ফ্যাসিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ-সন্ত্রাসবাদবিরোধী ফোরামের সম্মেলন এবং অভিজ্ঞতা

Posted: 14 জুন, 2026

গত ২৩-২৭ মে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী ফোরামের তৃতীয় সম্মেলন। ১০০টির বেশি দেশের কমিউনিস্ট বামপন্থি যুব শান্তি আন্দোলনের ১৮০ জন প্রতিনিধি এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ থেকে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমি এবং বিশ্ব গণতান্ত্রিক যুব সংগঠনের আমন্ত্রণে যুব নেতা খান আসাদুজ্জামান মাসুম অংশগ্রহণ করেন। রুশ ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআরএফ) এই সম্মেলনের আয়োজক ছিল। ২৩ মে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ঐদিনই মস্কো ডিএমই বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে প্রথম সাক্ষাৎ হয় নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড মাধব কুমার নেপালসহ নেপালের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে। পাকিস্তানের বামপন্থি আন্দোলনের নেতা কমরেড জমিলা গিলানীসহ পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা হয়। এখান থেকে সিপিআরএফ-এর দুজন কর্মী আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে যায় ক্রেমলিন এবং রেড স্কয়ারের পাশে হোটেল দ্য রিটজ কার্লটন সেখানে অভ্যর্থনা জানায় রুশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ। ইতোমধ্যেই হোটেলে দেখতে পেলাম শ্রীলংকার কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড জি উই রাসিংগে এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডি রাজাসহ ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃবৃন্দকে। ২৪ মে এ হোটেলের অডিটোরিয়ামে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন কমিউনিস্ট পার্টি অফ রাশিয়ান ফেডারেশনের চেয়ারম্যান কমরেড গেন্নাদী জুগানভ। উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন কিউবা, ভেনেজুয়েলা, প্যালেস্টাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা পার্টির নেতৃবৃন্দ। বিকেলে শুরু হয় অধিবেশন। বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ সাম্রাজ্যবাদ ফ্যাসিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাদের দেশের লড়াই-সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। ভারত বাংলাদেশ নেপাল পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ এই লড়াই এর সাথে যুক্ত করেন ধর্মীয় মৌলবাদ এবং আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামের কথা। সকল বক্তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী নীতির তীব্র সমালোচনা করে সারা বিশ্বে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরীহ মানুষকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। আমেরিকা ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনের গাজায় হাজার হাজার নারী, পুরুষ, শিশু হত্যা, লেবাননে ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞসহ সারা বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার মিত্ররা যে নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই সংগ্রামের গুরুত্ব এবং তা বাস্তবায়ন তাদের আলোচনায় উঠে আসে। সাম্রাজ্যবাদ যে দেশে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিচ্ছে এ বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখা হয়। পরের দিন অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট বামপন্থি নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের প্রায় সকলেই সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদ-সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং বামপন্থি শক্তির উত্থানের লক্ষ্যে দেশে দেশে কমিউনিস্ট বামপন্থি প্রগতিশীল শক্তি, সামাজিক সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ফ্রন্ট বা ইউনাইটেড ফ্রন্ট গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃবৃন্দ ধর্মীয় মৌলবাদ প্রতিরোধে মানুষের রুটি-রুজির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে উপরোক্ত লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে বক্তব্য রাখেন। দুইদিনব্যাপী দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলনের প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়। গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, মানবসভ্যতা আবারো গুরুতর বিপদের সম্মুখীন। সাম্রাজ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো সর্বাত্মক আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে সামরিকতাবাদ নব্যফ্যাসিবাদ নব্য উপনিবেশিকতা এবং কমিউনিজম বিরোধিতা তাদের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর এবং মানবজাতির বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতেও বদ্ধপরিকর। পুঁজিবাদ ক্রমশ উদার গণতন্ত্রের বাহু রাঙা আবরন সারিয়ে ফেলেছে। জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সাম্রাজ্যবাদীরা রাজনৈতিক সন্ত্রাস, ধর্মীয় উগ্রবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ, নিষেধাজ্ঞার এবং সামরিক শক্তিকে আরও নির্মমভাবে ব্যবহার করছে। তাই আমরা সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের প্রতি আহ্বান জানাই প্রগতিশীল বামপন্থি কমিউনিস্ট দেশপ্রেমিক উপনিবৈশিকতা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করুন। ন্যায়সংগত সংগ্রামে আমাদের প্রচেষ্টাকে একত্রিত করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে সোভিয়েত বিরোধিতা ও কমিউনিজম বিরোধিতাকে উন্মোচন করতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও নিরপেক্ষ বিশ্বের জন্য লড়াই করতে হবে। সম্মেলনের বিরতিতে বিভিন্ন দেশের ভ্রাতৃপ্রতীম পার্টিগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক আলাপ আলোচনার উদ্যোগও নেয়া হয় আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রীলংকার কমিউনিস্ট পার্টি, পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি, বামপন্থি প্রতিনিধিদলসহ সার্কভুক্ত দেশের পার্টিগুলোর সঙ্গে যুক্ত বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সার্কভুক্ত দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর যোগাযোগ সমন্বয় কিভাবে বাড়ানো যায়, কোনো ফোরাম গঠন করা যায় কি না সে বিষয়গুলো আলোচিত হয়। পরবর্তীতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে পার্টিগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে আলোচনার পর। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সিপিবির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারত আরএসএস উত্থান এবং বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির উত্থানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়- ভারত ও বাংলাদেশের সকল কমিউনিস্ট বামপন্থি প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে ফ্যাসিবাদ সাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে হবে। এছাড়া নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়- দীর্ঘদিন নেপালে ৫ বছর কোনো সরকারই টিকতে পারে না। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে বিভক্তি বা টানাপোড়েন স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, তরুণ-যুব সমাজের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অনুধাবন না করতে পারা সর্বোপরি ভারত ও আমেরিকার নানা ধরনের ষড়যন্ত্র নেপালে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তবে, বামপন্থি কমিউনিস্টরা আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চায়- ইসরায়েলের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকের বিষয়টি। ইসরায়েলে কমিউনিস্ট পার্টি বেশ শক্তিশালী। ইসরায়েলি পার্লামেন্টে তাদের বেশ কিছু আসন রয়েছে। তারা নেতানিয়াহু সরকারের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে এবং পার্লামেন্টের বাইরে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। তাদের বেশ কিছু নেতাকর্মী জেলে গিয়েছেন তাদের ওপর নির্যাতনও অব্যাহত আছে। তাছাড়া ফিলিস্তিন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফিলিপাইন, তুরস্ক, পর্তুগাল, ইউক্রেন, জিয়ালা রাশিয়া, রাশিয়া, ভেনেজুয়েলার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সঙ্গে সিপিবির দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের তৃতীয় দিন সমস্ত প্রতিনিধিদের নিয়ে যাওয়া হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সোভিয়েত সৈনিকদের স্মৃতিসৌধটি সেখানে বিভিন্ন দেশের পার্টির প্রতিনিধিরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। এটা সম্পন্ন করে ক্রেমলিনে (রাষ্ট্রের সচিবালয়) নিয়ে যাওয়া হয়। বিশেষভাবে মস্কোর ঘটনা এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসগুলো যে হলে অনুষ্ঠিত হতো এবং লেনিন মৌমলিয়াম যা রেড স্কয়ারে (প্রায় ১০০ বছর ধরে সেখানে কমরেড লেনিনের মৃতদেহকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে তা সত্যিই অসাধারণ বিষয়) রয়েছে। রাশিয়ার সাধারণ মানুষের সাথে আলোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে রুশ জাতীয়তাবাদ তাদের মধ্যে প্রবলভাবে বিদ্যমান। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তেমন প্রভাব দেখলাম না তবে এলাকা হিসেবে ভিন্নতা থাকতে পারে। বিদেশিদের জন্য একটা সমস্যা হলো ওয়াটসআপ, ফেসবুক সেদেশে এগুলো প্রায় নাই বললেই চলে। রাশিয়ার উপর আমেরিকাসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে। ফলশ্রুতিতে বিদেশিদের আর্থিক লেনদেন করার বিষয়টি সমস্যায় পড়েছে। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। রাশিয়ার পার্লামেন্টে কমিউনিস্ট পার্টির আসন সংখ্যা ৫৬। তবে নেতা হিসেবে কমরেড গেন্নাদী জুগানভ বেশ পরিচিত। রাশিয়ার পার্টিতে তরুণ যুবকদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। আরেকটা বিষয় লক্ষ্যণীয় তা হলো- আমেরিকা-ন্যাটো-ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়ার যতগুলো রাজনৈতিক দল রয়েছে বাম-ডান-জাতীয়তাবাদী সবাই ঐক্যবদ্ধ। রুশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের বিভিন্ন আলাপচারিতায় তা প্রতীয়মান হলো মার্কসবাদ লেনিনাবদের ওপর আস্থা বিশ্বাস অটুট রয়েছে। তারা মনে করেন একদিন না একদিন রাশিয়ায় আবারও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা শোষণ-বঞ্চনার তো অবসান হয়নি। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সেটা দেশের ভেতরে হোক বাইরে হোক তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে। মস্কো থেকে দুদিনের জন্য লেনিনগ্রাড (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবাগ) গিয়েছিলাম। মহান অক্টোবর বিপ্লবের সুতিকাগার লেনিনগ্রাড সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান বেশ শক্তিশালী। প্রশাসনে পক্ষ থেকে অক্টোবর বিপ্লবের স্মৃতি চিহ্নগুলো ধরে রাখা হয়েছে। তবে এখানে লক্ষ্যণীয় হলো ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ) সত্য ইতিহাস সংরক্ষিত আছে, পরবর্তী সময়ের ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই সংরক্ষিত হয়নি। সামগ্রিকভাবে এই সম্মেলনের অভিজ্ঞতা- বলা যায় সারা পৃথিবীতেই ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই এবং শোষণমুক্ত সমাজ তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত আছে। শুধু কমিউনিস্টরাই নয় অন্যান্য বামপন্থি প্রগতিশীল দেশপ্রেমিক শক্তি ব্যক্তি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকের তাদের সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ইউনাইটেড ফ্রন্ট গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। মস্কোতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলনে এই আহ্বানই জানানো হয়েছে। লেখক : সভাপতি, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি