কমিউনিস্ট পার্টি ও কার্ল মার্কসের প্রাসঙ্গিকতা

Posted: 09 আগস্ট, 2026

কার্ল মার্কসের জীবনে প্রথম কমিউনিস্ট সংগঠন ছিল কমিউনিস্ট লীগ। কমিউনিস্ট লীগ ঊনবিংশ দশকের মধ্যভাগে পশ্চিম ইউরোপের গড়ে ওঠা তীব্র শ্রমিক আন্দোলনের ফসল, এর সদস্যদের বেশির ভাগই ছিলেন শ্রমিক। সুতরাং বুর্জোয়া ইতিহাস বহন করে আসা মার্কস-এঙ্গেলসকে শ্রমিক আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকে অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমিউনিস্ট লীগে প্রবেশ করতে হয়েছিল। তখন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে একমাত্র শ্রমিক শ্রেণি আশ্রয়ী ছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট ইশতেহার রচনায় মার্কস-এঙ্গেলস নিজেরাই সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির সদস্য এবং অগ্রণী শ্রমিক অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সম্পর্কে ধারণাকে সুস্পষ্টভাবে আলাদা করেছেন। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মহীরুহ-পুরোধাদের সাথে বিতর্ক করেই মার্কস অগ্রণী শ্রমিকদের একটি বিশেষ বর্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যারা শ্রমিক শ্রেণির দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে সাধারণ শ্রমিকদের সাথে সম্পৃক্ত থেকেই বিশেষ ভূমিকা পালন করবেন। পরবর্তীতে মার্কস তার নিজের প্রাত্যহিক সাংগঠনিক কাজকর্ম থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পুঁজিবাদী রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিচার বিশ্লেষণের দিকে মনোযোগ দেন। এ কাজে মূলত তিনি রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা শোষণ ও অসাম্যের স্বরূপ উন্মোচনের কাজে ঢুকে পড়েন। যার ফসল হিসেবেই কার্ল মার্কস তার মহাগ্রন্থ পুঁজি, উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব এবং এসব গ্রন্থের খসড়া পাণ্ডুলিপি রচনা করেন। এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যেই ১৮৬৪ সালে মার্কস প্রথম আন্তর্জাতিক গঠন করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও তাত্ত্বিক ভূমিকা রাখেন। প্রথম আন্তর্জাতিকের মধ্যে তৎকালীন শ্রমিক আন্দোলনে বিদ্যমান নৈরাজ্যবাদী প্রবণতা ও ট্রেড ইউনিয়নে সংশোধনবাদী প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। মার্কসের বিশ্বাস ছিল এ ধরনের ঢিলেঢালা আঁধারে নানা প্রবণতার রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতি। এ বিশ্বাস থেকেই ১৮৬৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক এর উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি, ‘শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই আনতে হবে’- এমন ঘোষণা দেন। যা প্রথম আন্তর্জাতিকের সাধারণ নীতিমালা হিসেবেও গৃহীত হয়। ১৮৬৪ সালে মার্কস শ্রমিক শ্রেণির মধ্যকার অগ্রণী অংশকে আলাদা করে সংগঠিত করার কথা বলেননি। ১৮৭১ সালের পরে প্যারিকমিউনের অভিজ্ঞতা দিয়ে মার্কসের আগের অবস্থান পরিবর্তন হয়। এ সময়ে বুর্জোয়াদের অপপ্রচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মার্কস কমিউনারদের ঐতিহাসিক কার্যকলাপকে সমর্থন দিয়ে ‘ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ’ গ্রন্থটি লেখেন। তখন সচেতন রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ছাড়া শুধু স্বতঃস্ফূর্তভাবে কমিউনারদের অভ্যুত্থানের দুর্বলতা তার পর্যবেক্ষণে আসে। এই উপলব্ধি থেকে প্যারিকমিউনের পরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিকের অধিবেশনে মার্কস নৈরাজ্যবাদী বাকুনিন পন্থিদের সাথে গভীর বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। মার্কসের বক্তব্যের যথার্থতা বিবেচনায় লন্ডন অধিবেশনে তার বক্তব্য রেজুলেশন আকারে পাশ হয়। যা পরে ১৮৭২ সালে নেদারল্যান্ডের হেগে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিকের অধিবেশনে বিশেষ নিয়ম হিসেবে গৃহীত হয়। যে নিয়মে ১৮৬৪ সালের মার্চের বক্তব্য ‘শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি শ্রমিক শ্রেণিকেই আনতে হবে’ - এই বক্তব্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে লেখা হয়, যেখানে বলা হয় ‘সম্পদশালী শ্রেণিগুলির যৌথ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণি নিজেকে কার্যকর করতে পারে না, যদি না সে রাজনৈতিক পার্টিতে সংগঠিত হয়। যে পার্টি সম্পদশালী শ্রেণিদের তৈরি করা পুরনো পার্টিগুলো থেকে একদম আলাদা হবে’। এমনকি, সমাজ বিপ্লবে শ্রমিক শ্রেণির অগ্রণীদের বিশেষ ভূমিকা সম্পর্কিত রেজুলেশনের বিরোধিতা করায় মার্কস স্বয়ং উপস্থিত থেকে বাকুনিন পন্থি নৈরাজ্যবাদীদের প্রথম আন্তর্জাতিক থেকে বিতাড়িত করেন। প্যারিকমিউনের আগে কার্ল মার্কসের প্রত্যয় ছিল, উন্নত বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সরিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে এবং উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিকাশের মধ্যদিয়ে বিশ্বজুড়ে সহজেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ১৮৭২ সালের পর থেকে মার্কসের সেই প্রত্যয় প্রশ্নের মধ্যে পড়তে থাকে, ফলে আপাতত পুঁজিবাদের স্বরূপ উদ্ঘাটনের বিভিন্ন চর্চা থেকে একটু সরে গিয়ে তিনি “বপড়হড়সরপ ধহফ ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যরপধষ সধহঁংপৎরঢ়ঃ” লেখার সময় যে সমস্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন সে সমস্ত বিষয় নিয়ে আরো গভীর চর্চায় নিমগ্ন হন। যেমন: পরিবেশের সাথে মানুষের সম্পর্ক ও সেই সাপেক্ষে উৎপাদন শক্তি বিকাশের সীমা, মানুষের সচেতনতার স্বরূপ, অইউরোপীয় সমাজের উৎপাদন সম্পর্ক ও সামাজিক সম্পর্ক, এবং প্রাচ্য দেশে সমাজতন্ত্র তৈরি হওয়ার প্রশ্ন। যা গোথা কর্মসূচির সমালোচনা লেখার সময় মার্কসের এই নতুন ভাবনা দেখা যায়। জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গোথা কর্মসূচিতে লিখেছিল, শ্রমই হলো সমস্ত সম্পদের উৎস, মার্কস কড়া সমালোচনা করে বলেছেন ‘শুধু শ্রম নয়, বরং প্রকৃতি আর শ্রম মিলেই সভ্যতার সমস্ত সম্পদ তৈরি হয়।’ মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে জৈবিক ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় থাকে মানুষের শ্রমের মাধ্যমে। প্রকৃতির পুষ্টি চক্র ও উৎপাদনের স্বাভাবিক আদান-প্রদানে পুঁজিবাদ এক স্থায়ী ফাটল তৈরি করেছে, পরিবেশের ভারসাম্য বিপন্ন করার এই বিষয়টি বহু আগেই কাল মার্কসের পর্যবেক্ষণ এসেছে, যা আজকের শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্নে জোরালোভাবে সামনে এসেছে। এখানে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে দেখার মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্পষ্ট। সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে কমিউনিস্ট ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি সম্পর্কে মার্কসের ধারণার দুই ধরনের সমালোচনামূলক বক্তব্য রয়েছে। পুঁজিবাদ উত্তর সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পথে মার্কসের ধারণাগুলো তৎকালীন সময়ের বাস্তব শ্রেণি সংগ্রামের নানা আঁকাবাঁকা পথে বিকশিত হয়েছে, কিন্তু সেই ধারণাগুলোর সমগ্রতাকে প্রকাশ না করে মার্কসের দুই ধরনের বক্তব্যের সমালোচনায় যান্ত্রিকতা, খণ্ডতাবাদ এবং অনৈতিহাসিকতার প্রবণতা রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি সম্পর্কে মার্কসের ধারণা পরিষ্কার করতে হলে, তার দুই ধরনের বক্তব্যকে বিতর্কের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট করা সম্ভব। একটি সমালোচনা ছিল এরকম, ‘লেনিনীয় কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা আদপে মার্কসবাদী রাজনীতির গুরুতর পদস্খলন, যা শ্রমিক শ্রেণির স্বকীয়তাকে পার্টির সক্রিয়তা দিয়ে প্রতিস্থাপন করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন সহ সমাজতান্ত্রিক দেশে সমাজতন্ত্রের প্রয়োগের প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল এর মধ্যেই।’ এই মতামতের মধ্যে একটি অনুচ্চারিত প্রত্যয় রয়েছে। সেটি হল মার্কস সমাজতন্ত্রের জন্য শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্নে কমিউনিস্টদের সচেতন উদ্যোগের বদলে শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ততার উপর প্রধানত জোর দিয়েছেন। প্রথমত, এই মতামতটির সমস্যা হল, তৎকালীন সময়ে বিশ্বব্যাপী শ্রেণি সংগ্রামের কী পরিস্থিতি ছিল এবং বিশ্ব পুঁজিবাদের কী ধরনের বদল হওয়ায় লেনিনীয় কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা উপস্থিত হল তার বিচার বিশ্লেষণ না করা। এই বিশ্লেষণটি বুঝতে না পারলে লেনিনীয় কমিউনিস্ট পার্টির ধারণা, কেন মার্কসের কমিউনিস্ট পার্টির ধারণার পদস্খলন নয়, তা বোঝা যাবে না। মার্কস যেভাবে বলেছেন ঠিক সেভাবেই ভবিষ্যতে উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটবে কিন্তু তার পূর্বে অনুন্নত কিছু দেশে ইতিমধ্যে বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় ঐতিহাসিক নিয়ম অনুযায়ী বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। এসবের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং সূত্রায়ন মার্কসবাদী বিশ্লেষণ পদ্ধতি অনুযায়ী করা সম্ভব। লেনিন ঠিক তাই করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণের শৃঙ্খল যেখানে কতগুলো সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে সৃষ্টি হয় বৈপ্লবিক পরিস্থিতি, সম্ভাবনা দেখা দেয়, বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার। রুশ বিপ্লব সেভাবে সংঘটিত হয়েছে, কাজেই লেনিনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবের ধারণা কার্ল মার্কসের বিপ্লবের ধারণা থেকে সরে গিয়ে কোনো পদস্খলন নয়। -এই ব্যাখ্যাটি পরিষ্কার উপলব্ধিতে না আনতে পারলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। মার্কস উপলব্ধি করেছিলেন, বিশ্বজুড়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই শুধুমাত্র পশ্চিম ইউরোপের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে অগ্রসর হবে না, তাতে কমিউনিস্টদের মতাদর্শগত এবং ব্যবহারিক ভূমিকা প্রয়োজন। এছাড়াও তার উপনিবেশ, অবদমিত জাতিসত্তা, পিছিয়ে থাকা দেশের শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্ন এবং পরিবেশ প্রশ্নে তার ভাবনা, সমাজতন্ত্র গড়া এবং শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির আন্দোলনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। মার্কসের পার্টি গঠন ও মতাদর্শগত বিষয়টি বিশ্ব পুঁজিবাদের মধ্যে থাকা আধিপত্যকারী মতাদর্শ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে অগ্রণী বিশ্ববীক্ষা নির্মাণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, যা লেনিনিয় পার্টির মৌলিক প্রত্যয় থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। কার্ল মার্কস কমিউনিস্ট পার্টি বলতে বুঝিয়েছেন, যে পার্টি কোনো একটি দেশের সাপেক্ষে উচ্চতর মাত্রার শ্রেণি সংগ্রামের ফসল এবং পরিচালক উভয়ই। প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টি মানে শুধুমাত্র মার্কস-লেনিনের নামাবলি গায়ে চাপিয়ে লোক জড়ো করা নয় বরং কোনো একটি সাংগঠনিক কাঠামো যা একটি দেশে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ এবং আধুনিক রাষ্ট্র মিলে যে বীক্ষা তৈরি করে তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে অগ্রণী বিরুদ্ধ বীক্ষার নির্মাণ ও প্রয়োগ করতে পারছে, যে প্রয়োগে শ্রেণি সংগ্রামে বিপুল গতি আনছে। কোনো দেশের বস্তুগত কারণে শ্রেণি সংগ্রাম অগ্রসর হয়ে অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হলে, কমিউনিস্টদের সামনে চলে আসে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং বর্তমানে অস্তিত্বশীল রাষ্ট্রকে ভেঙে ফেলার প্রশ্ন। আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস এবং ক্ষমতার ধরন বুঝতে না পারলে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং অস্তিত্বশীল রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নই ওঠে না। মনে রাখা প্রয়োজন, আধুনিক রাষ্ট্র লেনিনের সময়ের জারের রাষ্ট্র নয় এবং মাও এর সময়ের চীনের সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় বরং আধুনিক রাষ্ট্র বিংশ শতকের তীব্র শ্রেণি সংগ্রামের ফসল। যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদী নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলেছে। যা একদিকে রাষ্ট্রের দমনকারী ক্ষমতা, অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, মিডিয়া, এমনকি পার্লামেন্টের