ট্রেড ইউনিয়ন কী এবং কেন?

Posted: 06 সেপ্টেম্বর, 2026

ট্রেড ইউনিয়ন সম্পর্কে জানতে হলে প্রথমে শ্রম সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা থাকা প্রয়োজন। শ্রম হলো মানুষের শারীরিক ক্ষমতা যা মানুষ উৎপাদনের কাজে ব্যয় করে। পুঁজিবাদী সমাজে অন্যান্য পণ্যের মতো শ্রমও বাজারে কেনা বেচা হয়। পুঁজিপতিরা উৎপাদনের প্রয়োজনে জমি, কারখানা ও কাঁচামালের মতো শ্রম শক্তিকেও কেনে। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রম শক্তি বিক্রি করার মতো যেমন লোক থাকে তেমনই ক্রয় করার লোকও থাকে। জমি, কারখানা, কাঁচামাল কোন পণ্যই মালিকের জন্য মুনাফা সৃষ্টি করতে পারে না। তাই পুঁজিপতিরা শ্রমিকের শ্রম নির্দিষ্ট মজুরি দিয়েই ক্রয় করে। কেন ক্রয় করে? ক্রয় করে কারন- মালিকের কারখানায় শ্রমিক যদি ৮ ঘণ্টা কাজ করে তার মধ্যে হয়ত: ৪ ঘণ্টা কাজ করে নিজের জন্য, অতিরিক্ত ৪ ঘণ্টা কাজ করে মালিকের জন্য। শ্রমিক মালিকের জন্য যে ৪ ঘণ্টা শ্রম দেয় তাই হলো বাড়তি শ্রম। বাড়তি শ্রম যে বাড়তি মূল্য সৃষ্টি করে সেটাই হলো উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus value)। পুঁজি হলো বিকশিত শ্রম। পুঁজিপতিরা রক্ত চোষা বাদুরের মতো। এরা শ্রমিকের শ্রমকে শোষণ করেই কেবল বাঁচে। আমরা কমিউনিস্টরা শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার উচ্ছেদ ঘটিয়ে শোষণহীন একটা সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে চাই। সেটার নাম সমাজতন্ত্র। ‘এ লক্ষ্যেই কেবল কমিউনিস্টরা ট্রেড ইউনিয়ন করে। সুতরাং অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নের সাথে কমিউনিস্টদের ট্রেড ইউনিয়নের মৌলিক পার্থক্য আছে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নিয়ে কি ভাবে ট্রেড ইউনিয়ন করা উচিত তা জানতে হলে প্রথমেই সমাজ বিকাশের ইতিহাস জানা প্রয়োজন। এক সময়ে মানুষ পশু, পাখি শিকার করে জীবন রক্ষা করত। শিকার ছাড়া বলতে গেলে মানুষ কোন কাজই জানত না। ধীরে ধীরে প্রয়োজনের তাগিদে মানুষই সমাজের অগ্রগতি ঘটায়। আদিম সাম্যবাদী সমাজে মানুষে মানুষে কোন বিভেদ ছিল না। পাথর দিয়ে শিকার করতে করতে অস্ত্রের আবিষ্কার হয়। অস্ত্রের উন্নতির সাথে সাথে দেখা গেল এক জনের পরিশ্রমের ফল অধিক জনে ভোগ করতে পারে। সমাজে সৃষ্টি হয় উদ্বৃত্তের। ফলে সমাজে অন্য একটা শ্রেণির সৃষ্টি হয়। এক সমেেয় শ্রেণিভেদের স্থরে এসে যায় সমাজ। সাম্যবাদী সমাজ অনেক দিন টিকে থাকে। উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাজের বিভিন্ন রূপ প্রকাশিত হয়। আদিম সাম্যবাদী সমাজ বিলুপ্তির সাথে সাথে দাস প্রথা ও দাস সমাজের আবির্ভাব ঘটে। রাজা, মহারাজা, ধর্ম ও পুরোহিতের সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে বহু দাস বিদ্রোহের কথা আমাদের জানা আছে। দাস সমাজে মানুষই দাস। দাস হিসাবে বেচা কেনা হতো মানুষ। এরপর সৃষ্টি হয় সামন্ত সমাজ। সামন্ত সমাজে রাজা, মহারাজারা সমস্থ ভুমির মালিক। দাসেরা এখন ভূমি দাস। জানা যায় ফ্রান্সে সামন্ত প্রভুরা তাদের জায়গায় মাটিতে গর্ত করে ঘাস দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখত। মানুষ গর্তে পড়লে মানুষের বোঝাই করা সামগ্রিও মাটিতে পড়ে যেত। মাটিতে পড়া সবকিছুর মালিক হতো সামন্ত প্রভু। ইংল্যান্ডে প্রথমত: শিল্পের বিকাশ হয়। ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হয় ষোড়শ শতাব্দীতে। রাজা ক্ষমতায় থাকলেন বটে কিন্তু এই বিদ্রোহের কারণে পার্লামেন্ট গঠনের মতো অবস্থা হয়। পার্লামেন্টে শিল্প মালিক তথা বুর্জোয়ারা নিজেদের পক্ষে আইন তৈরি করতে সমর্থ হয়। কৃষকদের নিজ ভুমি থেকে উৎখাত করা হয়। তারা সমুদ্রের উপকুলে যেতে বাধ্য হয় এবং বাধ্য হয়ে মৎসজীবী হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় বেকার মানুষের। তাদের বাঁচার কোন উপায় নেই- তারা সর্বহারা”। ইংল্যান্ডের লোকেরা প্রথমে করতো জল দস্যুতা। পরে তারা দেশ জয় করতে শুরু করে। ইংল্যান্ডের ব্যবসায়ীরাই প্রথমে বাজারে কাঁচের আয়না নিয়ে আসে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন রাজদরবারে গিয়ে সোনার সাথে কাঁচের আয়নার বিনিময় করতো। ইংল্যান্ডে প্রথমে সুতা বানানোর শিল্প সৃষ্টি হয়। একের পর এক কারখানা বাড়তে থাকে। দাঁড়িয়ে যায় পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা। শ্রমিকদের একটানা ১৮/১৯ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। শ্রান্ত শরীরে যখন ঘুম আসতো তথা মালিকের লোকেরা লোহার ডান্ডা দিয়ে পিটিয়ে শ্রমিকের ঘুম ভাঙাতো। অত্যাচার নির্যাতনে অনেক শ্রমিক মারাও যেতো। শ্রমিকেরা ভাবত মেশিন বা যন্ত্রগুলোই তাদের দুরাবস্থার কারণ। কৃষক জীবনই তাদের জন্য ভালো ছিল। শুরু হলো মেশিন ভাঙার আন্দোলন। লুড্ নামে এক ব্যক্তি নেতৃত্ব দেওয়ার কারনে ইতিহাসে এই আন্দোলনের নামকরন হয় “লুডাইট মুডমেন্ট”। তবে ইতিহাসে এই নামে কোন ব্যক্তি ছিলেন কিনা তাও সন্দেহ আছে। অভিজ্ঞতা তাদের শিক্ষা দিল এই ভাবে শ্রমিক শ্রেনীর মুক্তি আসবে না। তবে এটাই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণির প্রথম আন্দোলন। চাটিস্ট মুভমেন্ট চার্টার অব ডিমান্ড (দাবিনামা) থেকে চার্টিস্ট আন্দোলন। ১৮৩০ সাল থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই আন্দোলন চলে। চার্টিস্ট আন্দোলনে জনগনের দাবিও সামনে আনা হয়। শ্রমিকেেদর শ্রমঘণ্টা কমানো ও অন্যান্য দাবির সাথে জনসাধারণের ভোটের অধিকার, পার্লামেন্টে প্রতিনিধি পাঠানোর ব্যবস্থাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দাবিও ছিল। তখনকার দিনে নারী ও শিশুরাই প্রধানত: শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। ইতিহাসে প্রথম শ্রমিকদের দাবি আদায় হলো যে শিশু ও নারীরা ১০ ঘণ্টার অধিক কাজ করবে না। শ্রমিক শ্রেণিকে মালিকের বর্বরোচিত নির্যাতন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অনেক দার্শনিক, কল্পনাবিদ, সহৃদয় ব্যক্তি নানা ভাবে চিন্তা ও চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মতবাদ হলো ইউটোপিয়া মতবাদ। তাদের অনেকে ভাবতেন প্রত্যেককে সমানভাবে ভোগ করতে হবে। শ্রমিকেরাই উৎপাদন করে। সারা বিশ্বেই ভগবানের রাজত্ব। কতকগুলো খারাপ লোক খারাপ কাজ করতেছে। তাদের বুঝাতে হবে। এমনই একজন মহান ব্যক্তি ছিলেন রবার্ট ওয়েন (ইংল্যান্ড)। তাঁর একটি সুতা কারখানা ছিল। তিনি তার কারখানা শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তিনি মনে করছিলেন তাঁর মতো অন্যরাও দেবে। কিন্তু কেউ দিল না। তাঁর কারখানা ফেল করল। তিনি দেখলেন যে শ্রমিকের জন্য তিনি ত্যাগ করলেন তারাও কাজে ফাঁকি দেয়। তিনি মনে করলেন ইউরোপের মানুষ খারাপ হয়ে গেছে। মনের দুঃখ নিয়ে তিনি চলে গেলেন আমেরিকায়। সেখানেও দেখলেন একই অবস্থা। প্যারিসের ভালো মানুষের দলের কথাও বলা যায়। ১৮৩৬ সালে প্যারিসে “লীগ অব জাস্ট” নামে একটি দল গঠিত হয়েছিল। তারা মনে করতো মালিক শ্রেণির হৃদয় পরিবর্তন করতে হবে। তাদের বোঝালেই তারা বুঝবে। কিন্তু না! চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। শ্রমিকের জন্য সামান্য সহানুভূতিও মিলল না। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যতই দাবি আদায় হোক না কেন শ্রমিক শ্রমিকই থেকে যায়। মালিক মালিকই থেকে যায়। দাস সমাজে যারা ছিল দাস সামন্ত সমাজে তারা ছিল ভূমি দাস। পুঁজিবাদী সমাজে তারা হয়ে যায় শ্রম দাস। এর অর্থ হলো ধনবাদী সমাজ রেখে আমি আন্দোলন করছি। দাবী আদায়ের আন্দোলন মূলত: ইংল্যান্ডেই বেশি হয়। ফ্রান্সে আবার আন্দোলনের অন্য মোড় নেয়। ফ্রান্সের চিন্তাবিদরা চিন্তা করলো মালিক থাকলে যতই আন্দোলন করা হোক না কেন শ্রমিক শ্রেণির দুঃখ কষ্ট ঘুচবে না। তাদের চিন্তা হলো শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব কায়েম করতে হবে। ১৭৬০ সালে ফরাসি দেশে “বাবুক নামে এক ব্যক্তি চিন্তা করলো শ্রমিক শ্রেণিকে রাজত্ব দখল করতে হবে। (Dictetor Ship of poor) তিনি ভাবলেন গরিবদের মধ্যে সকলে আন্দোলন করবে না। এদের মধ্যে বাছাই করে গোপন দল করতে হবে। গোপন দল নিয়ে কোন একদিন হঠাৎ আক্রমণ করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে হবে। কিন্তু গোপন খবর গোপন থাকল না। তার ফাঁসি হয়ে গেল। শ্রমিকদের দুর্দশা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্নজন দুশো বছর ধরে চেষ্টা করেছেন। এমন চিন্তা এসেছে সমাজে যারা শ্রম দেয় তারাই কেবল ভোগ করবে। কিন্তু তারা বৈজ্ঞানিক কোন পথ বের করতে পারে নি। ১৮১৮ সালে ও ১৮২০ সালে জার্মানীতে কাল মার্কস ও এঙ্গেলস নামে দুই মহা মনীষী জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সেই তারা আনুষাঙ্গিক সব কিছুই ভাবতে শুরু করেন। তারা যে মতবাদ সৃষ্টি করেন তার নাম হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক মতবাদ। এই দুই মনীষী লুড’ এর কারখানা কারখানা ভাঙার আন্দোলন নয়, ওয়েনের নিজের কারখানা বিলিয়ে দেওয়া নয় বা “বাবুক” এর হঠাৎ আক্রমণে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হটকারী চিন্তাও নয়। তাঁদের চিন্তার বিষয় হলো বারে বারে কেন একটা শ্রেণি ধনী হচ্ছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজে কারো উপর কারো শোষন নির্যাতন ছিল না। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের উপর মানুষের শোষণ থাকলেও জীবন মান অনেক উন্নত হয়েছে। মার্কস এঙ্গেলস ভাবলেন শোষণের জন্য উৎপাদন যন্ত্র দোষী নয়। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে যে সমাজে যারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তারা ভোগ করতে পারবে। কোন ব্যক্তির ভাল মানুষী বা শুভ ইচ্ছার দ্বারা শোষিত শ্রেণির মুক্তি আসবে না। কলকারখানা মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন করে। ঐক্যবদ্ধ, সচেতন ও সংগঠিত শক্তি দ্বারাই কেবল শ্রমজীবী মানুষের মু্িক্ত সম্ভব। মার্কসের শিক্ষা হলো কোন রাজা, কোন নেতা, কোন বীর শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি এনে দিতে পারবে না। শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই আনতে হবে। এখানেই অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নের সাথে বিপ্লবী ট্রেড ইউনিয়নের পার্থক্য। মার্কস এঙ্গেলস এর চিন্তা অনুযায়ী শ্রমিকেরা এক প্রকার দাস। এক কারখানায় চাকুরি ছেড়ে দিলে অন্য কারখানায় চাকুরি করতে হবে। কারখানার মালিক যতদিন থাকবে ততদিন শ্রমদাস বা মজুরও থাকবে। মজুরি বাড়ানোর আন্দোলন আমরা করবো বটে তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো মজুরি দাসত্ব ঘোচানো। পাখি বাঁশের খাঁচায় থাকলেও বন্দি, পাখি সোনার খাঁচায় থাকলেও বন্দি। আমাদের কাজ হলো শ্রমিকদের বোঝানো যে— তোমার মুক্তির জন্য তোমাকে কাজ করতে হবে। তোমাকে সংগঠিত হতে হবে। তোমাকে সচেতন হতে হবে। হ্যাঁ। সচেতন করার দায়িত্বটা নিতে হবে কমিউনিস্টদের। ওপর থেকে নয়, শ্রমিকদের সঙ্গে থেকে, শ্রমিকদের লড়াইয়ে অংশ নিয়ে, শ্রমিকের দরদি বন্ধু হয়ে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। (চলবে) লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি