চব্বিশের কাঠগড়ায় বুর্জোয়া রাজনীতি এবং শ্রমিক শ্রেণির শিক্ষা
Posted: 09 আগস্ট, 2026
অভ্যুত্থান হচ্ছে শোষিতের উৎসব। কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় থাকা তরুণ সমাজ, দীর্ঘদিন ভোট প্রদানে অপারগ নাগরিক সমাজ, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপর্যস্ত মেহনতি মানুষ এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃবৃন্দের পরিবারের সদস্যরা চব্বিশের অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে এসেছিলো। আন্দোলনকারীদের নির্বিচারে হত্যা নির্যাতন সাধারণ মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। সরকারি হিসাব মতে, আট শতাধিক মানুষ চব্বিশের অভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে কয়েক হাজার মানুষ। সরকার যখন একে একে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দিলো তখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা এবং মেহনতি মানুষের অংশগ্রহণ চব্বিশের অভ্যুত্থানকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে অগ্রসর করে নিয়ে গেছে। ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে কমিউনিস্ট পার্টি বামজোটকে সাথে নিয়ে রাজপথে নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছে। ২রা আগস্টে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মী, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের উদ্যোগে আয়োজিত দ্রোহযাত্রা থেকে সুস্পষ্টভাবে সরকার পতনের ডাক দেয়া হয়।
সাধারণ জনগণ নিজেদের জীবনের বিনিময়ে স্বৈরশাসকের পতন ঘটালেও অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতা কারা পরিচালনা করবে সেই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে সামরিক ও বেসামরিক আমলা, বিদেশি দূতাবাস, সাম্রাজ্যবাদের অনুগত সুশীল সমাজ। সুকৌশলে বামপন্থি পার্টি ও প্রগতিশীল সংগঠনের ভূমিকাকে আড়াল করে দেশি ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী মিডিয়া সামনে নিয়ে এলো তাদের অনুগত শক্তিকে। তাদেরকেই পরিচয় করিয়ে দিলো অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব হিসেবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিজে স্বীকার করেছেন যে, অভ্যুত্থানকালীন সময়ে তাদের সাথে মার্কিন দূতাবাসের যোগাযোগ ছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, বামপন্থি প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের পথকে রুদ্ধ করার জন্য যা যা করা দরকার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তার সবকিছুই করা হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ছাত্রদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা। যেসব বুর্জোয়া প্রতিনিধি ও সুবিধাভোগী আমলারা গত পাঁচ দশক ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনায় ভূমিকা রেখেছে তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছাড়তে চাইবে না। রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে তাদের লুটেরা চরিত্রটাই সামনে চলে আসে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে বিবেচনায় নিয়ে পুঁজির বিকাশ ঘটিয়ে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বদলে কৃষক শ্রমিকের মেহনতে অর্জিত পুঁজি দেশের বাইরে পাচার করে নিজেদের আখের গোছানোর দিকেই তারা বেশি মনোযোগী ছিল। বিপ্লবের পর কিউবার সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করতে সময় লেগেছিলো মাত্র তিন বছর। অথচ এতো বছর পরও জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধা তলানিতেই পরে আছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠার সুযোগ পেয়েছে তারা মূলত বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে রিষ্টপুষ্ট হয়েছে। বুর্জোয়া দলগুলো ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য এদের বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করেছে। আমরা দেখেছি, তালেবান ও আইএসকে কিভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা জন্ম দিয়েছে এবং তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। ভারতে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান বাংলাদেশেও উগ্রবাদীদের উত্থানের পেছনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং আমেরিকা রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদের অনুগত ব্যক্তি ও দলকে ব্যবহার করে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে। যার ফলশ্রুতিতে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিধারণকারী স্থাপনা আক্রান্ত হয়, সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার আওয়াজ উঠে, অপরদিকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হাতে তুলে দেবার ষড়যন্ত্র চলতে থাকে, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার আমেরিকার সাথে একটি গোলামির চুক্তি করে গেছে, যেখানে বর্তমান সরকারি ও বিরোধীদলের সম্মতি ছিল।
