রবি দাম
Posted: 23 আগস্ট, 2026
১৯৫০ সালের ২৭ মার্চ। পাকিস্তানি পুলিশের নিপীড়নে পার্টির তরুণরা সব ঘরছাড়া।
এর মধ্যে সারা রাত কখনো ক্ষেতের এবড়ো থেবড়ো আল ধরে আবার কখনো ক্ষেতের মাঝ দিয়ে নিশ্চুপ কিন্তু দ্রুত পায়ে হেঁটে ভোর সাড়ে চারটায় যতীন্দ্র কুমার দাস ও প্রসন্নশীল প্রখ্যাত কৃষকনেতা করুণাসিন্ধু রায়ের গ্রাম বেহেলীতে এসে পৌঁছায়। যতীন্দ্র পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সুনামগঞ্জ মহকুমার সম্পাদক করুণাসিন্ধুর হাতে গড়া কমরেড। করুণাসিন্ধু রায়ের পুত্র বরুণ রায়, যার পোষাকী নাম প্রসূনকান্তি রায় তার বন্ধু। করুণাসিন্ধু গত হয়েছেন কয়েক মাস আগে।
দ্বিতীয় কংগ্রেসে রণদীভের লাইন গৃহিত হওয়ার পর নেহেরুর নেতৃত্বাধীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্ররোচনায় পশ্চিমবঙ্গের বিধান রায়ের সরকার কমিউনিস্ট পার্টিসহ ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক সকল গণসংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। পাকিস্তানের শুরুতে আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্টরা বেরিয়ে আসতে শুরু করে। ’৪৮ সালের মার্চে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের সর্বসম্মত প্রস্তাবে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ও পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। মার্চে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তব্যে বিক্ষুব্ধ বাঙ্গালি তরুণরা ভাষা আন্দোলন শুরু করে। দেশভাগের কারণে থেমে থাকা কৃষক বিদ্রোহ কৃষকসভার নেতৃত্বে সশস্ত্র রুপ নিতে শুরু করেছে। নেত্রকোণায় টঙ্ক প্রথা, সিলেটে নানকার প্রথা উচ্ছেদ ও রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গে তেভাগার দাবি নিয়ে কৃষকরা বিদ্রোহ শুরু করেছে। ’৪৮ এর শুরুতেই গ্রামাঞ্চলে তীব্র খাদ্য সংকট শুরু হয়। সরকারের কর্ডনপ্রথায় খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে চালের দাম মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। কর্ডনপ্রথার কারণে ধানের দাম উদ্বৃত্ত এলাকার তুলনায় ঘাটতি এলাকায় আট-দশ গুণ বেড়ে যায়। ’৪৩ এর দুর্ভিক্ষের ছবি কৃষককে তাড়া করে। দেয়ালে দেয়ালে শ্লোগান পড়ে ‘ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়- লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।’ ব্যর্থ সরকারের আক্রোশ পড়ে কমিউনিস্টদের উপর। কলকাতা থেকে আগত সিভিল-পুলিশ আমলাদের পরামর্শে কমিউনিস্ট পার্টিকে ঘোষণা ছাড়াই কার্যত নিষিদ্ধ করে দেয়। পুরনো গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে গ্রেফতার করতে শুরু করে কমিউনিস্ট পার্টি কর্মীদের। হুলিয়া মাথায় নিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কমিউনিস্টরা ঘরছাড়া হয়।
কৃষক কর্মী প্রসন্নশীল বেহেলীর সন্তান। দীর্ঘপথ নীরবে একসাথে চলে করুণাসিন্ধুর বাড়ির প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে প্রথম মৌনতা ভঙ্গ করলো প্রসন্ন, দাদা আজকের দিনটা মায়ের সাথে বাড়িতেই থাকি।
