কমরেড রতন সেনের জীবন ও সংগ্রাম

Posted: 19 জুলাই, 2026

কিংবদন্তি কমিউনিস্ট নেতা, সর্বস্ব ত্যাগী, খুলনার গণমানুষের প্রিয় নেতা কমরেড রতন সেন। এই মহান বিপ্লবী’র জন্ম ১৯২৩ সালে ৩ এপ্রিল বরিশাল জেলার উজিরপুরে। পিতা নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত খুলনার ব্রজলাল কলেজের প্রধান সহকারী ছিলেন, সেই সুবাদে রতন সেনের ছোটবেলা কেটেছে কলেজ কোয়াটারে পরিবারের সঙ্গে। দৌলতপুর মুহসিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ১৯৩৮ সালে মুহসিন হাইস্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪০ সালে দৌলতপুর হিন্দু একাডেমি (ব্রজলাল কলেজ) থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিএ(অনার্স) ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন। কলেজে ছাত্র ধর্মঘটে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে তিনি গ্রেফতার হন এবং জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে ১৯৪২ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। কমরেড রতন সেন মার্কসবাদী পন্ডিত ছিলেন। চিরায়ত মার্ক্সীয় সাহিত্যের বাহিরে সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে তিনি লেখালেখি ও অনর্গল কথা বলতে পারতেন। রাজনীতির হাতেখড়ি মুহসিন হাইস্কুলে পড়ার সময় বড় ভাই মোহিত সেনগুপ্তের হাত ধরে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। মোহিত সেন অনুশীলন দল ও পরবর্তীতে বিপ্লবী কর্মকান্ডের সংগঠন যশোর খুলনা যুব সংঘের সাথে যুক্ত ছিলেন। রতন সেন তৎকালীন ছাত্র সমিতিতে যোগদান করেন এবং কলেজে ছাত্রদের লড়াই সংগ্রামে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৩৬ সালে বিশ্ব ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জেমস ক্লুগম্যান ভারতে আসেন এবং কলকাতার এক ছাত্রসভায় “ভারতীয় ছাত্র ফেডারেশন” গঠন করেন। প্রাদেশিক কমিটিতে দৌলতপুর কলেজের ছাত্র নেতারাও ছিলেন। রতন সেন ছাত্র ফেডারেশনের কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। কলেজ ছাত্রদের কিছু ন্যায়সঙ্গত দাবিতে দৌলতপুর কলেজে ১৪ দিন ধরে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। এই আন্দোলনে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে রতন সেন গ্রেফতার হন। তিনি দুই বছর জেলে ছিলেন, জেলখানায় বসে বিএ পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় প্রমথ ভৌমিক, ভবানী সেনগুপ্ত, সচিন বসু প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। ১৯৪২ সালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির গর্বিত সদস্যপদ লাভ করেন। যশোর-খুলনা যুব সংঘের সাথে থেকে কৃষকদের নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান এবং গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিবারের সকলে দেশত্যাগ করলেও তিনি চলে যাননি, নাড়ির টানে মাটির টানে থেকে গেছেন। শিক্ষকতা পেশায় যোগদান পার্টির পরামর্শে ১৯৪৫ সালে কমরেড রতন সেন বটিয়াঘাটার বয়ার ভাঙ্গা বিশ্বম্ভর হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে জেলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে বেরিয়ে জেলসঙ্গী কৃষক নেতা শান্তি ঘোষের রুপসার মৈশাঘুনির বাড়িতে ওঠেন। শান্তি ঘোষের অনুরোধে রুপসার আজগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষাকতা আরম্ভ করেন। ১৯৫৮ সালে গ্রেফতার হন, পরবর্তীতে ৬৯ সালে মুক্তির পেয়ে একই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। অচিরেই তিনি স্কুলের ছাত্র অভিভাবকের কাছে প্রিয় মাষ্টার মশাই হয়ে ওঠেন। কৃষক আন্দোলন বটিয়াঘাটায় শিক্ষকতার সময় কৃষক সমিতির কাজ শুরু করেন। খুলনা- বাগেরহাট অঞ্চলে কৃষক সমিতি গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৬ সালে খুলনার মৌভোগে প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনে তিনি ছিলেন সামনের কাতারে। যে সম্মেলনে ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সম্মেলনে কমরেড মুজাফফর আহমদ, জ্যোতি বসু, মুনসুর হাবিবউল্লাহ, সাজ্জাদ জহির, কবি বিষ্ণু দে প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তেভাগা আন্দোলনে তিনি সামনের কাতারে ছিলেন। সেই সময় দক্ষিণ অঞ্চলে লবণ পানির জন্য ফসল উৎপাদন কম হতো, রতন সেন লবণ পানি থেকে ফসল রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করেন। কমরেড রতন সেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। জমিদার জোতদারের অত্যাচার নির্যাতন রুখে দাঁড়ান, দক্ষিণ অঞ্চলে হাটঘাটে বর্ধিত টোল আদায় বন্ধ, তিল বিক্রিতে ৪২ সেরে মণ প্রথা বন্ধ, জোরদার মহাজন কর্তৃক বর্গাচাষিদের কাছ থেকে নেয়া তাগাবী ও সেলামী প্রথা বাতিল, ফসলের লাভজনক দামসহ কৃষকদের নানা সমস্যা নিয়ে লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলেন। তিনি কৃষক সমিতি খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। জেল জীবন কমরেড রতন সেনের ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ২৪ বছর কেটেছে জেলখানায় আথবা আত্মগোপনে। দৌলতপুর কলেজের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের ২৪ বছরের ১৯ বছর তিনি জেলে ছিলেন। স্বাধীনতার পরেও একাধিক বার জেলে খেটেছেন। ১৯৪৮ সালে দৌলতপুর কলেজ রেল স্টেশন থেকে তাকে গ্রেফতার করে লোকাল ট্রেনে তুলে খুলনা রেল স্টেশনে আনা হয়, পরে পুলিশের জিপ গাড়ির পেছনে বেঁধে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে সদর থানায় নিয়ে আসে। এই অমানবিক নির্যাতন দেখে সেদিন খুলনা শহরের মানুষ শুধু হতবাকই হয়নি, পাকিস্তানি শাসকদের বর্বরতাও প্রত্যক্ষ করেছিল। জেলে বসে আন্দোলন কমরেড রতন সেন, অমর কৃষক নেতা বিষ্ণু চ্যাটার্জিসহ পার্টির অসংখ্য নেতৃবৃন্দ তখন জেলে ছিলেন। সেই আমলে খুলনা জেলখানায় কয়েদিদের দিয়ে ঘানি টানানো হতো। পার্টির নেতৃবৃন্দ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে অনশন শুরু করে। প্রায় দুই মাস ধরে অনশন চলে, কিছুদিন যেতে না যেতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দেয়া হয়। জোর করে খাওয়াতে গিয়ে ডুমুরিয়ার সাহস গ্রামের কৃষক নেতা আফছার মোড়ল ও লাটিপেটায় নিহত হন বটিয়াঘাটার বাদামতলা গ্রামের বিষ্ণু বৈরাগী। কমরেড রতন সেন রাইফেলের আঘাতে গুরুতর আহত হন। কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি, রতন সেন, কুমার মিত্র প্রমুখ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্তি পান ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে তিনি আবারও গ্রেফতার হন, মুক্তি পান ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময়। কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তি ১৯৬৬ সালে চীন-রাশিয়া দ্বন্দ্বে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মত পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যায়। খুলনা যশোর অঞ্চলে অধিকাংশ নেতাকর্মীরা চীনপন্থিদের পথ অনুসরণ করেন। ১৯৬৯ সালে কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি ও কমরেড রতন সেন মুক্তি পেয়ে রুশপন্থিদের পক্ষ অবলম্বন করেন। কমরেড রতন সেন আজগড়া হাই স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন ছাত্র যুবদের নিয়ে কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জির