মধ্যদিয়ে জনগণের সম্মতি নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। সাথে সাথে পুলিশ, মিলিটারি, সমরাস্ত্র, নিত্যনতুন নজরদারির কলা কৌশল দিয়ে দমনযন্ত্র তৈরি করে রেখেছে। এতসব সত্ত্বেও পুঁজিবাদের সংকট এত গভীর এবং তীব্র যেখানে এসব রক্ষাকবচও কাজে লাগছে না বরং রক্ষাকবচ অতিক্রম করে দেশে দেশে গণঅভ্যুত্থান হয়ে যাচ্ছে। অন্তত বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, চিলি ও গ্রিসের সাম্প্রতিক ইতিহাস তাই বলছে। দেশে দেশে অভ্যুত্থান হয়ে যেতেই পারে। সমস্যা আসছে অভ্যুত্থানের পরে। কারণ সাম্রাজ্যবাদের নয়া উদারবাদ, বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা আর প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যে কারণে স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণাই আজ অনেকাংশে বদলে গিয়েছে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান যেভাবে তৈরি হয়ে আছে, তা অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি বদলের সাপেক্ষে অনেকটা প্রতিষেধকের কাজ করতে পারে। আধুনিক সেন্ট্রাল ব্যাংক- এর স্বপক্ষে একটি অন্যতম উদাহরণ। নয়া উদারবাদী অর্থনীতির অন্যতম দিক হলো, সেন্ট্রাল ব্যাংককে দেশের পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে পুঁজিবাদের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতার একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। আজকের অর্থের প্রধান রূপ হল ঋণ অর্থ (পৎবফরঃ সড়হবু), যা ক্রমশ ডিজিটাল রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় সমস্ত দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, ইউরোপিয়ান ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, যাদের নিয়ন্ত্রণ নানা জটিল প্রক্রিয়ায় দেশীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের উপর পড়ে। ফলে এই সেন্ট্রাল ব্যাংকের কার্যকলাপকে সঠিকভাবে বুঝতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, অভ্যুত্থানের পর যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, ব্যাংকের আর্থিক কর্মকাণ্ড আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক, ইউরোপিয়ান ব্যাংকের মতো সাম্রাজ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের নিয়মের অধীনে আসতে বাধ্য। আধুনিক সেন্ট্রাল ব্যাংকসহ আধুনিক ভরহধহপরধষরংধঃরড়হ এর সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক প্রবণতা, যা বাস্তব উৎপাদন ও সেবাকে বাদ দিয়ে অর্থ ও পুঁজির লেনদেন থেকে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। এই চরিত্রের বিপরীতে অগ্রসর বীক্ষার পথে যাত্রা করতে গেলে মার্কসের কাছে ফিরতেই হবে। কারণ মার্কসের পৎবফরঃ সড়হবু-র ধারণা, রহঃবৎবংঃ নবধৎরহম পধঢ়রঃধষ বা ঋরপঃরপরড়ঁং পধঢ়রঃধষ এর ধারণা, বিপরীত বীক্ষা তৈরিতে প্রাথমিক ফ্রেইম জোগাতে পারে। ঠিক যেমনি সাম্রাজ্যবাদের তত্ত্বের বিকাশ ছাড়া রুশ বিপ্লব অসম্ভব ছিল, তেমনি ফিনান্সিয়ালাইজেশনসহ আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা বা উপলব্ধি ছাড়া এর বিপরীতে কোনো অগ্রসর বীক্ষা বা দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে কমিউনিস্ট পার্টির রণনীতি ও রণকৌশল বানাতে না পারলে, আজকের সময়ের কোনো বিপ্লব সম্পন্ন করা তো দূরের কথা কমিউনিস্ট পার্টি নির্মাণের কাজও প্রকৃত অর্থে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আধুনিক সময়ের শ্রেণি সংগ্রাম, যে ধরনের কমিউনিস্ট পার্টি নির্মাণের কর্তব্য আমাদের সামনে উপস্থিত করেছে, তাতে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিক রাষ্ট্র, পরিবেশ ও ফিনান্সিয়ালাইজেশনের যুগের অগ্রসর প্রশ্নের উত্তর ও প্রাথমিক পর্যালোচনায় কার্ল মার্কসকে অবলম্বন করেই অগ্রসর হতে হবে। পুনরুদ্ধার করতে হবে মার্কসের বৈপ্লবিক শিক্ষার সম্ভারকে। আধুনিক সময়ের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উপযুক্ত কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে হলে মার্কসের প্রাসঙ্গিকতাকে নতুন করে খোঁজা ছাড়া কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। লেখক : সভাপতি, বরিশাল জেলা কমিটি, সিপিবি