গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সরকার বদলেছে, বদলায়নি সংকট
Posted: 16 আগস্ট, 2026
বাংলাদেশের গণমাধ্যম দীর্ঘদিন ধরেই কর্পোরেট পুঁজি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ত্রিমুখী চাপে রয়েছে। সরকার বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলেছে, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতিতে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসেনি।
দেশের গণমাধ্যমে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সংকট শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভয়াবহ রূপ নেয়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে সংবাদমাধ্যমকে দলীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমের সংবাদ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল নিয়মিত। একই সঙ্গে মালিকপক্ষকে ব্যবহার করে ভিন্নমতের ও পেশাদার সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচনেও রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল।
ফলে সাংবাদিকতার পেশাগত স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনও হয়ে পড়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরীক্ষার বিষয়। প্রগতিশীল ও ভিন্নমতের সাংবাদিকদের একটি বড় অংশকে দীর্ঘ সময় ধরে পেশাগত ও সাংগঠনিকভাবে কোনঠাসা অবস্থায় থাকতে হয়েছে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সেই পরিস্থিতি পরিবর্তনের বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার গণমাধ্যম সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে। কিন্তু বাস্তবতা খুব দ্রুতই সেই আশার গুঁড়ে বালি দেয়।
সরকার পরিবর্তনের পরপরই বিএনপি ও জামায়াত-সমর্থক সাংবাদিকদের একটি অংশ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। সময়ের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রভাবও বাড়ে। আওয়ামী লীগ আমলে সুবিধাভোগী মালিকপক্ষও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নেয়। কেউ বিএনপির সঙ্গে, কেউ জামায়াতের সঙ্গে, আবার কেউ নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করে।
এর ফলে গণমাধ্যমের মালিকানার চরিত্র বদলায়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বদলেছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ঠিকানা। যে জায়গায় একটি স্বাধীন ও পেশাদার সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল, সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।
এর পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়েও সংবাদ নিয়ন্ত্রণের পুরনো সংস্কৃতি ভিন্ন রূপে অব্যাহত থাকার অভিযোগ ছিল। একই সময়ে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শক্তির তরুণ নেতারাও গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তনের পর গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ কমবে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা বাড়বে–এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি খুব বেশি বদলায়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন সংবাদমাধ্যমের কাঠামোগত সংকটের সমাধান করতে পারেনি।
বরং নতুন বাস্তবতায় পুরোনো প্রশ্নগুলোই নতুনভাবে সামনে এসেছে। কোনো সংবাদ প্রকাশিত হবে কি না, কোন সাংবাদিক কোন পদে থাকবেন, কার চাকরি থাকবে আর কার থাকবে না–এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হচ্ছে সাংবাদিকতার পেশাগত চরিত্রের। সংবাদমাধ্যম যদি ক্ষমতাসীন দলের আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারে যারাই থাকুক, ফলাফল শেষ পর্যন্ত একই হয়। সাংবাদিকতা তখন জনগণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ক্ষমতার কাছে জবাবদিহি করতে শুরু করে।
এই বাস্তবতায় সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানেও রয়েছে গভীর সংকট। দীর্ঘদিন ধরে শুধু রাজনৈতিক বিভেদের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন দুটি ভাগে বিভক্ত।
‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ’ হিসেবে পরিচিত ইউনিয়নের নেতাদের একটি অংশ আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ থেকে নানা সুবিধা নেওয়ার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। পেশাগত অধিকার আদায়ের বদলে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করাই অনেকের কাছে অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছিল। গণঅভ্যুত্থানের পর তাদের একটি অংশ রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ‘বিএনপি-জামায়াতপন্থি’ হিসেবে পরিচিত ইউনিয়নটিও বিগত ১৫ বছরে সাংবাদিকদের রুটি-রুজির আন্দোলনের পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি বেশি মনোযোগী ছিল। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার নানামুখী সংকট নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরিবর্তে এই ইউনিয়নের নেতাদের একটি অংশ এখন পদ-পদবি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।
অর্থাৎ, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক নির্ভরতার সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে তারাও অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পথ অনুসরণ করছেন।
কিন্তু সাংবাদিকদের সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা সংগঠন হতে পারে না। ট্রেড ইউনিয়নের কাজ সাংবাদিকের চাকরি, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, পেশাগত মর্যাদা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা–ক্ষমতাসীনদের তোষণ করা নয়।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল সাংবাদিকদের বিষয় নয়। এটি নাগরিকের জানার অধিকার, গণতন্ত্রের জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সরকার পরিবর্তন হলেই গণমাধ্যম স্বাধীন হয়ে যায় না। প্রয়োজন মালিকানা কাঠামোর স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অবসান, সম্পাদকীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল। সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে গণমাধ্যমকে পুরোনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে আসল পরিবর্তন তখনই হবে, যখন সাংবাদিককে দল দেখে নয়, পেশাগত দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে; সংবাদ প্রকাশের আগে ক্ষমতাবান কারও অনুমতির প্রয়োজন হবে না; এবং সাংবাদিকদের সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের আনুগত্যের জায়গা না হয়ে সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ–এক ক্ষমতার ছায়া থেকে বেরিয়ে আরেক ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া নয়; বরং সব ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলার সক্ষমতা অর্জন করা।
এই পথ কঠিন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক