প্রকাশনার ৫৭ বছরে পদার্পণ : কিছু অঙ্গীকার
Posted: 16 আগস্ট, 2026
কোনো একটি সাপ্তাহিকের ৫৭ বছর ধরে পথ চলা খুব সহজ কথা না। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েই মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর সাপ্তাহিক ‘একতা’র ৫৭ বছরে পদার্পণ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠিত দৈনিকেরও এতটা বছর টিকে থাকা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না– আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা কারণে। আর বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে পত্রিকা পড়ার কষ্টকর প্রথা এড়িয়ে ছবি দেখে জানার কালচার গড়ে উঠেছে। একে মন্দ বলার সুযোগ হয়ত কম। তারপরও পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে।
একজন স্বনামখ্যাত বয়োজেষ্ঠ্য সাংবাদিক এক টিভি চ্যানেলে আলাপ-চারিতায় বললেন, ‘অনেক পত্রিকা মালিক ২ হাজার ছাপিয়ে, অনেক বেশি সংখ্যা হিসেব দাখিল করে– তবে তারা অনলাইনে তা দিয়ে দেন।’ যাহোক সব বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে গরীব বঞ্চিত মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর ‘একতা’ এগিয়ে চলেছে– শত প্রতিকূলতার মাঝেও। তবে শুধু টিকে থাকলে তো হবে না। একতাকে নিতে হবে নতুন প্রজন্মের কাছে, কিশোর-তরুণদের মাঝে।
এ চিন্তা নতুন নয়। দু-তিনবার আমরা প্রচেষ্টাও নিয়েছিলাম–বিজ্ঞাপন দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। তাতে হয়ত আন্তরিকতার ঘাটতি ছিল– সামগ্রিক অর্থেই। তবে আজ ২০২৬-এ এসে নতুন পরিস্থিতিতে যখন ‘তরুণ-যুবকদের যুগ’ বলা হচ্ছে– এখন তাদের কাছে টানার বা যাবার পথ তো খুঁজতেই হবে। সে কথাই আজ বলব এবং সবাইকে ভাবতেও বলব। একার ভাবনাতে তা হবে না।
আমাদের দেশে যে দু-একটি পত্রিকা পাকিস্তানি শাসনামল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে– তাদের মধ্যে ‘ইত্তেফাক’ ও ‘সংবাদ’-এর নাম বলতে হয়। ‘সংবাদ’ পত্রিকা বর্তমানে খুঁড়িয়ে চললেও এক সময়ে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা বিকাশের লক্ষ্যে একমাত্র গণমাধ্যম ছিল। এর সম্পাদকীয়, উপ-সম্পাদকীয় মানুষকে পথ দেখাত। বিশেষ করে যারা সব মানুষের সমান অধিকারের কথা বলতেন। আর এই পত্রিকা আগামী প্রজন্মকে চিন্তা চেতনায় সমৃদ্ধ করার জন্য ‘খেলাঘর’ নামে একটি পাতা প্রকাশ করত এবং তা পরিচালনা করতেন ‘দাদাভাই’ নামে সাংবাদিক– বজলুর রহমান। পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। সপ্তাহে একটি পাতায় শিশু কিশোরদের আঁকা ছবি, ছড়া, কবিতা ছাপা হতো। শিশু-কিশোররা সপ্তাহের ঐ পাতার অপেক্ষায় থাকতো। যেদিন যার লেখা প্রকাশিত হতো, সে আরও লেখার অনুপ্রেরণা পেত। আমি ‘সংবাদ’-এ তখন না লিখলেও ঐ পাতা পড়তাম। ড. আব্দুল্লাহ আল-মুতীর লেখায় দেখলাম– কলেরা রোগ থেকে বাঁচার জন্য কত কুসংস্কারই না ছিল। যেমন– ‘ওলা ওঠা দেবির পুজা’ এবং তার জন্য ভিক্ষা সংগ্রহ করা ইত্যাদি। এ ধরনের আরো কিছু কুসংস্কারবিরোধী লেখা যেমন ভূত-জি¦ন বিষয়ে লেখা– আমি শৈশব কৈশরেই পড়েছিলাম এবং কুসংস্কার বিরোধী মনোভাব তখনই তৈরি হয়েছিল। আর এই পাতায় যারা লিখতেন তারা অনেকেই পরবর্তীকালে শুধু পরিচিত না সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক হয়ে উঠেছিলেন। তারা প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা সমৃদ্ধ হয়েছিলেন– সে সব নাম বলে শেষ করা যাবে না।
আবার একইভাবে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় রোকনুজ্জামান খান– ‘দাদা ভাই’ নামে ইত্তেফাক-এর ‘কচিকাঁচার’ পাতা পরিচালনা করতেন। সেখান থেকেও অনেক কবি সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে। একইভাবে সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখার সুযোগ পেয়ে অনেক নারী লেখক তৈরি হয়েছিল। এমন উদাহরণ অনেক দেওয়া যায়।
তাই এতোদিন আমরা যা পারি নাই তা এখনো যে পারা যাবে না–তা তো নয়। এখন দেখা যাচ্ছে আমাদের ১৯৭১-এর অবদান মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। ১৯৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১, ’৯০-সালে যেন কিছুই হয়নি। কারও কোনো অবদান নেই। নানা জায়গায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এবং স্বাধীনতার যুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটু মন্তব্য করে শ্লোগান শেখানো হচ্ছে। যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অপরপক্ষে মুক্তিযুদ্ধে সকল দলের অবদান এবং সাম্যের দেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কিশোর, যুবক, প্রৌঢ় যে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন– সেই আকাঙ্ক্ষাকে সেই চেতনাকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে। কি কঠিন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল– বর্তমান জেএনজি (জেনারেশন জেড)– নামে প্রজন্ম তা নিয়ে পরিহাস করছে। নারীদের ওপর যে নির্যাতন, মানুষের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, হত্যা, লুণ্ঠন, বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, প্রকৌশলীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করা এবং এসব কাজে সাহায্যকারী রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের যে কর্মকাণ্ড চলেছিল তা বর্তমানের শিশু কিশোরদের মাঝে তুলে ধরতে হবে।
আর এ-কাজে আমরা ব্যবহার করতে পারি সাপ্তাহিক একতা-র একটি পাতা। শিশু-কিশোররা তাদের নানা-নানী, দাদা-দাদী বা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে বর্ণনা শুনে লিখে লিখে পাঠাবে একতার সেই পাতায় মুদ্রণের জন্য। শুধু মুক্তিযুদ্ধ তো নয়, সমাজের সকল রকম নির্যাতন, নিপীড়ন, গঠনমূলক লেখা, গল্প, কবিতা এবং বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাও তারা লিখবে। এতে সমাজের কুসংস্কার ও বঞ্চনার কথাও উঠে আসবে। কেউ ছবি এঁকেও পাঠাতে পারে। অর্থাৎ এ প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের চিন্তা, চেতনা মননে–অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে সুন্দর সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা যেন জেগে ওঠে; সেই লক্ষ্যে ‘একতা’-কে কাজ করতে হবে। সাপ্তাহিক একতা শুধুু প্রবীণদের জন্য না, নবীনদের পাঠ উপযোগী পাতাও এখানে থাকতে হবে। কেউ বলতে পারেন– এতোদিন করেননি কেন? সে প্রশ্ন করার অধিকার সবারই আছে। উত্তর হলো– করতে হবে, অনেক দেরি হয়ে গেছে।
সেই ছোট বেলার ৫০-এর দশক থেকে দেখে এসেছিলাম ‘সংবাদ’-এর ‘খেলাঘর’ ঈদ সংখ্যা পাতায় ঈদের খুশি যে সবার ঘরে আসে না– সে ধরনের কিছু লেখা প্রকাশিত হতে। আবার এক সময়ে ‘সংবাদ’-এ একটি কবিতা উঠেছিল– ‘আমি এক রিকশাচালক’–এই কবিতাটিও আমাকে নাড়া দিয়েছিল। আমি যখন ক্লাস সেভেন-এ পড়ি, বাংলা ক্লাসে আমাদের সফুরা আপা লিখতে দিলেন ‘একজন রিকশাচালকের আত্মকাহিনি’। ‘সংবাদ’-এর কবিতাটি আমি কেন জানি মুখস্থ করেছিলাম। তাই প্রথমেই কবিতাটি লিখে ওরই ধারাবাহিকতায় লেখাটি সাজিয়েছিলাম। আপা তো অবাক। ‘খুব ভালো’– প্রশংসা পেলাম।
আবার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল তার কয়েকটি লাইন আজও মনে আছে– সেটি খেলাঘর পাতায় ছিল না। তবে তার কয়েকটি লাইন এরকম ছিল– যা আমি আজও কিছুটা স্মরণে রেখেছি– ‘খোদা এই গরিবের শুনো মোনাজাত/স্বার্থ মোদের কায়েম করো/ করোনাকো কুপোকাত/ এই তো সেদিন পেলাম গদি/কতই ত্বরা হারাই যদি/কি করে আর সহ্য করি এতা বড় বজ্রপাত/মোদের কত রঙীন স্বপন, হয়নি কভু আজও পূরণ/ হয়নি কেনা বাড়ি গাড়ি দেখছো তুমি জগন্নাথ/...... কি করে আজ সহ্য করি এতো বড় বজ্রপাত।’
আর একটি কবিতা ছিল– ‘ঘুম পাড়ানী মাসী-পিসী ঘুম দিয়ে যাও/লাইসেন্স দেব, পারমিট দেব– যত খুশি চাও। চাকুরি দেব, উপরি দেব, আরও দেব ফাও/ ঘুম পাড়ানী মাসী-পিসী ঘুম দিয়ে যাও/ বদ্জাতেরা নজদিক সব আশে পাশেই ঘোরে/ভালো ছেলের চোখের থেকে ঘুম তাড়িয়ে ফেরে/ ক্ষিদের চোটে ঘুম আসে না ব্রোমাইড খেয়ে নাও/ ঘুম পাড়ানী মাসী-পিসি ঘুম দিয়ে যাও।
কবিতা দুটি মনে হয় সঠিকভাবে হলো না বা হতেও পারে। তবে মনে রাখার কারণ হলো আমার মা, তিনি এটা মুখস্থ রেখেছিলেন– বাড়িতে আলাপকালে সামরিক জান্তা বা মুসলিম লীগের পক্ষে কেউ কথা বললে– তিনি এই সব কবিতা শোনাতেন। জুলুম নির্যাতন, শোষণ বঞ্চনা, ন্যায়–অন্যায়বোধ আমার পরিবারেই হয়তো বিকাশ লাভ করেছিল। তাই আমি মনে করি যে-সব বাড়িতে ‘একতা’ যায়– সে-সব বাড়িতে একতা-র ‘শিশু কিশোর পাতা’– শিশু-কিশোর মনকে নাড়া দেবে– এটাই স্বাভাবিক। এখানে বড়দের ভূমিকা থাকতে হবে। আমার মা যেমনটি করেছিলেন।
সমাজের অসাম্যের অবিবেচনা প্রসূত বিষয়গুলো কেউ বুঝিয়ে দিলে শিশুমন তা বুঝতে পারে এবং জীবনভর সেই চেতনা ধারণ করতে পারে– এই কবিতা দুটো স্মরণ করে আমি সে কথাই তুলে ধরতে চাইছি। কবিতা দুটি পঞ্চাশের দশকের। প্রথমটি যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রীসভা ভাঙা-গড়ার কালের আর একটি আইয়ুবের সামরিক শাসনামলের।
আমাদের সাপ্তাহিক ‘একতা’–ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য শিশু-কিশোরদের জন্য একটি পাতা সাজিয়ে দেবে– তাদের লেখা আহ্বান করে এবং একতা-র গ্রাহকরা তাদের আশেপাশের কিশোরদের উদ্বুদ্ধ করে একতা-য় লেখা পাঠাবে– ‘একতা’ সাধ্যমত উৎসাহিত করবে– সেই কামনা করতেই পারি ৫৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে। আর সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সাম্যের দেশ গড়ার প্রজন্ম গড়ে উঠুক– সেই কামনা করি। য়
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক একতা