ভোর আসবেই

Posted: 16 আগস্ট, 2026

বাংলাদেশ যেন এক দীর্ঘ নিকষ আঁধারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তুমুল, কিন্তু পথ বিপদসঙ্কুল, কণ্টকাকীর্ণ। রাজনীতিতে অবিশ্বাস, সমাজে বিভাজন, অর্থনীতিতে চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট; সব মিলিয়ে মানুষের মনে ক্লান্তি ও হতাশা জমেছে। মনে হচ্ছে, এত আশা, এত ত্যাগ, এত প্রত্যাশার পরও আমরা কি সত্যিই কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের দিকে এগোতে পারছি? প্রশ্নটি খুবই অস্বস্তিকর, কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অর্থনীতির চিত্র দেখি। মারাত্মক অস্বস্তিকর নয়। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো নাগালের বাইরে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, রাজস্ব আহরণে সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত চাপ অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে রেখেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট তো জনজীবনে নাভিশ্বাস ফেলে দিচ্ছে। কবে স্বস্তি মিলবে সরকারও বলতে পারছে না! এমনই তাদের অদক্ষতা। আরও গভীর সংকট রাজনীতিতে। সরকার বদলেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায়নি। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে দেখা, প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং নাগরিকের মতপ্রকাশকে সন্দেহের চোখে দেখার সংস্কৃতি এখনও বিদ্যমান। খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। মনে হচ্ছে- এসব বিষয়ে অতীতের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার প্রবণতা চলছে। চেয়ারে বসেই তারা ভাবছে, ক্ষমতা আজীবনের। কিন্তু তারা জানে না, চেয়ার উল্টে যেতে খুব বেশি সময় লাগে না। ক্ষমতায় থাকা পক্ষের মনে রাখা দরকার- রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যেন ক্রমশ বিভাজনের রাজনীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে। পুরোনো অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে নতুন অন্যায়কে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে। প্রতিশোধ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতকে নিরাপদ রাখার সক্ষমতার মধ্যেই রাষ্ট্রের শক্তি। তবুও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এখনো তার মানুষ। এই দেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জানে, প্রশ্ন করতে জানে, নিজেদের অধিকার আদায় করতে জানে। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির কাছে জবাবদিহি দাবি করছে; নাগরিক সমাজ রাষ্ট্রের সংস্কার চাইছে; বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার দাবি তুলছে। এই আকাঙ্ক্ষাই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পুঁজি। আন্দোলনের শক্তি ও সংলাপের প্রজ্ঞা একইসঙ্গে দরকার। রাজপথ মানুষকে জাগাতে পারে, এদিকে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনে তার সঙ্গে আলোচনা, সমঝোতা, প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও দরকার। সবমিলিয়েই আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তি। যেখানে ক্ষমতার পালাবদল হবে স্বাভাবিক, নির্বাচন হবে বিশ্বাসযোগ্য, বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন, সংবাদমাধ্যম থাকবে মুক্ত, প্রশাসন থাকবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থাকবে। অর্থনীতিতেও দরকার একই ধরনের নতুন অঙ্গীকার- দুর্নীতি ও অপচয়ের বিরুদ্ধে কঠোরতা, উৎপাদন ও বিনিয়োগের পরিবেশ, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বৈষম্য কমানোর বাস্তব উদ্যোগ। বাংলাদেশের সামনে পথ কঠিন। কিন্তু কঠিন পথ মানেই অন্ধকারের শেষ নেই–এমন নয়। ইতিহাস বলে, কোনো সমাজই চিরকাল একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। হতাশা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে, আবার সেই হতাশাই কখনো নতুন পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়। আমাদের সামনে সেই দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়ার সুযোগ এখনো আছে। শর্ত একটাই–আমাদের লড়াই যেন মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে না দাঁড় করায়; বরং রাষ্ট্রকে আরও গণতান্ত্রিক, সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক এবং অর্থনীতিকে আরও মানবিক করে তোলে। সমাজতন্ত্রের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যের কথা আরও জোরালভাবে মানুষের মনোজগতে হাজির হয়। অন্ধকার যত দীর্ঘই হোক–মানুষের জাগরণ, সংগ্রাম, সংলাপ ও নতুন করে দেশ গড়ার সাহসকে আটকে রাখতে পারে না। ভোর আসবেই। হয়তো সে সময়টা খুব নিকটেই।