বামপন্থিরা আগে থেকেই বলে আসছে যে দেশ ও দেশের মানুষকে দেবার মতো বিশেষ কিছু এই বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলোর অবশেষ নাই। একদিকে বিদেশি প্রভুর নির্দেশ মতো দেশের অর্থনীতি কর্পোরেটের স্বার্থে পরিচালনা করা অপরদিকে জনগণের আখাঙ্ক্ষা পূরণ। উভয় লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব না। বুর্জোয়া দলগুলো যেহেতু বিদেশি এবং সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল তাই জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে চাকরিহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বিগত সময়ে বন্ধ করে দেয়া রাষ্ট্রীয় পাটকল ও চিনিকলগুলোর যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করে যদি আবার চালু করা যায় তাহলে বেকারের হার কমে আসতো, এমনকি কৃষির জন্যও লাভজনক হতো। কিন্তু লুটেরা বুর্জোয়াদের কাছে জাতীয় স্বার্থের চাইতেও বেশি প্রাধান্য পায় রাষ্ট্রীয় শিল্প পানির দরে ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে কমিশনের ভাগ নেয়া।
অভ্যুত্থানের পরপরই উচ্চারিত হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় শ্রেণির পরিবর্তন না হলে দেশে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক শক্তির একটি অন্যতম গুরুদায়িত্ব বোধ করি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তসহ ধারাবাহিকভাবে জনগণের মধ্যে এই বিষয়টাকে প্রচারের মধ্যে রাখা এবং জনগণের সামনে যুক্তিসহ উপস্থাপন করা যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষের স্থায়ী শান্তি দিতে পারে না। তাহলে অভিজ্ঞতার আলোকে একসময় সাধারণ মানুষ বুঝতে শুরু করবে যে, বুর্জোয়ারা বিদ্যমান সংকট নিরসনে অপারগ। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল সংগঠনের গুরুত্ব। একাত্তরে গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত জামাতের মতো একটি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিও দীর্ঘদিন লেগেপড়ে থেকে সংগঠন গড়ে তোলার কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যাদের শক্তির ওপর ভর করেই তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। যদিও তুরস্ক, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল আর্থিক সহায়তা আসার খবর আমরা পেয়েছি। বিভিন্ন বড় বড় গ্রুপ যারা একসময় স্বৈরাচারী সরকারের তল্পিবাহক ছিল তারাও একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে নিজেদের স্বার্থেই বিভিন্ন পৃষ্টপোষকতা দিয়েছে। পুঁজির ধর্মই এমন। মুনাফার জন্য সে সবকিছু করতে পারে। ১৯১৭ এর ফেব্রুয়ারিতে বুর্জোয়া বিপ্লবের পর দেশে ফিরে লেনিন ক্ষমতা দখলের সুস্পষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সাথে সাথে তিনি তৎকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শ্রেণি অবস্থান পর্যালোচলা করে বিভিন্ন ইস্যুতে কোন রাজনৈতিক দলের কী অবস্থান হবে সেই সকল বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দাঁড় করান এবং শ্রমজীবী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রচার করা শুরু করেন। ১৯০৫ সালেও বিপ্লবের ডাক দেবার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন উপস্থাপন করেন পূর্ববর্তী ১০ বছরে শ্রমিক ধর্মঘটগুলোতে শ্রমিকের উপস্থিতির সংখ্যা এবং ১৯০৫ সালে শ্রমিকের উপস্থিতির সংখ্যা যা ছিল বিগত দশ বছরের তুলনায় অনেক বেশি। লেনিন সব সময়ই স্বতঃস্ফূর্ততার আগে আগে চলতেন। ২৪-এর অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা। কোনো একক নেতৃত্বের আহ্বানে নয়, দীর্ঘদিনের একটি দম বন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলো। ২৪-এর অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে যে, যতদিন পর্যন্ত না এই দেশের শোষিত বঞ্চিত নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থান সংগঠিত হবে ততদিন পর্যন্ত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুক্তি নাই। মেহনতি মানুষের সেই কাক্সিক্ষত অভ্যুত্থানের জন্য প্রয়োজন একটি শ্রেণিসচেতন, সুশৃঙ্খল ঐক্যবদ্ধ পার্টি। যেই পার্টি দেশের সমগ্র মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে। সে লক্ষ্যে পার্টির সদস্যদেরও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। পার্টির সদস্যদের ঐক্য তখনই সম্ভব হবে যখন নেতৃত্ব প্রমাণ করতে সমর্থ হবে যে বিপ্লবের চাইতে বড় কোনো স্বার্থ, মেহনতি মানুষের মুক্তির চাইতে বড় কোনো স্বার্থ সেই পার্টি এবং নেতৃত্বের সামনে নেই। এবং অবশ্যই বিপ্লবের জন্য চাই বিপ্লবী তত্ত্ব।
লেখক: ঢাকা মহানগর উত্তর জেলা কমিটির সদস্য