যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি কি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নতুন রূপ?

Posted: 09 আগস্ট, 2026

১. কল্পনা করুন, উনিশ শতকের ভারতের কোথাও এক তুলা চাষির মাঠ। আকাশে রোদ, জমিতে তুলার গাছ, কিন্তু তার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আর তার নিজের হাতে নেই। জমির খাজনা কত হবে, কোন দামে তুলা বিক্রি করতে পারবে, রেলে তুলা তুলে বন্দর পর্যন্ত নিতে কত ভাড়া গুনতে হবে– এসব ঠিক হচ্ছে দূরের কোনো দফতরে, লন্ডন আর কলকাতার নীতিনির্ধারকদের টেবিলে। ব্রিটিশ শাসন তখন ভারতীয় অর্থনীতিকে এক বিশেষ ছকে বেঁধে ফেলেছে। ভারত থেকে যায় তুলা, পাটসহ নানা ধরনের কাঁচামাল। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যায় ল্যাঙ্কাশায়ার আর ম্যানচেস্টারের মিলগুলোর দিকে। ওই মিলগুলোর ভেতরে চলে শিল্প বিপ্লবের আসল কলকাঠি: কাঁচা তুলা থেকে সুতো কাটা, কাপড় বুনন। এ থেকে গড়ে ওঠে ব্রিটিশ পুঁজি, প্রযুক্তি আর শ্রেণিশক্তি। তারপর কী হয়? ওই কাপড়ই আবার ফিরে আসে ভারতে– ল্যাঙ্কাশায়ারের তৈরি রেডিমেড কাপড়, জাহাজে ভেসে, রেলে চেপে সোজা ভারতীয় শহর–বন্দরে, হাটে–বাজারে। শুল্ক আর রেলভাড়া এমনভাবে সাজানো যে দেশীয় তাঁতি আর গৃহশিল্পীরা এর সঙ্গে টিকে থাকতে পারে না। একটু একটু করে হারিয়ে যায় মুর্শিদাবাদের মসলিন, বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব বুনন; ব্রিটিশ কাপড়ই হয়ে ওঠে ‘স্বাভাবিক’ পছন্দ। ভারতীয় চাষি তখন কাঁচামালের সস্তা জোগানদার, ভারতীয় ভোক্তারা ব্রিটিশ পণ্যের নিশ্চিত বাজার। আসল মুনাফা, আসল নিয়ন্ত্রণ, সবই ল্যাঙ্কাশায়ারের কলকারখানার। এতোটুকু শুনলে মনে হবে, বোধহয় ইতিহাসের এই অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। এবার দেড়শ বছর পার হয়ে আসি একুশ শতকের বাংলাদেশে। এবার কল্পনা করুন টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ বা গাজীপুরের কোনো গার্মেন্টস কারখানা। হাজার হাজার শ্রমিক, বড় বড় নিটিং-ডাইং ইউনিট, রপ্তানি-অর্ডারের চাপ, রাত জেগে প্রোডাকশন– বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের হৃদস্পন্দন। কাগজে-কলমে এই খাত আজ ‘গ্লোবাল ভ্যালু চেইন’-এর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু হঠাৎ এক নতুন শর্ত এসে হাজির হয়– যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের শর্তটা শুনতে আকর্ষণীয়: ‘বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ১৯ শতাংশ থেকে শূন্য শুল্কে পাল্টা আমদানি করব। তবে একটা কথা - সেই পোশাক বানাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা আর ফাইবার দিয়ে।” কাগজে দেখলে মনে হয় দারুণ সুযোগ– শূন্য শুল্ক মানে মার্কিন বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক দাম, আরও অর্ডার, আরও কর্মসংস্থান। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই পুরনো গল্পের ছায়া দেখা যায়। একজন রপ্তানিকারক এখন হিসাব করবে: যদি আফ্রিকা, ব্রাজিল বা ভারতের তুলা ব্যবহার করি, তবে পোশাক ঢুকবে ১৯ শতাংশ শুল্কে; আর যদি মার্কিন তুলা নেই, তবে শুল্ক শূন্য। গাণিতিক হিসেবে খুব তাড়াতাড়িই সে দেখবে, মার্কিন তুলা-ফাইবার ব্যবহার না করলে বাজার হারানোর ঝুঁকি বেশি। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের স্পিনিং মিল, ফ্যাব্রিক সরবরাহকারী, লজিস্টিক চেইন– সবই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করবে মার্কিন কাঁচামালের দিকে। অন্য উৎস থেকে তুলা বা ফাইবার আনার পথ থেকে সরে যাওয়া শুরু করবে বাজারের নিজস্ব চাপেই। এর মানে কী দাঁড়াল? বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতে যে বিপুল শ্রম, বিনিয়োগ আর দক্ষতা তৈরি হয়েছে, তার টিকে থাকা আর মুনাফা এখন ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা আর কৃষিনীতির ওপর– ওরা কত উৎপাদন করবে, কত ভর্তুকি দেবে, কোন বাজারে কত দামে তুলা ছাড়বে। কোনো দিন যদি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসে, তাদের তুলা অন্য বাজারে সরে যায়, কিংবা নতুন শর্ত আসে, তার আঘাত এসে লাগবে সোজা বাংলাদেশের কারখানায়, শ্রমিকের চাকরিতে, ব্যাংকের ঋণে। উনিশ শতকের ল্যাঙ্কাশায়ার-ভারত সম্পর্ক যেমন ভারতকে কাঁচামাল জোগানদার আর প্রস্তুত পণ্যের বাজারে পরিণত করেছিল, তেমনই আজকের ‘শূন্য শুল্ক, তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা নিতে হবে’– ধরনের চুক্তি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতটিকে বেঁধে ফেলছে মার্কিন কৃষি-ব্যবসার আপস্ট্রিম শৃঙ্খলের সঙ্গে। নামটা আজ বাণিজ্য চুক্তি, ফ্রেমটা ‘পার্টনারশিপ’; কিন্তু ভেতরের গল্পটা খুব অচেনা নয়– একসময় ল্যাঙ্কাশায়ার মিলের প্রয়োজন যেভাবে ভারতীয় তুলার ভাগ্য ঠিক করত, আজ তেমনি কোনো ওয়াশিংটন-টেক্সাস মিলিত কৃষিনীতিই ঠিক করতে পারে বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার আগামীকাল। ২. উনিশ শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গর্ব করে বলত, “আমরা ভারতকে রক্ষা করছি।” ব্রিটিশ রাজ প্রমাণ হিসেবে দেখাতো টকটকে লাল কোটের সৈন্য, সজ্জিত পুলিশ, ঝকঝকে ব্যারাক, ক্যান্টনমেন্ট। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নাকি অশান্ত ভারতীয় ভূখণ্ডে ‘শৃঙ্খলা’ এনেছিল। সরকারি রিপোর্টে কিন্তু আরেকটা কথা খুব বেশি লেখা থাকত না। এই তথাকথিত ‘শৃঙ্খলা’ আর ‘রক্ষা’র খরচ কে দিচ্ছে? আর আসলে কার পকেট ভরছে? ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর যখন বন্দুক প্রয়োজন হত, অর্ডার মীরাটের কোনো কারিগরের কাছে, বা কলকাতার কোনো ওয়ার্কশপে যেত না। বরং অর্ডার চলে যেত বার্মিংহাম আর এনফিল্ডে। ইউনিফর্ম সেলাই হলে কাপড় আসত ব্রিটিশ কারখানা থেকে। সেনা পরিবহনের জন্য যে রেলওয়ে ওয়াগন আর স্টিমার বানাতে বা মেরামত করতে হতো, সেসব কন্ট্র্যাক্টও গিয়ে পড়ত ব্রিটিশ কোম্পানির টেবিলে। ভারতের কোষাগার থেকে টাকা বেরিয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেত না; তা ঘুরে ফিরে পৌঁছাত ব্রিটিশ অস্ত্র নির্মাতা আর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে, এশিয়ায় ব্রিটেনের সামরিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নাম করে। কাগজে-কলমে সব ছিল ‘নিরাপত্তা’র জন্য। বাস্তবে এটা ছিল একরকম পাইপলাইন: এক মাথায় ভারতীয় করদাতার টাকা ঢুকছে, অন্য মাথায় ব্রিটিশ অস্ত্র আর সাপ্লাই কোম্পানি নিশ্চিন্তে অর্থ তুলছে। ব্রিটিশরা যত বেশি ‘নিরাপত্তা’র গল্প বলত, তত গভীরে গেড়ে বসত সাম্রাজ্যের ব্যবসায়িক শিকড়। আর এই অস্ত্র কার দিকে তাক করা থাকতো? ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের দিকে। তাদের বলা হতো ‘সন্ত্রাসী’। সময় বদলে গেছে, স্থানও। এবার দৃশ্যটা নিয়ে আসুন ঢাকায়, আজকের দিনে। শব্দ বদলেছে– এখন কথা হয় ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’, ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’, ‘রিজিওনাল স্টেবিলিটি’ নিয়ে। ইউনিফর্ম আলাদা, পতাকা আলাদা। কিন্তু আড়ালের স্ক্রিপ্টে কান পাতলে, পুরোনো গল্পটাই অন্য ভাষায় শোনা যায়। নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে সূক্ষ্ম অক্ষরে তীক্ষ্ণ চাপ আছে। ধীরে ধীরে আরও বেশি মার্কিন নির্মিত নজরদারি