সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যাচারের
বিরুদ্ধে সংগ্রাম
Posted: 23 আগস্ট, 2026
বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যম প্রচারের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ডিজিটাল ইনসাইটস রিপোর্টের তথ্য মতে বাংলাদেশে ২০২৬ সালে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ৬৯ লাখ। এই মাধ্যমের বিশাল শক্তিকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী যুগান্তসৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি অনেক বিপথগামী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নানা সময়ে নেতিবাচকভাবে এর ব্যবহার করে, মিথ্যাসংবাদ প্রচার করে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমাগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে চলেছে। গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে বেশ কিছু বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক, ঘৃণামূলক কনটেন্ট প্রচার করে সমাজের মধ্যে নানা ধরনের অরাজকতা তৈরি করার বেশ কিছু ঘটনা ঘটে আসছিল। এ সকল ঘটনার প্রধান শিকার ছিল সংখ্যালঘু মানুষ এবং সমাজের অবহেলিত জনগণ। এ সময়ে অনেক নিরপরাধ মানুষকে সাজা পেতে হয়েছে, বহু ঘর-বাড়ি, দোকান, প্রতিষ্ঠান হিংসার আগুনে পুড়েছে। তখন একটি ঘটনারও বিচার হয়নি।
গণঅভ্যুত্থানের সময় এই মাধ্যমটির ব্যাপক ব্যবহার গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে, একইসাথে গণঅভ্যুত্থানের পর পরই সমাজের সুবিধাবাদী বিপথগামী দুর্বৃত্তপরায়ন কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের হাতে এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল যা গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে রীতিমতো ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। তৎকালীন ইনটেরিম সরকার এ অবস্থার কোনো প্রতিকার করতে পারেনি, এমনকি কখনো কখনো এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ দেখা গেছে যেখানে মনে হয়েছে যে, সরকার ইচ্ছে করেই ঘটনা ঘটতে দিয়েছে। ফলে অবস্থা দিন দিন জটিল হয়ে জনগণের সহ্যের বাইরে চলে যেতে থাকে। সাধারণ মানুষ দ্রুত নির্বাচন প্রত্যাশা করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে পূর্বের মতোই একটি মধ্যডানপন্থি জোট সরকার গঠন করেছে এবং ডানপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধাপরাধী জোট বিপুল ক্ষমতা নিয়ে বিরোধী আসনে বসেছে। এখন দেশের জন্য এমন এক নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যা স্বাধীনতার পর আর দেখা যায়নি। এতোদিন বাম, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে লড়াই করতে হয়েছে যে কোনো সরকারের গণবিরোধী নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে, এখন সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় লড়াই করতে হবে সরকারের গণবিরোধী নীতি এবং বিরোধীদলের সাম্প্রদায়িক, গণবিরোধী, নারী-শিশু বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। কাজেই সময়টা খুবই জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হলে প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক সকল রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী, ব্যক্তির ডাবল মার্চ করার কোনো বিকল্প নেই।
বামপন্থিরা আদর্শিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। বামপন্থি রাজনীতি তার রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে সুস্পষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়। মানুষে মানুষে বিভেদ, অসাম্য, বৈষম্য দূর করে সমতার সমাজ ও মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা বামপন্থিদের অবশ্য কর্তব্য। এটি পালন করা কোনো সহজ কাজ নয়। দিনের পর দিন লেগে থেকে গণমানুষকে জাগিয়ে তুলতে হয়। কোনো শর্ট কাট পথে এটি অর্জন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ সংস্কৃতির দেশে পরকালের ভয় দেখিয়ে, জিন-ভূত, দৈত্য-দানবের গল্প শুনিয়ে খুব সহজেই মানুষের মন জয় করা যায়। ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমাগত এ কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করছে। সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয় যা কিছু ঘটে সবই সৃষ্টিকর্তার ইশারায়। মন্দ ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিলে আজীবন কষ্ট সহ্য করতে হবে। কপালের লিখন খণ্ডন করা যায় না। মানুষের সমস্ত সুখ রয়েছে পরজগতে।
এসব বিশ্বাস মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র বদলের চিন্তা থেকে দূরে রাখে। মানুষের মধ্যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অনুভূতি মরে যায়। মানুষ যখন বর্তমান ব্যবস্থায় বিচার পায় না উপায় না পেয়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আশ্রয় খোঁজে। এতোবড় একটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া রাষ্ট্রের মানুষদের তাদের প্রতি ঘটে যাওয়া নির্মম অত্যাচারের ইতিহাস ভুলে যাবার কথা ছিল না। মানুষের আশ্রয় খোঁজার কথা ছিল বাম প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে। কিন্তু তাতো হয়ইনি বরং মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার মতো বিরাট এক গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছে এদেশে।
বর্তমান অবস্থায় হতাশ হয়ে অনেকে সামাজিক মাধ্যমে আগেই ভালো ছিলাম বা বামপন্থিদের একাংশ এই আন্দোলনে না গেলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতো বলে এখনো হা-হুতাশ করছেন। এক শ্রেণির মানুষ সামাজিক মাধ্যমে ক্রমাগত পরিকল্পিতভাবে বামপন্থিদের সম্পর্কে মিথ্যাচার করে চলেছে এবং হাসিনার আমলকে মহিমান্বিত করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে আটশতাধিক মানুষের প্রাণহানিতে হাসিনা সরকারের কোনো দায় তারা স্বীকার করে না। তাদের জন্য সবিনয়ে বলতে চাই হাসিনার দীর্ঘ অপকর্মই মানুষকে মাঠে নামিয়েছিল এটাই সত্য। হাসিনা অপকর্ম না করলে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নামতো না। এটা মনে রাখা দরকার এই গণঅভ্যুত্থান ছিলো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলন। একথাও মনে রাখা দরকার প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো সকল শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতার পর থেকেই ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়েছে। সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত থাকায় তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পেরেছে।
ইতিমধ্যে গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পার হয়েছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের শক্তিবৃদ্ধি ও শক্তিসংহত করতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থি দলের সাথে যুক্ত দায়িত্বশীল অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানো বিভিন্ন কন্টেন্ট বুঝে না বুঝে নিয়মিত শেয়ার করে সময় পার করছেন। মাঠের কাজকে গুরুত্ব না দিয়ে বা অবহেলা করে সামাজিক মাধ্যমে সময় কাটালে তার ফল কখনোই ভালো হবে না। বামদলগুলোর মধ্যে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুধু বামবিরোধী প্রচারণায় মেতে উঠেছে তাই নয়, একই সাথে তারা আওয়ামী-বয়ান তৈরি করছে।
আমাদের দেশে মানুষ স্থিতিশীলতা চায় ঠিকই কিন্তু সেক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক পন্থায় তা আসবে নাকি স্বৈরাচারী পন্থায় আসবে তা নিয়ে উদাসীন থাকে। নিজেদের সক্রিয় ভূমিকার ব্যাপারেও নাগরিকেরা আগ্রহী থাকে না। এ পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণের জন্য কোনো শুভ লক্ষণ নয়। কথায় কথায় প্রজন্মকে দোষ দিয়ে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে থাকা কোনো কাজের কথা নয়।
একথা ঠিক এই অভ্যুত্থান রাষ্ট্র বদলের এক ঐতিহাসিক সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলে না শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সুসংগঠিত প্রতিশ্রুতিশীল প্রগতিশীল শক্তির অনুপস্থিতিতে এই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন মানেই সমাজ-অর্থনীতির মৌলিক পরিবর্তন নয় এবং এই দুই ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া সমাজে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।
অনেকেই ইন্টেরিম আমলে মাত্রাতিরিক্ত মব সন্ত্রাস, শিক্ষকদের ওপর হামলাসহ যা যা ঘটেছে তার সাথে পূর্বের বাস্তবতার মিল তারা খুঁজে পান না। ২০২২ সালের জুলাইতে নড়াইলে, ২০১৬ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জে শিক্ষকের গলায় জুতোর মালা পরানোর ঘটনা, ২০২১ সালের মার্চে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত একাডেমি ধূলিসাৎকরণ, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শরিয়ত সরকার বয়াতীর গ্রেফতার হওয়া বেমালুম ভুলে বসে আছেন। এসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। একটি অন্যায় নিশ্চয়ই আরেকটি অন্যায়ের বৈধতা দেয় না। এই সরকার পারছে না তাই আগের ব্যবস্থাই ভালো ছিল এ ধরনের প্রচারে এখনো যারা নিয়োজিত তারা আগামীর জন্য নতুন করে সর্বনাশ ডেকে আনছেন।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে আবারও সেই দ্বিদলীয় কাঠামোর সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিদলীয় পুরোনো নির্বাচনি ব্যবস্থার পরিবর্তে কার্যত দুটি রাজনৈতিক জোটের আবির্ভাব ঘটেছে। একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বলয় এবং অন্যটি প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া বলয়। এর বিপরীতে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
এখন সময় কলে-কারখানায়-মাঠে-ময়দানে-স্কুল-কলেজে-গ্রাম-শহরে মানুষের মধ্যে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করার পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমের মানবিক ও সৃষ্টিশীল ব্যবহার। সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের এখনই সময়। কিভাবে মানুষের চোখের মণি হয়ে দেশপ্রেমে তাদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, কিভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা যায়, কিভাবে শোষণ-বঞ্চনা থেকে মানুষের মুক্তি সম্ভব সে বার্তা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করতে পারলে সর্বপ্রান্তের মানুষটিও নিশ্চয়ই প্রতিক্রিয়াশীলদের ছেড়ে প্রগতিশীলদের বেছে নেবে।
লেখক : কলামিস্ট