বিশ্বকাপে বিশ্ব কোথায়?

Posted: 14 জুন, 2026

একতা প্রতিবেদক : অসংখ্য প্রশ্ন, বিতর্ককে সামনে রেখে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আসর- বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া দেশের সঙ্গে স্বাগতিক দেশের যুদ্ধ, টিকেটের আকাশছোঁয়া মূল্য ও সার্বিক খরচ, ফুটবলের আত্মাকে বিক্রি করে দেওয়া এবং আরও নানা বিতর্ক ও প্রশ্নে জর্জরিত এক বিশ্বকাপ। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিযোগিতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল তা যেন ভেসে কবেই। এই টুর্নামেন্ট নানাভাবে আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। গতানুগতিক বা প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছু না ঘটার পরিবর্তে, ২০২৬ বিশ্বকাপ এমন সব অভূতপূর্ব সমস্যা তৈরি করেছে, যা এই প্রতিযোগিতার ৯৬ বছরের ইতিহাসে আর কখনও দেখা যায়নি। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো, বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হয়েও অংশগ্রহণকারী অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা, যেটি গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এটি যদি অন্য কোনো দেশ হতো, তাহলে টুর্নামেন্ট সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া বা বর্জন করা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যেত। তবে, এই যুদ্ধের আগেও, টুর্নামেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এমন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন, যা সামলানোর উপায় তাদের জানা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ধরন এবং সহ-আয়োজকদের সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। এমনকি বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জরুরি মানবাধিকার অবস্থার সম্মুখীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে অ্যামনেস্টির একটি প্রতিবেদনে, বিশেষ করে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ভক্ত এবং এমনকি ফুটবলারদের জন্য সৃষ্ট ‘শীতল হুমকির’ বিষয়টি। ফিফার এত বেশি অর্থের ‘লোভ’ মূলত একটি উপাদান মাত্র, যা ফুটবলের প্রকৃত বৈশ্বিক সমর্থনের আওতার বাইরে চলে গেছে এবং এমনকি টুর্নামেন্টটিকে এমন ‘অশালীন’ আকারে প্রসারিত করছে যে, এটি হয়তো প্রতিযোগিতাটির মূল উদ্দেশ্যকেই ম্লান করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হুট করে ইরান আক্রমণ বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপার এবং ফিফার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১১০ জন শিশুসহ ১৬৮ জন নিহত হওয়ার খবরটি যখন সামনে আসে, তখন এই ধরনের উদ্বেগ, এমনকি ইরানের অংশগ্রহণও, সম্পূর্ণ তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছিল। এর আগে এমন কিছু কখনও ঘটেনি এবং যদি এটি অন্য কোনো দেশ হতো, তাহলে নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টটি বাতিল করার আলোচনা উঠত। ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফিফা শান্তি পুরস্কার স্রেফ একটি বিতর্কের বিষয় থেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ রসিকতার নিছক উপজীব্যে পরিণত হয়েছে। ইনফান্তিনো ‘তোষামুদেভাবে’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়ার পর থেকে, ইরানসহ চারটি ভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৮ সালে এই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সেই সংখ্যাটি হলো ১২। টুর্নামেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বিবেচনা করলে এই সংখ্যা এর মধ্যেই অন্য যেকোনো আয়োজক দেশের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এর চেয়েও প্রাসঙ্গিক হলো ফেয়ারস্কয়ারের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় আগ্রাসনের কাজ, যা ‘উস্কানিহীন, অনাহূত এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত নয়।’ এর আওতায় ভেনেজুয়েলা ও ইরান আছে, এবং যুক্ত হবে আরও কিছু বিষয়, যেমন- একজন বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ; ক্যারিবিয়ানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কিউবাকে ক্রমাগত হুমকি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনেস্কো থেকে নিজেদের প্রত্যাহার। যদিও ঐতিহাসিকভাবে আয়োজক দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে সাধারণত পৃথক হিসেবেই দেখা হতো, ইউক্রেন আক্রমণের জন্য রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এখন সেই পরিধি বদলে গেছে। একাধিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিলিস্তিনে সংঘটিত একটি ঘটনায় ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছে, যেটিকে জাতিসংঘের একটি প্যানেল ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। তারপরও ইসরায়েলের কোনো শাস্তি হয়নি। ফিফা প্রধান ইনফান্তিনো এখন এই বিষয়ে কোনো কথাই বলছেন না। টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা এবং বিশ্বকাপের নীতি লঙ্ঘন ছিল সবচেয়ে বড় বিতর্ক এবং এটি অন্যান্য অনেক বিষয়কেও স্পষ্ট করে তোলে। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ২ দিন আগে, বিখ্যাত সোমালি রেফারি ওমার আর্তান এবং অসংখ্য ইরানি কর্মীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শিকাগোতে পৌঁছানোর পর ইরাকি স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অন্যদিকে সেনেগাল এবং উজবেকিস্তান দলকে দেশে কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আবারও, এটি লক্ষণীয় যে, কোনো আধুনিক বিশ্বকাপে আগে কখনও এগুলো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। টুর্নামেন্ট আয়োজনের একটি মৌলিক চুক্তিগত শর্ত হলো অংশগ্রহণকারীদের অবাধ যাতায়ত। ২০১৭ সালে ইনফান্তিনো নিজেই যেমন বলেছিলেন, “ফিফা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে, বিশ্বকাপের খেলার যোগ্যতা অর্জনকারী যেকোনো দল, সেই দলের সমর্থক ও কর্মকর্তাসহ, তাদের দেশে প্রবেশের সুযোগ প্রয়োজন, নইলে কোনো বিশ্বকাপই হয় না।” ২০২৬ সালের জন্য সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর বিষয়ে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও, ইনফান্তিনো গত বছরই বলেছিলেন, “এ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। আগামী বছর ফিফা বিশ্বকাপের জন্য কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে স্বাগত জানানো হবে।” কিন্তু বাস্তবে তেমনটা ঘটেনি। যদিও এখন ফিফা জোর দিয়ে বলছে যে, তারা ‘আয়োজক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত নয়’, কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন আছে। ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের জন্য ইসরায়েলি দলকে ইন্দোনেশিয়ার প্রবেশে অস্বীকৃতি জানানোর সময়ে ফিফার অবস্থান ছিল ভিন্ন। তাদের কাছ থেকে আয়োজক হওয়ার অধিকার দ্রুতই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং ফিফা অস্পষ্টভাবে ‘বর্তমান পরিস্থিতি’র কথা বলেছিল। এই বিতর্কটি ফিফার জন্য আরও খারাপ দেখাচ্ছে, কারণ কিছু নির্দিষ্ট দেশ- বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ছিল এবং তাদের সম্পর্কের একটি যুক্তি ছিল এই মনোভাবকে সহজতর করা। কিছু নির্দিষ্ট দলের প্রতি অসম আচরণের কারণে এমনিতেই টুর্নামেন্টের গতিপথই প্রভাবিত হতে পারে। রাশিয়া এবং কাতারকে যে অনেক বেশি অতিথিপরায়ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তাতেই অনেক কিছু বোঝা যায়। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা বা কোনো খেলা দেখতে আসা কোনো ব্যক্তির হঠাৎ করে আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্ট) কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়ার শঙ্কা। বিশ্বকাপ যেখানে বিশ্বব্যাপী উৎসবের প্রতীক হওয়ার কথা, সেই বাস্তবতা এখানে উধাও। অথচ ৪৮টি দল নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ! মহাপ্রতারণা হয়েছে টিকেট ও অনান্য ব্যয় নিয়ে। সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোর চেয়ে বেশিরভাগ টিকিটের দাম তিনগুণেরও বেশি হওয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ খরচের পাশাপাশি, এমন অনুমান করা হচ্ছে যে, টুর্নামেন্টজুড়ে কোনো দলকে সমর্থন করতে একজন সাধারণ সমর্থকের ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হবে! আয়োজক শহরগুলোর সাথে ফিফার অসম চুক্তিগুলো খরচকে কেবল বাড়িয়েই দিয়েছে। এর পক্ষে যুক্তি দিতে নানা রকম অজুহাত দেখিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি, যেমন খেলার রাজস্ব পুনর্বণ্টন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিনোদন সংস্কৃতির’ সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। দুটোই হাস্যকর, কারণ পুরোনো মূল্য মডেল অনুযায়ী রাজস্বের পূর্বাভাস ছিল রেকর্ড-ভাঙা এবং ফিফা এর আগে কখনও কোনো স্থানীয় টিকিট সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও এমন কিছু নয়। যদি তারা তা করত, তাহলে হয়তো ২০১০ বিশ্বকাপে আরও বেশি স্থানীয় দক্ষিণ আফ্রিকান দর্শক উপস্থিত থাকতে পারত। এই খরচ আরও একটি প্রতিকূল পরিণতির জন্ম দিয়েছে, যা ইনফান্তিনোর আরও কিছু দাবিকে অযৌক্তিক করে তুলেছে। ফিফা সভাপতি বলে আসছেন ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপের কথা, কিন্তু টিকিটের দাম অনেক সমর্থকের নাগালের অনেক বাইরে। এই বিষয়টি শুধু মেজর লিগ সকারের সমর্থকদের মতো স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) যুক্তি দেখিয়েছে যে, আধুনিক যুগে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন যা কার্যকরভাবে প্রতিবন্ধী ভক্তদের বাদ দিয়েছে। ইউরোপ থেকে ভ্রমণকারী হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের বিষয়ে সংস্থাটির কাছে বর্তমানে কোনো তথ্য নেই। এর কারণ হিসেবে এএফই উল্লেখ করেছে যে, সবচেয়ে সস্তা ক্যাটেগরি ৪ বিকল্পগুলোর মধ্যে কোনো ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি’ টিকেট নেই এবং সঙ্গীদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই, যার ফলে একটি দলকে অনুসরণ করে ফাইনালে যেতে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভক্তের ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এসবের প্রভাব পড়েছে বিশ্বকাপে। গ্যালারিতে দেখা গেছে ফাঁকা সিট।