খানকার বাড়িতে পার্টি গুপ্ত গঠন করে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শুরু করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ মতিউর রহমান, সরদার মোতাহার উদ্দিন, নুরুজ্জান বাচ্চু, কাজী জাহাঙ্গীর, এটিএম খালিদ, রওনকুল ইসলাম বাবর, শেখ মনিরুজ্জান, সৈয়দ মজনুর রহমান, এস এম বাবর আলীসহ আরো অনেকে। এই সময় বটিয়াঘাটা, দৌলতপুর, চিতলমারী, খুলনা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগ করে গণসংগঠন কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগে পার্টিকে নতুন করে দাঁড় করাতে সক্ষম হন। খালিশপুরে পাটকল শ্রমিক, শহরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক, রুপসা শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে কমরেড রতন সেন মহান মুক্তিযুদ্ধে কমরেড রতন সেন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে মার্চ মাসের দিনগুলোতে তিনি খুলনা বাগেরহাটের বিভিন্ন থানা থেকে পার্টির নেতাকর্মীদের যুদ্ধে প্রস্তুতির জন্য ভারতে ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠাতে থাকেন। খুলনাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো বন্ধুক মালিক যাতে বন্ধুক প্রশাসনের কাছে জমা না দেন সেই চেষ্টা করেন। ১১ এপ্রিল প্রিয় সহযোদ্ধা কমরেড বিষ্ণু চ্যাটার্জি পাক বাহিনীর দোসরদের হাতে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এই মহান বিপ্লবীকে হারনোর পর পার্টি নেতৃবৃন্দ কোলকাতায় অবস্থানরত খুলনার পার্টি কর্মীকে পাঠিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে যান। প্রথম দিকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাটে এবং পরে টাকী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান করেন। তিনি শরণার্থী ক্যাম্প থেকে যুবকদের সংগঠিত করে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিতেন। এছাড়া তার এদেশের এককালীন সহযোদ্ধা ১৯৪৭ সালে দেশত্যাগকারী কমরেড কুমার মিত্র, স্বদেশ বসু, ভবানী সেনগুপ্ত, ধনঞ্জয় দাস প্রমুখ পার্টি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। ন্যাপ-ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির যৌথ গেরিলা বাহিনীর ট্রেনিং ও রণাঙ্গনে পাঠানোর কাজ সুচারুভাবে পরিচালনা করেন। স্বাধীনতা-উত্তর পার্টির কাজ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর গোটা পার্টি নেতৃবৃন্দ দেশ গঠনের কাজে ছড়িয়ে পড়েন। জেলার সকল থানাসহ বাগেরহাটে পার্টির কাজ সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার এই একান্ত প্রচেষ্টায় খুলনাতে কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। স্বাধীনতার পর তিনি পার্টির খুলনা জেলা কমিটি সম্পাদক ও তৃতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। চতুর্থ কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। পঞ্চম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও জেলা পর্যায়ে সভাপতির পদ সৃষ্টি হলে খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখি স্বাধীনতা, দেনিক সংবাদ, একতা, মুক্তির দিগন্ত’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ পরিবেশন ও লেখালেখি করতেন। ঢাকায় থাকাকালীন তিনি সাপ্তাহিক একতার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন পত্রিকায় তার প্রকাশিত লেখা পুস্তিকা আকারে ছেপে বিতরণ করতেন। কোন কোন পত্রিকায় মো. রফিক ছদ্মনামে লিখতেন। ইংরেজিতে তার ভীষণ দখল ছিল, মুক্তির দিগন্তের অনেক লেখা বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকা থেকে অনুবাদ করতেন। প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন নামে দুটি বই তিনি অনুবাদ করেন। কমরেড রতন সেনের বিভিন্ন সময় প্রকাশিত কিছু রচনা নিয়ে “রতন সেন রচনা সংগ্রহ” কমরেড রতন সেন পাবলিক লাইব্রেরি সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। পরোপকারী ও সাদাসিধে জীবন কমরেড রতন সেন সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। রুপসার ডুমরার বাড়িতে বসবাস করতেন। যেখানে কমরেড রতন সেন কলেজিয়েট গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় পাঁচ মাইল পথ কখনও রিকশায় কখনও পায় হেঁটে আবার কখনও সাইকেল চালিয়ে রুপসা নদী পার হয়ে খুলনা পার্টি অফিসে আসতেন। শহরে কোন কাজ না থাকলে দুপুর ১টার দিকে ডোমরায় ফিরে যেতেন এবং তিনি নিজে রান্না করে খেতেন। তার সংগ্রহে অনেক বই ছিল, কিন্তু রাখার জন্য কোন সেলফ্ ছিল না। নিজের গাছের ফল অথবা কখনো কিনে এনে প্রতিবেশীদের দিতেন। ছোট ছেলেমেয়েদের খুবই ভালবাসতেন। স্কুলের বাচ্চাদের পড়া দেখিয়ে দেওয়া, গরিব ছেলেমেয়েদের বই কিনে দেওয়া, স্কুলের বেতন দিয়ে দেওয়া তাঁর নিয়মিত কাজ ছিল। শহরের পথশিশুদের ডেকে এনে খাবার-কাপড়-খেলাধুলার সামগ্রী কিনে দিতেন। বিদেশ থেকে তার ভাইপোদের পাঠানো টাকা পার্টির কাজের বাহিরে এভাবে খরচ করতেন। গ্রাম থেকে আসা পার্টি কমরেডদের আনা খাদ্যসামগ্রী অন্য কমরেডদের সাথে নিয়ে আনন্দ করে খেতেন। তিনি হোমিওপ্যাথিক প্র্যাকটিস করতেন, তার সামনে কেউ সাধারণ কোন অসুখের কথা বললে ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে খাইয়ে দিতেন। সংস্কৃতিমনা রতন সেন কমরেড রতন সেন সংস্কৃতি মনা মানুষ ছিলেন। সংস্কৃতির উন্নয়নে সব সময় তিনি জোরালো ভূমিকা রাখতেন। গান খুব তার প্রিয় ছিল। রবীন্দ্র সংগীত প্রায়ই তিনি শুন শুন করে গাইতেন। তার কণ্ঠে “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে একলা চলো রে” গানটির অন্তত আংশিক শুনে নাই, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কষ্ট। তিনি নিয়মিত রেডিওতে খবর গান নাটক শুনতেন। পরবর্তীতে পার্টির জেলা কমিটির সংগঠক কমরেড হাবিবুর রহমান মস্কো থেকে একটি টেপরেকর্ডার এনে দিয়েছিলেন। শেষের দিনগুলোতে অবসরে লিখতেন ও গান শুনতেন। চিংড়ি ঘের বিরোধী আন্দোলন আশির দশকে তার পরিকল্পনায় দক্ষিণ খুলনায় নানা আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে ওঠে। পার্টির উদ্যোগে লবণ পানির চিংড়ি ঘের বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে দাকোপের শ্রীনগর, জেলেখালী, বটবুনিয়া, বটিয়াঘাটার গঙ্গারামপুর, বুজবুনিয়া, ধাদুয়া, কড়িয়া গ্রামে। কৃষক নেতা অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাসসহ অন্যান্য নেতার সক্রিয় অংশগ্রহণে জোরদার আন্দোলন গড়ে ওঠেছিল। খুলনার মানুষের বুঝতে কষ্ট হয়নি এই সকল আন্দোলনের রুপকার কমরেড রতন সেন। কমরেড রতন সেন বলেছিলেন চিংড়ি চাষ করে কৃষক এই মুহূর্তে হয়তো কিছুটা লাভের মুখ দেখছেন, কিন্তু এমন একদিন আসবে চিংড়িও হবে না, লবণাক্ততার জন্য ধানও হবে না। রতন সেনের সেই কথা সত্য হতে খুব বেশি দিন সময় লাগেনি। জোরালো আন্দোলনের ফলে সরকার জাতীয় সংসদে চিংড়ি চাষের নীতিমালা তৈরি করতে বাধ্য হয়। এই লড়াইকে খুলনার লবণ পানির চিংড়ি চাষ করে উঠতি ধনী ও মাফিয়া চক্র এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা সহজভাবে নেয়নি। শহরের বড় বড় মাস্তান ঘের রক্ষা করতে গিয়ে সেদিন আগ্নেয়াস্ত্র, স্পিড বোট ফেলে পালাতে বাধ্য হয়েছিল। শেষের দিনগুলো ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে কিছুদিনের মধ্যে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন জোরালো হয়। গোলাম আযমের ফাঁসির দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন সংগ্রাম চলতে থাকে। ঢাকায় গণআদালতে গোলাম আযমের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়। চল্লিশ জন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও নেতার নামে রাজদ্রোহী মামলা দেওয়া হয়। খুলনার নেতাদের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা দেওয়া হয়। দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় খুলনায় ভারতের দালাল বলে ২০ জন নেতৃবৃন্দের নাম প্রকাশ করা হয়। কমরেড রতন সেন সেই তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। তার অল্প কিছু দিন পরে ৩১ জুলাই ১৯৯২ সকালে বাগেরহাটে যাওয়ার জন্য ডোমরার বাড়ি থেকে বের হন। রুপসা নদীর জেলখানা ঘাট পার হয়ে রিকশাযোগে যখন খুলনা ডিসি এসপি অফিসের সামনে তখন ঘড়িতে সকাল ৯টা, হঠাৎ ৪/৫ জন ঘাতক রিকশার সামনে এসে গতিরোধ করে। একজন বুকে পেটে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করলে মুহূর্তে তিনি লুটিয়ে পড়েন। চারিদিক থেকে লোকজন ছুটে এলে ঘাতকরা পালিয়ে যায়। উপস্থিত সকলে ধরাধরি করে খুলনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে চারিদিক থেকে মানুষ হাসপাতালে ভিড় করে। পরে মরদেহ শহীদ হাদিস পার্কে আনা হয়। মানুষের ভিড় বেড়ে একসময় শহীদ হাদিস পার্ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বিকেলে মরদেহ মর্গে রাখা হয়। ১ আগস্ট সকাল ১০টায় তাঁর মরদেহ শহীদ হাদিস পার্কে সর্বসাধারণের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হয়। ইতোমধ্যে জাতীয় নেতৃবৃন্দ খুলনায় এসে পৌঁছান, হাজার হাজার লোক শহীদ হাদিস পার্ক উপচে পার্শ্ববর্তী রাস্তায় অবস্থান নেয়। শেষ শ্রদ্ধার পর শুরু হয় শবযাত্রা, যখন মরদেহ রুপসা মহাশ্মশানে পৌঁছায় তখনও মানুষ শহীদ হাদিস পার্ক থেকে বের হচ্ছেন। জাতীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে শহীদ হাদিস পার্কে অনুষ্ঠিত শোকসভা খুলনাবাসীর কাছ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হত্যার বিচার চেয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে খুলনাসহ সারাদেশে আন্দোলন সংগ্রাম চলতে থাকে। একপর্যায়ে আসামি গ্রেফতার হয়। আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গডফাদারাও গ্রেফতার হন। জেলগেটে টিআই প্যারেডে একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাওয়ালা আসামিদের শনাক্ত করেন। পরবর্তীতে রিকশাওয়ালা নিখোঁজ হয়ে যান। আদালতে মামলাটি দীর্ঘসূত্রতার পর অনেকবার রায়ের দিন পরিবর্তনের পর অবশেষে জজকোর্ট সব আসামিকে বেকসুর খালাস দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। পরে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়, কিন্তু আজ অবধি কোনো সুরাহা হয়নি। রায়ের পর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির খুলনার আহ্বায়ক ন্যাপ নেতা অ্যাড. আব্দুল হালিম “কমরেড রতন সেন মরেনি” শিরোনামে পত্রিকায় লিখেছিলেন। তিনি তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছিলেন–প্রত্যক্ষদর্শী আসামিদের শনাক্ত করলেন, আসামিরা দোষ স্বীকার করলো, হুকুমদাতার নাম প্রকাশ করলো, অথচ কারো কোনো সাজা হলো না। কমরেড রতন সেনরা মরে না, রতন সেন বেঁচে থাকবেন এদেশের মেহনতি মানুষের আন্দোলন সংগ্রামে। এদেশে শোষণ বৈষম্য লুটপাটের সমাজ ভেঙে সমাজতন্ত্র কায়েমের মধ্য দিয়ে কমরেড রতন সেনের হত্যার বদলা নেওয়া হবে–এটাই তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর অঙ্গীকার। (কমরেড রতন সেন জন্মশতবার্ষিকীর আলোচনা সভায় পঠিত)