সিস্টেম, কমিউনিকেশন গিয়ার, প্রিসিশন গাইডেড মুনিশন কেনার চাপ তৈরি হবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক ভাষায় কিছু রাজনৈতিক হুমকির ইঙ্গিত। চুক্তি পড়লে মনে হবে, কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে বড় অর্ডার না দেওয়াই ভালো। নাম উল্লেখ না থাকলেও বুঝতে বাকী থাকে না সেই দেশগুলো রাশিয়া বা চীন। তারা চায় একটু একটু করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কেনাকাটার পাল্লা যেন ভারী হতে থাকে একটি একক ইকোসিস্টেমের দিকে, যেখানে প্ল্যাটফর্ম মার্কিন, গোলাবারুদ মার্কিন, সফটওয়্যার আর এনক্রিপশন মার্কিন, স্পেয়ার পার্টসও মার্কিন। প্রতিটি ধাপে লাগে মার্কিন এক্সপোর্ট লাইসেন্স, আর তার মধ্য দিয়ে গরিবের অর্থ যেন যায় আমেরিকান ডিফেন্স ফার্মগুলোর দিকে। আর বাংলাদেশের শত্রু কারা যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার হবে? এই শত্রু কে হবে সেটাও কি ঠিক করে দেবে অন্য কেউ? ৩. উপনিবেশিক যুগে যখন প্রথম বাষ্প ইঞ্জিনগুলো ঝিক ঝিক করে যাত্রা শুরু করে, তখন সেগুলো শুধু যাত্রী বহন করত না। একটি পুরো সিস্টেম বহন করতো, যা চালু রাখতে লন্ডনে তৈরি রেল বগী, ইঞ্জিন ও সামরিক সরঞ্জাম কেনা হতো। ভারতীয় রাজস্ব থেকে তা পরিশোধ হত এবং ব্রিটিশ শিল্প মুনাফা করত। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন একটি নতুন উড়োজাহাজের চারপাশে উল্লাস দেখা যাবে, তখন ওই উদযাপনের আড়ালে দেখা যাবে নির্ভরতার নতুন শৃঙ্খল। চুক্তিটি প্যাকেজ আকারে আসে– বিমান, প্রশিক্ষণ, সার্ভিসিং নেটওয়ার্ক এবং ডলারে অর্থায়ন– যা অনেকটাই রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে নিয়ন্ত্রিত, কেবল বাণিজ্যিক প্রয়োজন দিয়ে নয়। দরিদ্র একটি দেশের জন্য এমন ক্রয় মানে দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক মুদ্রার দেনা; ডলারে কিস্তি, সুদ। এ সকল বাধ্যবাধকতা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় অবকাঠামো থেকে বাজেটকে সরিয়ে নেয়। অনেক সময় সস্তা ক্রয় বা লিজিং বিকল্পগুলি অন্যত্র পাওয়া যেতে পারে, কিংবা নতুন বিমান মূল রুট ও চাহিদার জন্য অপরিহার্য না-ও হতে পারে। বোয়িং কেনা কাগজে দেখায় ‘উন্নত এভিয়েশন, আধুনিক বহর’। বাস্তবে এগুলো ডলারে মূল্য নির্ধারিত, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বা লিজচুক্তিতে নেওয়া, আর আজীবন মার্কিন যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ আর প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাঁধা। যাত্রী পরিবহনের হিসাব ভুল হোক, বা জাতীয় এয়ারলাইনের দুর্নীতি, অদক্ষতা বাড়ুক– কিস্তি কিন্তু থামে না। লোকসান শেষ পর্যন্ত ওঠে জনগণের ঘাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ হয়ে। ঋণ ভারাক্রান্ত অর্থনীতির জন্য প্রকৃত অর্থেই ঋণফাঁদের এক রেসিপি। এ ধারাবাহিকতায় মার্কিনের সঙ্গে নতুন চুক্তি কার্যকর হবার আগেই আমরা দেখলাম বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের আমদানি ১৩৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ৪. ব্রিটিশ নীতি স্থানীয় বস্ত্র কারখানাগুলোকে খালি করে দিয়েছিল। শুল্ক, ক্রেডিট নিয়মকানুন ও অবকাঠামো এমনভাবে সাজানো ছিল যে আমদানি-উপযোগী পণ্যের পক্ষেই সুবিধা মেলে। তাই আইন অনুযায়ী অন্যদের প্রবেশ না থাকলেও বাজার পুরোপুরি ব্রিটিশ কাপড়ের জন্য সুবিধাজনক করে তোলা হয়েছিল। ভারতীয় তাঁতীরা অলস বসে থাকত। তাদের দক্ষতা হারিয়ে যেতে লাগলো, আর ব্রিটিশ কাপড়ই অধিকাংশ ভোক্তাদের কাছে বাস্তবসম্মত একমাত্র পছন্দ হয়ে উঠল। যা শুরু হয়েছিল বাণিজ্য হিসেবে, তা ধীরে ধীরে নির্ভরতার এক ব্যবস্থা হয়ে ওঠে। দেড়-দুই শতাব্দী পরে, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১৫ বছরের, ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি কেনার শর্ত দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ৮৩ শতাংশই ছিল ১০টি নির্দিষ্ট পণ্য, যার মূল্য ১৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে এলএনজি (৪ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা)। এর পরেই রয়েছে এলপিজি (৩ হাজার ১০৫ কোটি টাকা)। এদিকে সে সময় এলপিজি সিলিন্ডারের (১২ কেজি) সরকার নির্ধারিত দাম দুই বার বেড়ে মার্চের তুলনায় মোট ৫৯৯ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা হয়। গ্রাহক খুচরায় কিনতে গেলে সেই দাম আরও বেশি। আমদানি বাড়ে, কিন্তু দেশের মানুষের কী লাভ হয়? বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই গ্যাস-নির্ভর এবং বিদেশি দেনার বোঝায় ন্যুব্জ। এর মধ্যে এলএনজি আমদানির শর্ত শুধু এলএনজি কেনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, পাইপলাইন, রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালেও অর্থায়ন দরকার হবে। এই অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে সহজে ১৫ বছরের মধ্যে এলএনজি নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আসা যাবে না। সস্তা বিকল্প বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতেও বাধা তৈরি করবে- ব্যয়বহুল ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই চুক্তি প্রণোদনার দিক নির্ধারণ করবে-কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হবে, কোন শিল্প বিস্তৃত হবে, কোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হবে-ফলত: নীতিনির্ধারকদের ভিন্ন সস্তা জ্বালানি ব্যাবহারযোগ্য করে তোলার সুযোগ সংকুচিত হবে। ৫. বহুকাল আগে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতের অর্থনীতিকে এমনভাবে গঠন করেছিলেন যাতে ভারতে উৎপাদিত সম্পদ ও বাজার শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ কলকারখানার লাভ নিশ্চিত করে। আজকের বাণিজ্য চুক্তি দেখতে সেই পুরোনো রাজনৈতিক‑অর্থনৈতিক যুক্তিরই পুনরাবৃত্তি - শুধু নাম বদলেছে, কৌশল একই রয়ে গেছে। কাগজে‑কলমে স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছায় স্বাক্ষর করার স্বাধীনতা, বাস্তবে নানান চাপ। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে জিম্মি করে রাখার একটি সূক্ষ্ম কৌশল। বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় পরিস্থিতি এখন ঔপনিবেশিক আমলের মতো নয়। বাংলাদেশ আজ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে ঔপনিবেশিক সময়ের সাথে রয়েছে অস্বস্তিকর মিল। ঔপনিবেশিক চুক্তির মতোই এখানে দেখা যাচ্ছে অসম শক্তির সম্পর্ক, নির্ভরতার অর্থনীতি আর দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যতামূলক কেনাকাটার অদৃশ্য চাপ। আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ না হয়েও, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আর ভূরাজনীতিক স্বার্থ পূরণে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতাকেই আসলে বন্ধক রাখা হচ্ছে। ঔপনিবেশিক ধাঁচের চুক্তির সাথে এখানেই মিল পাওয়া যাচ্ছে এখনকার বাণিজ্যচুক্তির। এই চুক্তিকে প্রশ্নহীন রেখে দেয়ার অর্থ ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলের অর্থনৈতিক কাঠামোকেই স্বাগত জানানো। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, অ্যাকাউন্টিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়