দিনের আলো ফুটতে এখনো অনেকটা বাকি। ঘোর অমনিশার মধ্যে প্রসন্নের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে যতীন বললো, যাও। ঘর থেকে বের হয়ো না। জানাজানি যেন না হয়। মাকে বলে দিও কাউকে যেন বলে না দেয়। আমি যে এখানে আছি এটা কাউকে বলার দরকার নেই। এসব কথা বলার জন্যই বলা। আত্মগোপন করা কমরেডদের প্রাথমিক পাঠই হচ্ছে এটা। যতীন প্রসন্নের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বেশ কিছুদিন ধরে ছেলেটা তার সাথে থাকে। মহকুমা কমিটির সভার সিদ্ধান্তানুসারে বিশ বছরের এ তরুণ তার সার্বক্ষণিক সহযোগী। কলেজে ছাত্র ফেডারেশন করতো। পাঁচ ভাইয়ের সর্বকনিষ্ঠ। মায়ের খুব আদরের। এখন খাওয়ার ঠিক নাই, ঘুমানোর ঠিক নাই। প্রসন্নের যাওযার পথের দিকে তাকিয়ে যতীনের চোখ ভিজে ওঠে। ঘাড়ে ফেলে রাখা গামছা দিয়ে চোখ মুছে।
মহকুমা পার্টির সম্পাদক হিসেবে যতীনের কাজ হচ্ছে মহকুমার সবগুলো ইউনিটের সাথে যোগাযোগ রাখা। পার্টির কাগজপত্র ও কমরেডদের রক্ষা করা। দেশত্যাগ করতে চাওয়া কমরেডদের দেশে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করা। জেলা কমিটির সাথে যোগাযোগ করে নির্দেশনানুযায়ী কর্মসূচি নির্ধারণ করে অধঃস্তন কমিটিগুলোকে জানানো, তাদের দিয়ে কর্মসূচি নেয়ানো এবং যথাযথভাবে তা পালিত হয়েছে কিনা তার তদারকিও তাকে করতে হয়। আসন্ন দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে কৃষকদের রক্ষার জন্য খাদ্য আন্দোলন শুরু হওয়ায় তার কাজ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। দিনের বেলায় শেল্টারে থাকে, রাতে বের হয়ে কমরেডদের সাথে দেখা করতে হয় অথবা কোনো পূর্ব নির্ধারিত সভায় যোগ দিতে হয়। গত পরশু ছিল ধরমপাশা সীমান্তে হাজং অধ্যুষিত খিলাগড়া পাহাড়ে। সেখানে কমরেড রবি দামের নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষকরা ক্যাম্প স্থাপন করেছে। সেখানে কৃষকদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ও অস্ত্র চালনা শেখানো হয়। রবি দামের নেতৃত্বে কৃষক গেরিলা বাহিনী গড়ে উঠছে।
বাড়ির ভিতর ঢুকে যতীনের মনটা খারাপ হয়ে গেল করুণাসিন্ধুর জন্য। কয়েক মাস আগে প্রয়াণ ঘটেছে। করুণাসিন্ধুর কলেজ জীবনের বন্ধু নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। তাঁর প্রভাবেই করুণাসিন্ধু কংগ্রেস রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি মনে প্রাণে ছিলেন কৃষকবন্ধু। ১৯৩৬ সালে নিখিল ভারত কৃষকসভা গঠিত হলে তিনি সে বছরই সুরমা উপত্যকা কৃষকসভা গঠন করেন। ১৯৩৭ সালে সাধারণ নির্বাচনে প্রজাবন্ধু হিসেবে গৌরারং এর প্রজা ও কৃষকবিরোধী অত্যাচারী জমিদার নগ্রেন্দ্র কুমার চৌধুরীকে পরাজিত করে আসাম প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। যতীনের বাবা ছিলেন করুণাসিন্ধুর ভক্ত ও একনিষ্ঠ কর্মী। পিতৃপদাংক অনুসরণ করে যতীন করুণাসিন্ধুর হাত ধরেই ছাত্র অবস্থায় রাজনীতিতে এসেছে। বরুণের সাথে ছাত্র ফেডারেশনে কাজ করার সুবাদে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়েছে। করুণাসিন্ধুর বাড়ি যতীনের নিজ বাড়ি হয়ে গেছে। বরুণ এখন জেলে। শুনেছে ঢাকা জেলে আছে।
নিজের ঘরের ছিটকানি খুলে কাঁধের কাপড়ের ব্যাগটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে গায়ের জামাটা খুলে যতীন সটান বিছানায় শুয়ে পড়লো। নিমিষেই ঘুম। ঘরের একটা দরজা। কোনো জানালা নেই। একজন কোনো রকম থাকতে পারে। নিরাপত্তার জন্যই এরকম জানালাবিহীন ঘরটাই বেছে নিয়েছে যতীন। চৈত্রের সকালেই গরমে ঘামে নেয়ে উঠেছে। ঘুম ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। মটকা মেরে বিছানায় পড়ে আছে। কড়া নেড়ে ইন্দুভূষণ ঘরে ঢুকে বললো, দাদা উঠবে না। বেলা হয়ে গেল। জল-খাবার রেখে গেলাম, খেয়ে নাও।
নাস্তার বাসন বিছানায় রেখে ইন্দু ঘর থেকে বের হতে উদ্যত হলে যতীন জিজ্ঞেস করে, কত বেলা হলোরে?
