সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 07 জুন, 2026

একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১২তম কিস্তি। (১২) [একতার গত সংখ্যায় পার্টির প্রথম কংগ্রেসের (১৯৬৮) ‘রাজনৈতিক রিপোর্ট’ থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার রিপোর্টের পরবর্তী কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হলো।] “ন্যাপ গঠনের পরেও বুর্জোয়াসুলভ বিচ্যুতি --- ন্যাপের জন্মের পর, ‘বুর্জোয়া কবল মুক্ত’ ন্যাপের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যে ‘দ্রুত অগ্রগতি’ কিছু কমরেড আশা করিয়াছিলেন বাস্তবে তাহা হয় নাই। --- বাস্তবে দেখা যাইতেছিল যে, আমরা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পণকারী বলিয়া নিন্দা করিলেও জনগণ তাহা উপলব্ধি করিতে পারিতেছিল না। --- আমাদের যে সব কমরেড ইতোপূর্বেই --- “আওয়ামী লীগ ত্যাগ করিতে কেন্দ্রীয় কমিটির দোদুল্যমানতা” বলিয়া সমালোচনা করিয়া বলিতেছিলেন যে, “আরো আগেই ন্যাপ গঠন করা উচিত ছিল।” কিন্তু ন্যাপ গঠনের পর যখন —- ন্যাপ গঠন সম্পর্কে জনগণের মনে বহু প্রশ্ন দেখা যাইতেছিল তখন ঐসব কমরেডদের মধ্যে কেহ কেহ আবার বলিতেছিলেন যে, “আওয়ামী লীগ ত্যাগ করাই ভুল হইয়াছে এবং আমাদের আবার আওয়ামী লীগে ফিরিয়া যাওয়া উচিত।” “বিভেদের ফল --- আওয়ামী লীগ ভাঙ্গনের মধ্য দিয়া যে ভাবে ন্যাপ গঠিত হইয়াছিল, তাহার ফলশ্রুতিতে জন্মলগ্ন হইতেই এই দলের ভিতর একটা তীব্র আওয়ামী লীগ বিরোধী সংকীর্ণ মনোভাব দেখা দিয়েছিল। --- অন্যদিকে, আওয়ামী নেতৃত্বও ছিল প্রচণ্ড অহমিকাপূর্ণ ও সংকীর্ণতাবাদী এবং প্রথম দিন হইতে তাহারা ন্যাপের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ভণ্ডামিও শুরু করিয়াছিল। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতাসীন দল এবং সে সুযোগে তাহারা ঐ গুণ্ডামির অধিকতর সুবিধা পাইতেছিল। --- এই সময়ে পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্বশাসন দাবির প্রতি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দির বিরূপ মনোভাবের প্রকাশ ও পশ্চিম পাকিস্তান এক ইউনিটের প্রতি তাঁহার দৃঢ় সমর্থন ন্যাপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধ তীব্রতর হইয়াছিল। অথচ তখন --- পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং শ্রমিক কৃষকদের দুর্নীতি লাঘব–অন্ততঃ এই দাবিগুলির ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণ-সংগ্রাম ও সেজন্য গণতান্ত্রিকামীদের একতা একান্ত প্রয়োজন ছিল। তাই তখন কেন্দ্রীয় কমিটি নিম্নতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ন্যাপ ও আওয়ামী লীগের একতা গঠনের নীতি গ্রহণ করিয়াছিল। --- কিন্তু ঐ নীতির ভিত্তিতে সমগ্র পার্টি ঐক্যবদ্ধ ছিল না। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা নিজের গদী রক্ষার জন্য সোহরাওয়ার্দিকে প্রধান মন্ত্রীত্বের আসন দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের জন্য সোহরাওয়ার্দির উদ্যোগ যখন ঐ দেশী ও বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীলদের অবাধ রাজত্ব ও ইস্কান্দারের গদীকে বিপন্ন করিয়া তুলিতেছিল তখন ইস্কান্দার মীর্জা ১৯৫৭ সনের অক্টোবর মাসে সোহরাওয়ার্দি মন্ত্রীসভা গঠনের মাত্র ১৩ মাস পরে সোহরাওয়ার্দিকে বরখাস্ত করিয়াছিল। সোহরাওয়ার্দিকে বরখাস্ত করিয়া ইস্কান্দার মুসলিম লীগ আই আই চুন্দ্রীগড়কে প্রধান মন্ত্রীত্বের পদে বসাইয়াছিল। চুন্দ্রীগড় মন্ত্রীসভার নির্দেশে পূর্ববঙ্গে আমাদের পার্টির উপর নূতন করিয়া দমননীতিও শুরু হইয়াছিল। --- পূর্ববঙ্গে ন্যাপ-আওয়ামী লীগ ঐক্যের জন্য কোন প্রচেষ্টাই হয় নাই। তবে, সৌভাগ্যক্রমে এই সময়ে যুক্ত নির্বাচন ও অবিলম্বে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পার্লামেন্টে রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ-ন্যাপ সমঝোতা হয়। --- ইহার ফলশ্রুতিতে চুন্দ্রীগড় মন্ত্রীসভাকে মাত্র ৫৪ দিন পর বিদায় নিতে হইয়াছিল ও ১৯৫৭ সনের শেষ দিকে ফিরোজ খান নূনের নেতৃত্বে রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। ইহাতে ইস্কান্দার মীর্জা ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীলদের একটা পরাজয় হইয়াছিল। নূন মন্ত্রীসভা ১৯৫৮ সনের মাঝামাঝি সময়ে ঘোষণা করিয়াছিল যে, ১৯৫৯ সনের প্রথম দিকে নূতন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। “গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রগতি, শাসক চক্রের সংকট পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার গণ-বিমুখ নীতিসমূহের পটভূমিকার কোন কোন স্থানে, যেমন চট্টগ্রামে, আমাদের উদ্যোগে শ্রমিকদের কিছু কিছু আন্দোলন --- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও খাদ্যের জন্য ঢাকাতে মহিলা সমিতি, মজদুর ফেডারেশন, কৃষক সমিতি, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুবলীগের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় কমিটির উদ্যোগে মিছিল, কৃষক সমাবেশ ও জনসভা --- অন্যান্য কতিপয় স্থানে খাদ্যের দাবিতে সাধারণ জনগণের কয়েকটি বিক্ষোভ মিছিল --- কোন কোন জেলায় বিশেষ করিয়া সিলেটে খাজনা হ্রাসের জন্য প্রচার আন্দোলন শুরু হইয়াছিল। --- পশ্চিম পাকিস্তানেও এক ইউনিট বিরোধী জনমত গড়িয়া উঠিতেছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দুর্বলতা ছিল যে, এই আন্দোলন সীমাবদ্ধ ছিল প্রধানতঃ রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক প্রচার অভিধান এবং তাহাও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভিতর। --- দেশের পরিস্থিতিটা ছিল–একদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ঊর্দ্ধগতি ও অন্যদিকে গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীলদের চক্রান্ত হেতু দেশের সামনে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট। এই পরিস্থিতিতে ১৯৫৬ সনে গৃহীত নূতন সংবিধান অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচন এবং নির্বাচনে একটি নিম্নতম কর্মসূচির ভিত্তিতে গণতন্ত্রকামী সমস্ত দল ও শক্তির একতার আওয়াজও কেন্দ্রীয় কমিটি ১৯৫৭ সনের মধ্যভাগ হইতে উত্থাপন করিয়া ছিল। --- অন্যান্য গণতান্ত্রিক শক্তিও এই দাবি তুলিয়াছিল, সাধারণভাবে জনমতও ছিল নির্বাচনের পক্ষে। --- “নির্বাচনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নূন মন্ত্রীসভার ঘোষণায় এবং নির্বাচনের পক্ষে জনমতের অভিব্যক্তি দেখিয়া দেশী ও বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীলরা ও ইস্কান্দার চক্র গভীরভাবে শঙ্কিত হইয়া পড়িয়াছিল। --- ইহাদের সঙ্গে হাত মিলাইয়াছিলেন পাকিস্তানের তদানীন্তন সেনাধ্যক্ষ ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং আমলাতন্ত্রের উচ্চ পদস্থ কর্মচারীগণ। --- “গণতান্ত্রিক শিবিরে অনৈক্য ও সামরিক শাসক প্রতিক্রিয়াশীল জোট বুঝিয়াছিল যে, পূর্ববঙ্গে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভাকে গদীচ্যুত করিতে না পারিলে নির্বাচন বানচাল করা কঠিন হইবে। ইস্কান্দার চক্র এখানে কে-এস-পি, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের সঙ্গে আঁতাত করিয়া এবং যুব দুর্নীতি দ্বারা আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন হইতে আইন সভার জনকয়েক সদস্য ভাগাইয়া নিয়া ১৯৫৮ সনের মধ্যভাগে আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার অবস্থাটা টলটলায়মান করিয়া তুলিয়াছিল। সেই জটিল পরিস্থিতিতে, আমাদের পার্টির প্রচেষ্টার প্রাদেশিক আইন সভার ন্যাপ জনগণ আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার পতন ঘটাইবার ষড়যন্ত্রের বাধা দেওয়ার যে ভূমিকা নিয়াছিলেন তাহাতে একবার পতন হইতে আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভা রক্ষা পাইয়াছিল। কিন্তু, শেষ রক্ষা করা যায় নাই। --- ইস্কান্দার মীর্জা ন্যাপের কতিপয় নেতাকে এক ইউনিট বিবাগে ও স্বায়ত্বশাসনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়া দলে টানিতে সচেষ্ট হইয়াছিল। --- নিজ নিজ জাতীয় অধিকারের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁহাদের ক্রোধহেতু ইস্কান্দারের মিথ্যা প্রলোভনের কাঁধে পা দিয়া পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার পতন ঘটাইবার প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্তে শরীক হইয়া পড়িয়াছিলেন। ন্যাপের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারী কমিটি হইতে নির্দেশ দিয়াছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে এনারা প্রস্তাব আনিলে ন্যাপ সদস্যগণ ‘নিরপেক্ষ’ থাকিবে। এই অবস্থায়, ন্যাপের ‘নিরপেক্ষতার’ অর্থই ছিল আইন সভায় আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার সংখ্যালঘিষ্ঠতা ও উহার পতন এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্রের সফলতা। --- ন্যাপের ঐক্যের খাতিরে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পার্টিকে ন্যাপ পার্লামেন্টারী কমিটির ঐ ভুল নির্দেশ মানিয়া নিতে হইয়াছিল। --- আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভার পতনের পর আমাদের পার্টির প্রচেষ্টায় আবার ন্যাপ আওয়ামী লীগ সমঝোতা, মাত্র দুই দিন পর আবু হোসেন মন্ত্রীত্বের পতন ও পুনরায় আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীত্ব গঠন, কেন্দ্রীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের উস্কানিতে আইন সভায় গুণ্ডামী ও মারামারি, ইহাতে ডেপুটি স্পীকার শাহেদ, আলির মারাত্মক আঘাত প্রাপ্তি ও পরে তাঁহার মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনা ১৯৫৮ সনের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে তড়িৎগতিতে অবস্থাটা হইয়া উঠিয়াছিল জটিল ও অনিশ্চিত অর্থাৎ প্রতিক্রিয়াশীলরা যাহা চাহেতছিল, ঠিক তাহাই। গণতন্ত্রকে কবর দেওয়ার জন্য প্রতিক্রিয়াশীলরা সুপরিকল্পিতভাবে এই অবস্থা সৃষ্টি করিয়াছিল এবং ইহার সুযোগেও ‘দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব ঘটিয়াছে’ এই অজুহাতে তাহারা মার্কিনী সাম্রাজ্যবাদীদের প্ররোচনা ও সাহায্যে এবং ইস্কান্দার মীর্জা ও আইয়ুব খানের নেতৃত্বে ১৯৫৮ সনের ৭ই অক্টোবর রাত্রে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন প্রাক্কালে সামরিক শাসন জারি করিয়াছিল। চলবে [পরবর্তী সংখ্যায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময়কালের রিপোর্ট থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হবে।]