বাজেট : লুটপাটের পুরোনো খাতা

Posted: 14 জুন, 2026

অনেক বছর, ১৯ বছর পর এবার বাজেট দিল বিএনপি সরকার। আকারে বড়, কথায় খানিকটা চমক রাখার চেষ্টা। তারা বলছে, পুনরুদ্ধারের বাজেট; অথচ সাধারণ মানুষ বলবে, এটা পুরোনো লুটপাটের বাজেটের নতুন সংস্করণ। এবারও বাজেটের কল্যাণের ঘোষণা আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক ফারাক। আর এ ফাঁক যত বড়, সংশয়ও ততই বাড়ে। যেমন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৯৫ লাখ কোটি টাকা। এনবিআরের ওপর চাপানো হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের অসম্ভব মিশন। এনবিআর গত বছর লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে ছিল; ব্যবসা-বাণিজ্য নেই, শহর-গ্রামাঞ্চলে অভাবি মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। আপনি রাস্তায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই টের পাবেন- গত কয়েক বছরে হাত পাতা মানুষের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে কোথায় এসে পৌঁছেছে। সেই অবস্থায় আপনি এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন, যা আশ্চর্য করার মতো! এবার কি হুট করে স্বর্গ থেকে রাজস্ব নেমে আসবে? বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আগের চেয়ে প্রায় ৮৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অথচ গতবার মে পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছিল মাত্র ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। উচ্চাভিলাষ আর বাস্তবের এই ব্যবধান কি স্বচ্ছলতার ইঙ্গিত দেয়, নাকি এ অঙ্ক করাই হচ্ছে কাগজে কলমে তা সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে? দ্বিতীয়ত, ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাত ঋণের সুদহার বৃদ্ধির ধাক্কায় পড়বে। উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ হয়ে পড়বে স্থবির। এদিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ; সুদহার বাড়লে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যে কঠিন হবে তা কি সরকার বুঝছে না? তৃতীয়ত, করের বোঝা চাপছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষকেই এর সর্বোচ্চ মূল্য চুকাতে হবে, যাদের জন্য বাজেটে ‘আলোকিত ভবিষ্যতের’ রূপকথা পড়ে শোনানো হয়েছে। মনে রাখা দরকার- এখনো সরকার সুশাসন নিশ্চিত করতে পারেনি। তাদের পুঁজিবাদী বাজেট বাস্তবায়নের জন্যও এটা প্রধানতম পূর্বশর্ত। কিন্তু তা না করে কেবল কিছু নীতি, সহায়তা- দিনশেষে এর বখরাভোগী হবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই। সম্ভবত বাজেটের গূঢ় লক্ষ্যও তাই। বিএনপি সরকারের এবারের বাজেটের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো- এটি পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির চক্রে ঘোরাফেরা ও পুনরায় লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দেবে। এখন আর কেউ এ কথা শুনে অবাক হয় না যে ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিবিদের একটি প্রভাবশালী অংশ নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অদৃশ্য হাত ঘুরাচ্ছে। উন্নয়ন ব্যয় ৩ দশমিক ১৬ লাখ কোটি টাকা করলেও ওই প্রভাবশালী অংশের কে, কত টাকা খাবে, সেটি সাধারণ মানুষের অজানা। বাজেটের ঘোষণায় ভর্ভুকি আর উন্নয়নের গল্প থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি ভর্তুকির সুফল যে কে পাবে, তাও বড় প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাজেট বড় আকারের দুর্নীতির মাধ্যম হয়ে ওঠার যে ইতিহাস রচনা করেছিল, এবারেরটাকেও তারই পুনরাবৃত্তি বলা চলে। ব্যতিক্রমের কোনো আলামত নেই। কেননা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায় বড় অঙ্কের বাজেট বড় অঙ্কের অর্থপাচার ও বৈষম্যের জন্ম দেবে। রাজনৈতিক অভিজাতরা যেমনভাবে আগে লুটের মাল ভাগ করেছে, এবারও দিনশেষে তাই ঘটবে। সোজা বাংলায়, জনকল্যাণের বুলিতে মাখানো এবারের বাজেটও প্রকৃতপক্ষে ‘কথার ফুলঝুরি’ ছাড়া কিছুই নয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব না থাকলে বাজেটের কোনো লক্ষ্যই পূরণ হবে না। সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে আরও পিষ্ট হয়ে পড়বে, দেশীয় শিল্প মার খাবে, বাজার বিদেশিদের আরও দখলে যাবে। ক্ষমতার নতুন অধ্যায়ে পুরোনো সেই লুটপাটের রাজনীতি যে বন্ধ হয়নি, বরং নতুন নামে পুনর্জন্ম লাভ করেছে- এ বাজেট তারই উৎকৃষ্ট প্রমাণ।