চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক
Posted: 19 জুলাই, 2026
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। দেশের অধিকাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দরটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে কনসেশন ভিত্তিতে পরিচালনার উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়; বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান বাস্তবতায় এনসিটি ইজারার উদ্যোগ নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাতিল বা পুনর্মূল্যায়ন করলেও জাতীয় স্বার্থবিরোধী এনসিটি ইজারার উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
চট্টগ্রামের শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, বন্দর শ্রমিক এবং জাতীয়ভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক আন্দোলন-প্রতিরোধের মুখে সে সময় সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান সরকারও বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়নের পরিবর্তে পূর্ববর্তী সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে। অথচ দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিল্পখাতের মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ফলে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির সঙ্গে এই উদ্যোগের সামঞ্জস্য নিয়েও জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জনগণের ভোটে একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের স্বার্থ দেখা, বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ দেখা নয়।
অর্থনৈতিক প্রভাব
এনসিটি ও সিসিটি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জনবল এসব টার্মিনাল সফলভাবে পরিচালনা করে আসছে।
বর্তমান অবকাঠামো, বিদ্যমান যন্ত্রপাতি এবং পরিচালন সক্ষমতা বিবেচনায় দেশীয় ব্যবস্থাপনায় যখন সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তখন বিদেশি অপারেটরের কাছে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তা কী?
উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো, চূড়ান্ত ইজারা চুক্তির আগেই কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ প্রায় ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, এই মূল্যবৃদ্ধি আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বৃদ্ধি করবে এবং শেষ পর্যন্ত শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বন্দর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ভবিষ্যৎ অপারেটরদের জন্য একটি উচ্চ আয়ের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই এই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
রাজস্ব কাঠামোর পরিবর্তনে আয় কমবে
ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবিত মডেলে এনসিটির রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো পরিবর্তিত হলে বাংলাদেশের আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বন্দর ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা। প্রস্তাব অনুযায়ী, টার্মিনালের রাজস্ব প্রথমে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোষাগারে জমা না হয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে সংগ্রহ করা হবে এবং পরবর্তীতে চুক্তি অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্ধারিত অংশ প্রদান করা হবে। বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা থেকে অর্জিত উদ্বৃত্ত ও রাজস্বের নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই কাঠামো পরিবর্তিত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে বাংলাদেশ সরাসরি টার্মিনালের সম্পূর্ণ পরিচালনাগত আয় না পেয়ে কেবল চুক্তিতে নির্ধারিত ইজারা ফি বা রাজস্বের অংশ পাবে। ফলে চুক্তির আর্থিক শর্ত অনুকূল না হলে বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় সরকারের নিট আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে সংগৃহীত অর্থ বিদেশে অবস্থান করলে তার আর্থিক সুবিধা বাংলাদেশ নয়, বরং অপারেটর প্রতিষ্ঠান ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দুর্নীতি ও দক্ষতা প্রসঙ্গ
বিদেশি অপারেটর এলে দুর্নীতি কমবে- এমন ধারণা প্রায়ই প্রচার করা হয়। এটা সত্যের অপলাপ। কিন্তু দুর্নীতির মূল কারণ চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং তদারকির ঘাটতি। বন্দর প্রশাসন দক্ষ, স্বচ্ছ এবং দুর্নীতিমুক্ত হলে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
একইভাবে কনটেইনার জট বা বন্দরের ধীরগতির জন্য শুধু বন্দরকে দায়ী করা যায় না। কাস্টমসের ডকুমেন্টেশন, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন প্রক্রিয়াও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই সমস্যাগুলোর সমাধান করার উদ্যোগ নেয়াই হলো সরকারের প্রধান কর্তব্য, বন্দর অন্যদেরকে দেয়া নয়।
পিসিটি ইজারার অভিজ্ঞতা
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) বিদেশি অপারেটরের কাছে পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালসের কাছে পিসিটির পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর করে। ইজারার সময় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের কথা সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে প্রচার করা হলেও শুরুতে সেই বিনিয়োগ দৃশ্যমান হয়নি। পরবর্তীকালে অতি সম্প্রতি কিছু নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে বটে কিন্তু সেগুলোর একটি বড় অংশ পরিচালনার কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয়ের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে পিসিটির অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত করে যে, শুধু বিদেশি অপারেটর নিয়োগই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন বিনিয়োগ বা কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয় না; প্রকৃত ফলাফল নির্ভর করে চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর তদারকির ওপর।
জাতীয় নিরাপত্তা
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল। এর আশপাশে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, বিমানবাহিনীর স্থাপনা, ইস্টার্ন রিফাইনারি এবং জ্বালানি অবকাঠামো অবস্থিত।
বন্দর পরিচালনার সঙ্গে বাণিজ্যিক তথ্য, জাহাজ চলাচল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা জড়িত। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
জিবুতি সরকার ২০০৬ সালে ডোরালেহ কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন (ইজারা) চুক্তি স্বাক্ষর করে। তবে ২০১৮ সালে জিবুতি সরকার অভিযোগ তোলে যে, চুক্তিটি দেশের সার্বভৌম স্বার্থ ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর এবং এর কিছু শর্ত অন্যায্য ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী। এই যুক্তিতে সরকার একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করে টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতে ফিরিয়ে নেয়। এর পর ডিপি ওয়ার্ল্ড আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে একাধিক মামলা করে এবং দীর্ঘ আইনি বিরোধ শুরু হয়। যদিও জিবুতি সরকার বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়, তবুও দেশটিকে উল্লেখযোগ্য আইনি ব্যয় বহন করতে হয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে, কৌশলগত বন্দর-সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের আগে আইনি সুরক্ষা, স্বচ্ছতা, ন্যায্য চুক্তির শর্ত এবং জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্বের বিষয় নয়; বরং কৌশলগত অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
চট্টগ্রাম বন্দরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা সরকারের না বোঝার কোনো কারণ নাই।
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি কেবল দুটি টার্মিনাল নয়; এগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বৈদেশিক বাণিজ্য, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমাদের বিশ্বাস, এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়া হলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হবে। আমাদের দেশে মূলত বন্দর আছে একটা। এটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তাই এটা জাতি ও রাষ্ট্রের হাতেই থাকা জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বলতে চাই দুর্নীতি, অপচয়, অব্যবস্থা দূর করে দক্ষ পরিচালনা কাঠামো গড়ে তুলে সরকারি খাতে বন্দর পরিচালনা করতে হবে।
বর্তমান বন্দরের উন্নয়ন জনগণের টাকায় হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। চট্টগ্রাম বন্দর একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। সরকারি তহবিলে হাজার হাজার কোটি টাকা অনুদান ও রাজস্ব দেয়। তবু কেনো চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে এই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। তা জাতি ও জনগণের কাছে বোধগম্য নয়।