ভারতে ছাত্র গণআন্দোলন এবং করপোরেট মিডিয়া

Posted: 16 আগস্ট, 2026

দীর্ঘদিন ধরেই ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারক-বাহক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ২০২০-২১ সালের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের পর সম্প্রতি দিল্লির যন্তর-মন্তরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ছাত্র গণআন্দোলন সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। জুলাইয়ের শেষ দিকে এই আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তা বিজেপি সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়। তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে ভারতের সরকার-সমর্থিত ও করপোরেট-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এর বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে। রিপাবলিক টিভি, যা ভারতের বহুল আলোচিত ‘গোদী মিডিয়া’-র অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত, এই প্রচারণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদের দাবি, ক্ষোভ এবং আন্দোলনের সামাজিক প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে আন্দোলনটিকে একটি ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালানো হয়। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে ‘মার্কিন ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রচারণার সঙ্গেও তুলনামূলকভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ১৯৮৮ সালে নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড এস. হারম্যান যৌথভাবে গধহঁভধপঃঁৎরহম ঈড়হংবহঃ: ঞযব চড়ষরঃরপধষ ঊপড়হড়সু ড়ভ ঃযব গধংং গবফরধ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, করপোরেট গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশন করে না; বরং জনমতও নির্মাণ করে। একটি কারখানায় যেমন পণ্য উৎপাদিত হয়, তেমনি সংবাদশিল্পে উৎপাদিত হয় রাজনৈতিক বয়ান ও সামাজিক সম্মতি। লেখকদ্বয়ের ভাষায়, মালিকানা, বিজ্ঞাপন, ক্ষমতাকেন্দ্রিক তথ্যসূত্র, বিরূপ প্রতিক্রিয়া (ঋষধশ) এবং আদর্শগত শত্রু নির্মাণ– এই পাঁচটি ‘ফিল্টার’-এর মাধ্যমে সংবাদ এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যাতে শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। ফলে জনগণ অনেক সময় বাস্তবতার পরিবর্তে নির্মিত বাস্তবতাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। এই তাত্ত্বিক কাঠামোকে সামনে রেখে নিউজিল্যান্ডের ম্যাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহান জে. দত্ত তাঁর গবেষণা “গধহঁভধপঃঁৎরহম ঃযব ঋড়ৎবরমহ ঐধহফ: ঐড়ি জবঢ়ঁনষরপ ঞঠ ঞঁৎহবফ ধ ঝঃঁফবহঃ চৎড়ঃবংঃ রহঃড় ধ ঋড়ৎবরমহ ঈড়হংঢ়রৎধপু রহ ঝবাবহ উধুং”-এ রিপাবলিক টিভির সাত দিনের সম্প্রচার বিশ্লেষণ করেছেন। ২০ থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোর ভাষ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি বাস্তব ছাত্র আন্দোলনকে ধারাবাহিকভাবে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’-এর ফল হিসেবে নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (ঘঊঊঞ)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর মধ্যে অন্তত ২১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পুনঃপরীক্ষা, বেকারত্ব এবং শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকটের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। অথচ গবেষণায় দেখা যায়, সাত দিনের সম্প্রচারে রিপাবলিক টিভি প্রায় ৫৮ হাজার ৯৪১টি শব্দ ব্যবহার করলেও ছাত্রদের দাবি, ক্ষোভ কিংবা আন্দোলনের কারণ নিয়ে কার্যত কোনো আলোচনা করেনি। আন্দোলনের মূল বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ আড়াল করে ভিন্ন এক বয়ান নির্মাণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ নির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে আমেরিকার নাম- ১৬৪ বার। এরপর এসেছে চীন (৮৯ বার), পাকিস্তান (৭৬ বার), সিআইএ (৪৩ বার) এবং আমেরিকান দূতাবাস (২৯ বার)। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সম্প্রচারের প্রথম পাঁচ দিনে পাকিস্তানের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম; কিন্তু শেষ দিনে তা প্রায় ২৫ গুণ বৃদ্ধি পায়। এর পেছনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বা টেররিস্ট গ্রুপ না, এর পেছনে ছিল সুইডিশ পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী গ্রেটা থুনবার্গের একটি বক্তব্য। লন্ডনে ঝঃঁফবহঃং’ ঋবফবৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফরধ টক আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংগ্রামকে ‘ঃযব ঃৎঁব সবধহরহম ড়ভ ঢ়বড়ঢ়ষব’ং ঢ়ড়বিৎ’ বলে অভিহিত করেন। রিপাবলিক টিভি এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাঁকে ‘পাকিস্তান-সমর্থিত’ এবং ‘খালিস্তানপন্থি’ শক্তির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করতে থাকে। এখানেই থেমে থাকেনি প্রচারণা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘প্রকৃত ছাত্র’ নয় বলে দাবি করা হয়। তাঁদের ‘গুন্ডা’, ‘দুষ্কৃতিকারী’, ‘ড্রাগ অ্যাডিক্ট’, ‘ভারতবিরোধী’, ‘হিন্দুবিরোধী’ এবং ‘বিজেপিবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ‘মড়ড়হং’, ‘মঁহফধং’, ‘যড়ড়ষরমধহং’ এবং ‘ষুহপযরহম’- এই শব্দগুলো মোট ৮৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে, যা আমেরিকার উল্লেখ ছাড়া অন্য যেকোনো ভূরাজনৈতিক ফ্রেমের তুলনায় বেশি। বিজেপির এক নারী সংসদ সদস্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘এঁঃঃবৎ এবহবৎধঃরড়হ’ বা ‘নালা-নর্দমার প্রজন্ম’ বলে মন্তব্য করেন এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রীদের সম্পর্কেও অবমাননাকর বক্তব্য দেন। ফলে সংবাদ পরিবেশন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অমানবিক ও অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের কৌশলে পরিণত হয়। একই সময়ে, রিপাবলিক টিভির প্রচারে সিআইএ-এর নাম এসেছে ৪৩ বার, আমেরিকান দূতাবাসের নাম ২৯ বার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কো রুবিওর নাম ২৮ বার। কেন মার্কো রুবিও? কারণ, কয়েক দিন আগে তিনি কলকাতা সফর করে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং কয়েকজন খ্রিস্টান মিশনারির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আর্নব গোস্বামী প্রশ্ন তোলেন– যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা অর্থ কি সোনিয়া গান্ধী, ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান মিশনারিগণ, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার কাজে এবং মাওবাদী গেরিলা কিংবা ছাত্র আন্দোলনের পেছনে ব্যবহৃত হচ্ছে? সকল অভিযোগই নাটকীয়, কিন্তু তার পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। গবেষণায় রিপাবলিক টিভির মালিকানা ও রাজনৈতিক সংযোগের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে নেটওয়ার্কটি ক্ষমতাসীন জোট-সমর্থিত এক সংসদ সদস্যের প্রাথমিক বিনিয়োগে যাত্রা শুরু করে; পরবর্তীতে তিনি মোদী সরকারের মন্ত্রী হন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক ক্ষমতা, করপোরেট মালিকানা এবং সংবাদ উৎপাদনের সম্পর্ক এখানে কেবল তাত্ত্বিক নয়; বাস্তবও। ভারতের সাংবাদিক রাভিশ কুমার এই ধরনের সংবাদমাধ্যমকে ‘গোদী মিডিয়া’- অর্থাৎ ক্ষমতার কোলে বসে থাকা সংবাদমাধ্যম বলে অভিহিত করেছেন। ২০২২ সালে গৌতম আদানির মাধ্যম-এর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের পর ভারতে করপোরেট মালিকানা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটি আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। ভারতের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান নিয়ে অভ্যুত্থানবিরোধী প্রচারণায় দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গণতান্ত্রিক সংকট, বেকারত্ব, অসমতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং সর্বোপরি নির্বাচনব্যবস্থাকে কলুষিত করে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বরং সরকার পতনের ব্যাখ্যা হিসেবে ‘মার্কিন ষড়যন্ত্র’, ‘স্বাধীনতার চেতনা পরিপন্থি’, ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’, ‘বাংলাদেশবিরোধী’ ‘উন্নয়নবিরোধী’- এসব বয়ানকে সামনে আনা হয়। ভারতের ঞযব ওহফরধহ ঊীঢ়ৎবংং-এর এক সম্পাদকের পর্যবেক্ষণ ছিল ভিন্ন। তাঁর মতে, ভারতের চারপাশে অবস্থিত একটি দীর্ঘদিনের মিত্র রাষ্ট্রের সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ এসে উৎখাত করবে- এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা দুঃশাসন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং গণতান্ত্রিক সংকটই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে অধিক গ্রহণযোগ্য। ভারত ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যকে সামনে নিয়ে আসে- করপোরেট ও সরকারঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম অনেক সময় বাস্তব সংকটের কারণ অনুসন্ধান না করে ষড়যন্ত্রের বয়ান নির্মাণে বেশি আগ্রহী হয়। ফলে জনঅসন্তোষের প্রকৃত উৎস, নাগরিকদের দাবি এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। নোম চমস্কি ও হারম্যানের ‘গধহঁভধপঃঁৎরহম ঈড়হংবহঃ’ তত্ত্ব আজও তাই শুধু একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়; দক্ষিণ এশিয়াসহ পৃথিবীর সকল দেশের সমকালীন গণমাধ্যম-বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রেও এটি একটি কার্যকর ব্যাখ্যামূলক কাঠামো। গণমাধ্যম যখন স্বাধীন অনুসন্ধান ও জনস্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক ক্ষমতা, মুনাফা ও করপোরেট স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সংবাদ কেবল তথ্যের বাহক থাকে না; বরং শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। তাই গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক, সততা-নৈতিকতাপূর্ণ, এবং শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি, শ্রমজীবী নারী, সর্বজনের প্রতি দায়বদ্ধ গণমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা