বিশ্বকাপে কে জিতল?

Posted: 19 জুলাই, 2026

একতা ক্রীড়া প্রতিবেদক : শিরোপা লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা কিংবা স্পেন- কোনো এক দল জিতবে। কিন্তু বিশ্বকাপকে ঘিরে মাঠের বাইরের নানা খেলায় কারা জিতল, কারা হারল? প্রায় শতবর্ষী টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আসর চলছে এবার, উত্তর আমেরিকার তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয়। ১৯৩০ সালে ১৬ দল নিয়ে যে টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল (নানা কারণে প্রথম আসরে তিনটি দল শেষ পর্যন্ত অংশ নিতে পারেনি), সেখানে এবার খেলছে ৪৮ দল। দুয়েক আসরের মধ্যে সেটাকে ৬৪ দলে উন্নীত করার একটা সক্রিয় চেষ্টা আছে ফিফার। মাঠে ফুটবলের তারকা-মহাতারকা গড়েছেন নানা কীর্তি। অনেক অর্জন ধরা দিয়েছে তাদের হাতে। আর বাইরে? তাদের পারফরম্যান্সে ব্যবসা হয়েছে হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে সবাই যে ভাগ পেয়েছে এমন কিন্তু না। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা বিশ্বকাপ শেষ হবে ২০ জুলাই। তার আগে এ বিশ্বকাপে প্রথম জয়ী কে? অবশ্যই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা- ফিফা। কত অর্থ আয় করেছে তারা? ২০২২ কাতার আসরে তারা আয় করেছিল রেকর্ড ৭৬০ কোটি ডলার। প্রাথমিক যে আভাস সেটা চোখ কপালে তোলার মতো। জার্মান ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার হিসাব অনুযায়ী এই চার বছরে ফিফার রাজস্ব ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ছাড়াতে যাচ্ছে। ফিফার আয় আসে কোন কোন খাত থেকে? বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থার মূল আয় আসে সম্প্রচার, লাইসেন্সিং ও হসপিটালিটি স্বত্ব, স্পন্সর ও টিকেট বিক্রি থেকে। এর পাশাপাশি এবার টিকেটের সেকেন্ডারি মার্কেটেও হাত দিয়েছে তারা। পুনর্বিক্রির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ফি নিচ্ছে তারা বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়ের কাছ থেকেই! কারও কারও ধারণা ৬৪ দলের টুর্নামেন্টে চীন ও ভারতকে যুক্ত করতে চায় ফিফা। এতে চোখের পলকে শতকোটি দর্শক পেয়ে যাবে তারা। সবচেয়ে বড় হার কাদের? ভক্তদের। কেউ এক জীবন স্বপ্ন হয়তো পূরণ করেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিক দিক থেকে এবার প্রচণ্ড চাপ সইতে হয়েছে তাদের। চাহিদা অনুযায়ী টিকেটের দাম বৃদ্ধির কৌশল নিয়েছে এবার ফিফা, এতে স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়তি দামে টিকেট কিনতে হয়েছে ভক্তদের। টিকেটের দাম এতো বেশি যে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তার দেশের প্রথম ম্যাচের টিকেট ১ হাজার ডলার দিয়ে তিনি কিনতেন না। তার মধ্যে ফাইনালের টিকেট নিয়ে চলছে এলাহী কারবার। নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে অফিসিয়ালি টিকেটের দাম যেন আকাশ ছুঁয়েছে। প্রতিটির দাম হাঁকা হচ্ছে প্রায় ৩৩ হাজার ডলার। পুনর্বিক্রির কিছু টিকেটের দাম ২০ লাখ ডলারেরও বেশি! বিপত্তি যে শুধু টিকেটের দাম তাই নয়, সব ক্ষেত্রেই বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে ভক্তদের। মাঠে যেতে যে ট্রেনের টিকেট ছিল ১২ দশমিক ৯০ ডলার, সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ ডলারে। আরেক জয়ী? ফিফার সঙ্গী সম্প্রচারক ও স্পন্সর স্বাভাবিক ব্যবসার বাইরে এবার দুই অর্ধে আড়াই মিনিটের দুটি ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ থেকে প্রচুর অর্থ আয় করেছে সম্প্রচারকরা। মৃত্যুর আগে এই আসর নিয়ে বলতে গিয়ে ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনা বলেছিলেন, বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের সুবিধার্থে চারটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হবে ফুটবল ম্যাচকে। সেটাই সত্যি হয়েছে এবার। মাঠে বৃষ্টির মধ্যেও দেওয়া হয়েছে হাইড্রেশন ব্রেক। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনের জন্য ফক্স স্পোর্টস আয় করেছে ২ থেকে ৩ লাখ ডলার। যেটা বাড়তে বাড়তে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া ম্যাচগুলোতে সাড়ে ৭ লাখ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। কেবল হাইড্রেশন ব্রেক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফক্স স্পোর্টসের আয় হতে পারে ২৫ লাখ ডলার। পাশাপাশি অ্যাডিডাস, কোকা কোলার মতো স্পন্সররা বিপুল অর্থ আয় করেছে। ক্ষতি হয়েছে স্বাগতিক শহরের। তিন শেষের ১৬টি শহর বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করে। ধারণা ছিল, বিপুল ভক্তদের সমাগমে জমে উঠবে পর্যটন, হোটেল ও স্থানীয় ব্যবসা। সেগুলোর প্রায় কিছুই বাস্তবে ঘটেনি। ফিফার প্রাথমিক হিসাবে বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ থেকে ৪ হাজার একশ কোটি ডলার যুক্ত হবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। এর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যুক্ত হবে ১ হাজার সাতশ কোটি ডলার। বিভিন্ন খাতে তৈরি হবে ১ লাখ ৮৫ হাজার কর্মসংস্থান। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাগতিক শহরগুলোর দীর্ঘ মেয়াদী সুফল পাওয়ার বাস্তবিক কোনো সম্ভাবনা নেই। পর্যটকদের দিক থেকে বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। টুর্নামেন্টের বিশৃঙ্খলা এড়াতে উল্টো পর্যটক গেছে কমে। ছোটখাটো কিছু কর্মসংস্থান হয়তো তৈরি হয়েছে কিন্তু সত্যিকার অর্থ সেগুলো থেকে আয় হয়নি খুব একটা। হোটেল ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠবে বলে ধারণা ছিল। কিন্তু ঘটেছে উল্টোটা। বরং গত বছরের তুলনায় এবার হোটেল বুকিং কম হয়েছে বিভিন্ন শহরে। বিশাল অংকের ব্যবসা করেছে বাজিকর প্রতিষ্ঠানগুলো। এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজির ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। বাজির জন্য এখানে লেনদেন হতে পারে প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার। প্রতি ম্যাচে বাজির লেনদেনে হাত বদল হয় প্রায় ৫০ কোটি ডলার।