‘নগ্ন বনমানুষের’ স্রষ্টা
ডেনসন্ড মরিসের বিদায়
Posted: 14 জুন, 2026
একতা বিজ্ঞান ডেস্ক :
মানুষ আসলে কতটা আলাদা? আমরা কি সত্যিই প্রকৃতির অন্য প্রাণীদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, নাকি প্রযুক্তি, সভ্যতা ও ভাষার আড়ালে এখনও আদিম প্রবৃত্তির এক উন্নত সংস্করণ হয়ে বেঁচে আছি? এই প্রশ্নগুলো দিয়েই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিলেন ব্রিটিশ প্রাণীবিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী ও টেলিভিশন উপস্থাপক ডেসমন্ড মরিস।
সম্প্রতি ৯৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের এক বিতর্কিত অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
ডেসমন্ড মরিস সবচেয়ে বেশি পরিচিত তাঁর বিখ্যাত বই “দ্য নেকেড এইপ” বা “নগ্ন বনমানুষ”-এর জন্য। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত এই বই প্রকাশের পরপরই বিশ্বজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। বইটিতে তিনি আধুনিক মানুষকে মূলত এক ধরনের “লোমহীন বনমানুষ” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই হোক না কেন, মানুষের আচরণের গভীরে এখনও প্রাণিজগতের বহু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে।
এই ধারণা একদিকে যেমন বহু পাঠককে মুগ্ধ করেছিল, অন্যদিকে প্রবল সমালোচনারও জন্ম দেয়। কারণ মরিস মানুষের প্রেম, যৌনতা, সামাজিকতা, যুদ্ধ, ধর্ম, নেতৃত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক-সবকিছুকেই প্রাণিবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন।
ডেসমন্ড জন মরিস ১৯২৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের পার্টন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করা নিজের বাবাকে দেখেছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে মানুষের সহিংসতা সম্পর্কে গভীর ঘৃণা তৈরি করে। ফলে তিনি মানুষের চেয়ে প্রাণিজগতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে ওঠেন।
পরবর্তীতে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণীবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন মরিস। তবে প্রচলিত প্রাণী পরীক্ষার বিরোধিতা করে তিনি প্রাণীদের আচরণ পর্যবেক্ষণভিত্তিক নতুন গবেষণাপদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই পদ্ধতি পরে “এথোলজি” নামে পরিচিতি পায়।
তাঁর গবেষণার বড় অংশ ছিল প্রাণীদের আচরণ, যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে। লন্ডন চিড়িয়াখানায় স্তন্যপায়ী প্রাণীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রাণীদের আচরণ বিশ্লেষণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল শিম্পাঞ্জি “কঙ্গো”-কে নিয়ে তাঁর গবেষণা। মরিস কঙ্গোর হাতে তুলি তুলে দেন এবং দেখতে চান শিল্পসৃষ্টির প্রবণতা কি শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আশ্চর্যজনকভাবে কঙ্গো নিয়মিত ছবি আঁকতে শুরু করে। পরে সেই ছবিগুলো আন্তর্জাতিক শিল্পমহলেও আলোড়ন তোলে। এমনকি বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোও কঙ্গোর কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
১৯৬৭ সালে প্রকাশিত “দ্য নেকেড এইপ” বইটি রাতারাতি বিশ্বব্যাপী বেস্টসেলার হয়ে ওঠে। বইটির ২ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়। সেখানে মরিস মানুষের বহু আচরণকে বিবর্তনের ধারাবাহিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, মানুষের যৌনতা কেবল সন্তান জন্মদানের জন্য নয়; বরং দাম্পত্য বন্ধন শক্তিশালী করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তাঁর বহু মতামত তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। নারীবাদীরা বিশেষভাবে সমালোচনা করেন তাঁর সেই ধারণাকে, যেখানে তিনি পুরুষকে ঝুঁকিপ্রবণ শিকারি এবং নারীকে গৃহকেন্দ্রিক সত্তা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সমালোচকদের মতে, তিনি জটিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে অতিরিক্তভাবে প্রাণিবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করেছেন।
তবুও ডেসমন্ড মরিসের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। কারণ তিনি বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বই এবং বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি মানুষকে নতুনভাবে নিজের আচরণ ও প্রকৃতিকে দেখতে শিখিয়েছেন।
পরবর্তীতে তিনি “দ্য হিউম্যান জু”, “ইনটিমেট বিহেভিয়ার” এবং “দ্য হিউম্যান অ্যানিম্যাল”-এর মতো বহু জনপ্রিয় বই ও অনুষ্ঠান তৈরি করেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষের অঙ্গভঙ্গি, ফুটবল দর্শকদের আচরণ, শিশুদের আচরণ, এমনকি বিড়াল ও পোষা প্রাণীর আচরণ নিয়েও তিনি লিখেছেন।
১৯৯৪ সালে নির্মিত “দ্য হিউম্যান অ্যানিম্যাল” ধারাবাহিকে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের আচরণকে প্রাণিবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করেন। যদিও বিবিসি অনুষ্ঠানটির শিরোনামের সঙ্গে “একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি” কথাটি যোগ করেছিল, যাতে বোঝানো হয় এটি মূলধারার বৈজ্ঞানিক মত নয়।
জীবনের শেষ দিকেও মরিস শিল্পচর্চা চালিয়ে যান। তাঁর আঁকা অতিবাস্তববাদী চিত্রকর্ম লন্ডন, ব্রাসেলস ও আমস্টারডামের প্রদর্শনীতে স্থান পায়। স্ত্রী রামোনার মৃত্যুর পর তিনি আয়ারল্যান্ডে ছেলের কাছে চলে যান।
বিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। জিনতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মানুষের আচরণ সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান তৈরি হয়েছে। ফলে মরিসের অনেক তত্ত্বও প্রশ্নবিদ্ধ। তবুও বিজ্ঞান ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় থাকবেন একজন অসাধারণ বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারক হিসেবে, যিনি মানুষকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন।
তাঁর ভাষায়, “মানুষকে প্রাণী বলা আমার কাছে অপমান নয়। কারণ আমি প্রাণীদের ভালোবাসি, আর নিজেকেও তাদের একজন ভাবতে গর্ববোধ করি।”
সূত্র : বিবিসি