ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না
Posted: 09 আগস্ট, 2026
অনেক দিন হলো লেখালেখির অভ্যাসটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। হঠাৎ করে একতার অফিস থেকে ফোন এলো- ‘একতা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আপনাকে একটা লেখা দিতে হবে’। আগে একতায় মাঝে-মধ্যে লিখতাম। সেই দায়বদ্ধতা থেকে অনুরোধটা আর ফেলতে পারলাম না।
কিন্তু লিখতে গিয়ে পড়ে গেলাম সমস্যায়। কারণ কী লিখবো, কী প্রসঙ্গে লিখবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছুটা ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ঘটনা প্রবাহ চলছে- সেই বিষয়গুলিকে উপজীব্য করে কিছু লেখা উচিত।
তাই সেই বিগত সরকারের আমল দিয়ে শুরু করলাম। তখন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। একটা দীর্ঘ সময় নিয়ে শেখ হাসিনা রাষ্ট্র চালাচ্ছেন। তার শাসনামলে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল। ঢাকায় মেট্রোরেল, রাস্তাঘাটের বিশাল বিশাল লেন, চট্টগ্রামের কর্ণফুলি নদীর নীচ দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আধুনিকায়ন, গৃহহীন মানুষের জন্য বিভিন্ন জায়গায় পাকা ঘরবাড়ি নির্মাণ, পদ্মা নদীর উপরে বিশাল সেতু নির্মাণ, যমুনা নদীতে পৃথকভাবে রেল সেতু নির্মাণ, সর্বোপরি রুপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সবই চোখে পড়ার মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন। মেগাপ্রকল্পের এক মহা তোড়জোড়।
একটি দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি যদি মানুষের জীবন মান উন্নয়নের প্রতি সমানতালে নজর না দেয়া হয় তা হলে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন মানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়। অতীতে আইয়ুব খানের শাসনামলে এই ধরনের অবকাঠামোগত উন্নয়নের হালহকিকত এ দেশের মানুষ স্বচক্ষে দর্শন করেছে।
জনজীবনের নানা সংকট নিয়ে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা রাজপথে ছিলাম। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে সরকারকে বারবার সতর্ক করেছিলাম জনজীবনের মান উন্নয়নে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার জন্য।
কিন্তু সরকার আমাদের বক্তব্যের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয়নি। উল্টো জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার অবদমিত করে নিজের একতরফা স্বৈরাচারী নীতি দিয়ে দেশ পরিচালনা করে নিজের বগল নিজেই বাজিয়ে জনগণকে মাতিয়ে রাখার এক ভেলকিবাজি খেলায় মেতে উঠেছিলেন। ফলে পরিণতি যা ঘটার ঐতিহাসিকভাবে তাই ঘটেছে। শেখ হাসিনা সর্বশেষ দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হলেন।
কিন্ত পরিহাসের বিষয় হলো এত বড় বিজয়ের পরও জনগণ তার কাক্সিক্ষত সাফল্য লাভ করতে ব্যর্থ হলো। জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধ এক শক্তি আবার নানা ঘটনা-প্রবাহের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে বসে জনগণের মাথার উপড়ে ছড়ি ঘোরাতে শুরু করে দিল। সুতরাং জনগণ যে অতল গহ্বরে পতিত ছিল সেই অতল গহ্বরেই পড়ে রইল। এবং যতই দিন যাচ্ছে ততই গহ্বরের আরো গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।
জনজীবনের নিরাপত্তা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। সূচনালগ্ন থেকে মব সন্ত্রাসের দোর্দণ্ড প্রভাবে মানুষ জান ও মালের নিরাপত্তা নিয়ে যে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় পড়েছিল আজও মানুষ সেই অবস্থার হাত থেকে মুক্তি পায়নি।
দেশের অর্থনীতিতে একটা চরম ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে এখন পর্যন্ত যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে শতাধিক শিল্প কারখানা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারখানায় যারা কর্মরত ছিলেন এমন প্রায় লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মচারী কর্মহীন হয়েছেন। আর এই হিসাবে প্রত্যক পরিবারে গড়ে যদি চার/ পাঁচজন করে লোক থাকেন তাহলে সরাসরি পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ লোক অত্যন্ত অমানবিকভাবে জীবন যাপন করছেন।
দেশের মোট জনশক্তির এক তৃতীয়াংশ মেহনতি জনগোষ্ঠীর হালহকিকত যে কি মাত্রায় চলে গেছে যে কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বেকারত্ব আর কর্মহীনতা মানুষকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ছিনতাই এত বেড়ে গেছে যে মানুষ এখন ঘর থেকে বাহিরে বের হতে সাতবার চিন্তা ভাবনা করছে। আর সেই সাথে একটি দেশের এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী যখন এইভাবে দুরাবস্থায় পতিত হয় তখন তার প্রভাব দেশের বাজার ব্যবস্থাপনাকে যে কি চরম পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেয় তা একটু গভীরভাবে ভাবলেই বুঝতে পারা যায়।
তার ওপর গত কয়েক দিন ধরে অতি বৃষ্টি ও বিভিন্ন জেলায় ভয়াবহ বন্যা দেশকে এক মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এর প্রভাব শুধু গ্রাম নয় নাগরিক জীবনকেও খুব দ্রুতই আচ্ছন্ন করবে বলে শঙ্কা হচ্ছে।
এর মধ্যেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে ছাত্রদের মাঝে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি লক্ষ্য করলাম। সরকারের বয়স ছয় মাসও পার হয়নি এর মধ্যে সরকারের জনপ্রিয়তা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। নতুন সরকারের প্রতি যে এত তাড়াতাড়ি যুব সমাজের একটা বিরাট অংশের মোহভঙ্গের চিড় ধরবে আশা করিনি।
বর্তমানে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন সরকার এসব সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপের কথা ভাবছে জানি না। তবে সময় থাকতে সাধু সাবধান না হলে ইতিহাস কাউকেই ছাড় দেয় না।
ড. ইউনূস এক বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। বিভিন্ন বিষয়ে তার অনেক আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু পারিপার্শ্বিক নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তার সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তা সত্ত্বে¡ও তার পরিকল্পনার মূল অংশের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেননি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ব্লুপ্রিন্ট এদেশের মাটিতে বাস্তবায়নের দাবার গুটির প্রথম চাল তিনি ইতিমধ্যেই দিয়ে ফেলেছেন। এখন নিরাপদ দূরত্বে বসে গুটি চালাচালি করছেন। সবটা মিলে বাংলাদেশের মানুষ এখন এক মহা বিপদের মধ্যে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দেশে কোনো শক্তিশালী আন্দোলন নাই। সমাজের এক শ্রেণির মানুষ তার দৈনন্দিন জীবন যাপনের সংস্থান নিয়ে ব্যস্ত। আর মধ্যবিত্তের মধ্যে কাজ করছে নানা বিষয়ের টানাপড়েন। অন্যদিকে সুবিধাবাদীরা ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত।
সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় দেশের মানুষ আজ পাল ছিঁড়ে যাওয়া এক ডুবন্ত নৌকার দুরন্ত যাত্রী। এই মূঢ় ম্লান মুখে কে দিবে ভাষা, কে দিবে আশা, কে শোনাবে উত্তরণের গান- এই হলো আমাদের বাংলাদেশের অবস্থা।
তবে হাল ছেড়ে দিলে তো হবে না। চোখের সামনে তরীটা উলটে যাবে আর আমরা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবো- তা হতে দেয়া যাবে না। ৩০ লক্ষ শহীদ আর ২ লক্ষ মা বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই দেশ একটি কুচক্রী মহলের হুংকারে উড়ে যাবে তা কখনই হবে না। দেশের সকল বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে, সেই সাথে দেশের সকল দেশপ্রেমিক শক্তি ও ব্যক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করে লড়াইয়ের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।
শেষে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে চাই “দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার হে, লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার! ... কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার... যাত্রীরা হুঁশিয়ার।
লেখক : সদস্য, দিনাজপুর জেলা কমিটি, সিপিবি