নয়টা বেজে গেছে, ইন্দু জবাব দিল। কিছু লাগলে ডাক দিও।
যতীন নাস্তা সেরে বিছনায় বসে কাপড়ের ব্যাগটা উপুড় করে দিল। পুরো একটা সংসার। একপ্রস্ত ধুতি, ফতুয়ার সাথে টুকিটাকি অনেক কিছু। সুই-সুতাও আছে। একটা খাতা। কিছু কাগজ ও দুটি ইংরেজি বই। একটি যুগোশ্লাভিয়ার, অন্যটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসের বই। সব জিনিসপত্র আবার একে একে ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে শুধু ‘মাওসেতুং এর সাথে লংমার্চে’ বইটা বাইরে রাখল। ব্যাগটা বিছানার একপাশে রেখে বুকের নীচে বালিশ দিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে বইটা পড়তে শুরু করলো।
বই পড়তে পড়তে যতীন ঘুমিয়ে পড়েছিল। বিকেলে ঘুম ভাঙ্গল ইন্দুভূষণের ডাকে। দাদা উঠো, উঠো। সর্বানশ হয়ে গেছে।
ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে আতংকিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছে রে? প্রসন্ন কি ধরা পড়েছে?
সর্বনাশ হয়ে গেছে দাদা। পুলিশ রবি দামকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। কাঁদতে কাঁদতে বললো ইন্দু।
যা কী বলিস! গত পরশুই না ওর সাথে মিটিং করলাম। কে বলেছে তোকে? যতীন আর্তচিৎকার করে উঠলো।
ইন্দু বললো, আমাদের গ্রামের দাস বাড়ির প্রণব শহরে গিয়েছিল। কৃষকসভার কর্মী। বেহেলী কৃষক সম্মেলনের সময় রবি’দার সাথে তার খাতির হয়েছিল। রবি’দাকে তো শহরের সবাই চিনে। বাজারে সবাই বলাবলি করছিল। প্রণবকে কেউ চিনে না। ও থানার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। থানার সামনের জটলার কথা শুনে নিশ্চিত হয়েছে ওরা কমরেড রবি দামকে মেরে ফেলেছে। ওর লাশ থানার বারান্দায় পড়ে রয়েছে।
যতীন জিজ্ঞেস করলো, রবি কি একা ছিল?
ইন্দুর জবাব, না প্রমোদ’দাও সাথে আছে। উনাকে গ্রেফতার করেছে। অবস্থা খুব খারাপ। প্রণব বলেছে বাঁচে কিনা সন্দেহ।
ঘটনা কিছু বলেছে প্রণব?
ইন্দুর সংক্ষিপ্ত জবাব, না। ও ঘটনার কিছু জানতে পারেনি। ভয়ে পালিয়ে এসেছে।
যতীন ইন্দুকে বলে, প্রসন্নকে কিছু বলিস না। শুধু বলবি আজ রাতেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। ও যেন খাওয়া দাওয়া করে, মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসে।
ইন্দু চলে গেলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকে যতীন। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। তার শরীরে কে যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে। কমরেড রবি দাম তার মহকুমা পার্টির একজন শ্রেষ্ঠ কমরেড। তাকে সে রক্ষা করতে পারলো না। এটা তারই ব্যর্থতা।
এখন চারটা-সাড়ে চারটা বাজে। সব গুছিয়ে জামা পরে বিছানায় বসে আছে যতীন। সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা করছে। রাতের অন্ধকার থাকতেই তাকে বিশ মাইল পথ অতিক্রম করতে হবে। তাকে পৌঁছাতে হবে মহিষখলা। সে অপেক্ষা করছে কখন অন্ধকার নামবে। কখন প্রসন্ন আসবে। কখন সে যাবে মহিষখলা প্রিয় কমরেডদের কাছে।
কমরেড রবি দাম ১৯৫০ সালের ২৬ মার্চ সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলার মোহনপুরে পুলিশের সাথে সম্মুখ সমরে শহীদ হন।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি