শিশুদের ওপর ভয়াবহ সহিংসতা : কোন পথে সমাজ
Posted: 07 জুন, 2026
দেশে শিশুদের প্রতি সহিংসতা যেনো বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে যৌন নিপীড়ন এবং এরপর হত্যার যেসব ঘটনা সামনে আসছে- তা রীতিমতো ভয়াবহ। গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের ঘটনা উঠে আসছে। কোনো কোনো ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হচ্ছে। বিবেকমান মানুষ শিশুদের প্রতি এমন ভয়ঙ্কর আচরণ রোধে সোচ্চার হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই আরো বেশি ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা সামনে আসছে।
সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল রামিসা। রামিসার পরিবার এবং অভিযুক্ত সোহেল রানা একই ভবনে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে শিশুটির স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। হঠাৎই তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার মা দেখেন পাশের ফ্ল্যাটে দরজার বাইরে শিশুটির পায়ের একটি জুতা পড়ে আছে। তখন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করেন। ভেতর থেকে বন্ধ দরজাটি তখন খোলা হচ্ছিল না। অনেক সময় ধরে নক করা হলেও দরজা খোলা হয়নি। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে শিশুটির লাশ পায়। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং টয়লেটের বালতি থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রামিসা হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মধ্যেই এই মামলার বিচার শেষে রায় দেওয়া হচ্ছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, রামিসা হত্যা মামলার বিচার এতো স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হলে অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে কেনো হচ্ছে না? আবার নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন হলেও উচ্চ আদালতে গিয়ে এই মামলা দীর্ঘসূত্রিতায় পড়বে কি না?
আবার শুধুমাত্র দ্রুত বিচারের মধ্য দিয়েই দেশে শিশুদের ওপর সহিংসতা কিংবা ভয়ঙ্কর অপরাধ রোধ করা সম্ভব হবে কি না- সেই প্রশ্নও রয়ে যাচ্ছে। কারণ, বিদ্যমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা মানুষের মধ্যে ভোগবাদী মানসিকতা তৈরি করেছে। ধীরে ধীরে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ে সমাজকে চরমভাবে বিভক্ত করা হয়েছে। এতে মানুষের প্রতি মানুষের মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ বিনষ্ট হচ্ছে। নৈতিকতা হারিয়ে মানুষ হয়ে উঠছে পশুর সমতুল্য। আর এই পশুরাই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে নারী ও শিশুর ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।
আমাদের শিশুদের, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের রক্ষা করতে হলে দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের মানুষকেই। আইনি প্রতিকারের দায়িত্ব সরকারের, কিন্তু মনুষ্যত্ব বাঁচানোর দায়িত্বটা সবার। জনসচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ, আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত দোষী ব্যক্তিরা যেন বিচার থেকে রেহাই পেতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা গেলে শিশুদের অনেকাংশে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। শিশু হত্যা, শিশু ধর্ষণসহ শিশুর প্রতি সব রকমের সহিংসতা বন্ধ করতে ব্যাপক ও সমন্বিত রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রচলিত ব্যবস্থা বহাল রেখে শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সহিংসতা ও বর্বরতা থেকে দেশ ও সমাজকে মুক্ত করতে হলে অবশ্যই বিদ্যমান ব্যবস্থার বদল ঘটাতে হবে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা যে ব্যবস্থা মানুষের ওপর মানুষের শোষণকে পাকাপোক্ত করে, সেই ব্যবস্থা ভাঙতে না পারলে নারী, শিশু কিংবা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি বিদ্যমান ভয়াবহতা থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে না।