকে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রতা ও সাংস্কৃতিক দমন-পীড়নের অন্ধকার সরিয়ে মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী বাংলাদেশের স্বপ্নকে আবার জাগিয়ে তুলতে হবে।
এ কথা মনে রাখা জরুরি— শুধু শেখ হাসিনার শাসনামলেই নয়, তার আগের সরকারগুলোর সময়েও রাষ্ট্র ও সমাজে কর্তৃত্ববাদী এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার নানা প্রবণতা শক্তি সঞ্চয় করেছে। আজ সেই প্রবণতাগুলো নতুন রাজনৈতিক পরিসরে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যে বীজ একসময় বপন করা হয়েছিল, তাকে যদি প্রশ্রয় ও রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া না হত, তবে তা একদিন এমন এক বিষবৃক্ষে পরিণত হতে পারত না।
একটি কনসার্ট নিরাপদে অনুষ্ঠিত হওয়া যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি ঈদে মিলাদুন্নবীসহ যে কোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নির্বিঘ্নে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। কোনো অনুষ্ঠান কিংবা সংস্কৃতিচর্চাকে ভয়, হুমকি বা চাপের মুখে পড়তে দেওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বর্তমান সরকারের প্রতি তাই আমাদের প্রশ্ন স্পষ্ট, আপনারা যদি আওয়ামী লীগ সরকারের মতো ধর্মীয় উগ্রপন্থী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করতে চান, সেটি আপনাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই সমঝোতার মূল্য যেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ এবং সাংস্কৃতিক অধিকার দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়। রাষ্ট্র কারও একার নয়। বাংলাদেশ কোনো একটি মত, সম্প্রদায় কিংবা রাজনৈতিক শক্তির একচ্ছত্র সম্পত্তিও নয়।
আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মসজিদের আজান যেমন নির্বিঘ্নে ধ্বনিত হবে, তেমনি মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, মাজার ও আখড়াতেও মানুষ নিরাপদে তার বিশ্বাস পালন করতে পারবে। যেখানে বাউল গান গাইতে ভয় পাবেন না কোনো শিল্পী। মঞ্চে উঠতে আতঙ্কিত হবেন না কোনো শিল্পী, আর ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কাউকে নিপীড়নের শিকার হতে হবে না।
বাংলার মাটি থেকে তাই সব ধরনের ফ্যাসিবাদ, সাম্প্রদায়িক আধিপত্য ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে গড়ে তুলতে হবে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ। এই লড়াই মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, সহাবস্থান এবং একটি বহুত্ববাদী বাংলাদেশের পক্ষে।
সেই লক্ষ্যেই আগামী ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দেশের নানা প্রান্ত থেকে লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা জাতীয় কনভেনশনে সমবেত হবেন শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালা মিলনায়তনে। এই কনভেনশন হবে শুধু একটি সমাবেশ নয়, এটি হবে দুঃসহ বর্তমান থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক জাগরণের নতুন সংগ্রামের সূচনাক্ষণ।
এই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা আবারও হয়ে উঠবেন শোষণ-বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ নির্মাণের সহযাত্রী এবং আপসহীন যোদ্ধা।
লেখক : আহ্বায়ক, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী