জিনোম গবেষণায় রোমান সাম্রাজ্য পতনের অজানা ইতিহাস

Posted: 24 মে, 2026

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : রোমান সাম্রাজ্যের পতন নিয়ে প্রচলিত বর্বর আক্রমণের ধারণা বদলে দিয়েছে নতুন এক জিনোম গবেষণা। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে কোনো রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞ নয়, বরং উত্তর ইউরোপীয়দের সঙ্গে রোমানদের শান্তিপূর্ণ সামাজিক ও জিনগত একীভূতকরণের প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। এ বিবর্তনই আধুনিক মধ্য ইউরোপের ভিত্তি গড়ে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ছিল মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। সে সময় জার্মান সেনাপতি ওডোয়াসার ইতালির কিশোর সম্রাট রোমুলাস অগাস্টুলাসকে সিংহাসনচ্যুত করেন এবং এর মাধ্যমেই ইউরোপের বিশাল অঞ্চলজুড়ে থাকা কেন্দ্রীয় শাসনের পতন শুরু হয়। বর্তমানে দক্ষিণ জার্মানি হিসেবে পরিচিত তৎকালীন রোমান সীমান্তের সুরক্ষিত দুর্গগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জিনোম বা জিনতত্ত্বীয় তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন গবেষণা চালিয়েছেন গবেষকরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, সেই সময়কার নাটকীয় রাজনৈতিক বিভিন্ন পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিল। একইসঙ্গে গবেষণায় সেই জনপ্রিয় ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করেছে, যেখানে মনে করা হত, বিলুপ্তপ্রায় রোমান সাম্রাজ্যের সাবেক অঞ্চলগুলো এক বিধ্বংসী ‘বর্বর আক্রমণে’র শিকার হয়েছিল। গবেষকরা বলছেন, সাম্রাজ্য আমলের বিয়ের কঠোর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ফলে রোমান সেনাছাউনি এবং নগরীর রোমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে স্থানীয় নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত মেলামেশা ও বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের মধ্যে উত্তর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত কিছু মানুষও অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক ও জার্মানির ‘জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটি মেইঞ্জ’ এর নৃবিজ্ঞানী ও জনসংখ্যা জিনতত্ত্ববিদ জোয়াকিম বার্জার বলেছেন, “ইতালিতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ও দক্ষিণ জার্মানিতে আমরা যে জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছি উভয়ের মধ্যকার সময়ের সামঞ্জস্য একেবারে নিখুঁত”। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে ‘নেচার’ সাময়িকীতে। গবেষকরা আধুনিক জার্মানির বাভারিয়া ও হেস রাজ্যে অবস্থিত তথাকথিত ‘সারি সমাধিস্থল’-এ সমাহিত ২৫৮ জন মানুষের জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। যার মধ্যে ১১২ জনকে বাভারিয়ার আলথাইম গ্রামে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। এসব সমাধির বেশিরভাগই ৪৫০ থেকে ৬২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ের। ‘জোহানেস গুটেনবার্গ ইউনিভার্সিটি মেইঞ্জ’ এর জনসংখ্যা জিনতত্ত্ববিদ ও এ গবেষণার প্রধান রচয়িতা জেনস ব্লোচার বলেছেন, “সারি সমাধিস্থলগুলো ছিল প্রাথমিক মধ্যযুগের উদীয়মান নতুন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পদ্ধতি, যেখানে ব্যক্তিদের সারিবদ্ধভাবে সমাহিত করা হত। প্রায়শই এসব কবরে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে পোশাক, অলঙ্কার ও অস্ত্রের মতো বিভিন্ন সামগ্রী দেওয়া হত। “নেদারল্যান্ডস থেকে শুরু করে হাঙ্গেরি পর্যন্ত বিস্তৃত সাবেক রোমান সীমান্তজুড়ে এ ধরনের সমাধিস্থলগুলো ছড়িয়ে ছিল।” জার্মান সীমান্তজুড়ে বিদেশি আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ঠেকাতে রোমান কর্তৃপক্ষ অনেক সামরিক আউটপোস্ট বা সীমান্ত চৌকি বসিয়েছিল। যার মধ্যে বেশ কিছু চৌকি পরবর্তীতে বড় জনবসতি ও সবশেষে বড় শহরে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমাধিস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত মেইঞ্জ, রেগেনসবার্গ, ট্রিয়ার ও কোলোন-এর মতো শহরগুলোও ছিল এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। জিনোম তথ্যমতে, পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগে রোমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার সময় সেখানে বড় এক জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছিল। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, রোমান সাম্রাজ্যের পড়তি সময়ের দীর্ঘ গোধূলিলগ্নেই উত্তর ইউরোপ থেকে ছোট ছোট জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলে দক্ষিণ দিকে চলে আসতে শুরু করেছিল। তারা রোমানদের মূল জনবসতি থেকে আলাদাভাবে বাস করতেন এবং তাদের মধ্যে অনেকেই সম্ভবত কৃষি শ্রমিক ছিল। সেই সময়ে বহিরাগতদের নির্দিষ্ট কিছু শর্তে জমি দেওয়া হত, যার মধ্যে অন্যতম ছিল রোমানদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ। গবেষক বার্জার বলেছেন, “তারা সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করেছিল এবং প্রায় একচেটিয়াভাবে নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই বিয়ে করত। ফলে তাদের জিনগত ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ ছিল।” আন্তঃবিবাহ ও একীভূতকরণ গবেষণায় দেখা গেছে, রোমান সামরিক বাহিনী ও সাধারণ জনবসতি ছিল জিনগতভাবে বৈচিত্র্যময়। রোমান সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পূর্বপুরুষদের সমন্বয়ে এ জনগোষ্ঠী গঠিত হয়েছিল। তারা জিনগতভাবে সেইসব বহিরাগতদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, যারা উত্তর ইউরোপের দূরবর্তী অঞ্চল, বিশেষ করে ব্রিটেন, বলকান অঞ্চল ও এশিয়া থেকেও ধীরে ধীরে এই এলাকায় প্রবেশ করেছিল। সংগৃহীত জিনোম তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাম্রাজ্যের পতনের পর এ দুটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে আন্তঃবিবাহের প্রচলন শুরু হয়। ফলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ একীভূতকরণ ঘটে, যা শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক মধ্যযুগের নতুন এক সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। গবেষক বার্জার বলেছেন, “আমরা সাবেক সাম্রাজ্যের সীমান্তজুড়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে মানুষের অভিবাসন লক্ষ্য করেছি। তবে এ অভিবাসনের বেশিরভাগই ঘটেছিল সাম্রাজ্যের পতনের সেই চূড়ান্ত সময়টিরও কয়েক প্রজন্ম আগে।” এ অভিবাসন প্রক্রিয়া তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দী থেকে শুরু হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এ জনস্রোত কোনো বড়, একই নৃগোষ্ঠীর উপ ব্লক বা বড় কোনো বংশের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি, বরং এ ছিল ছোট ছোট আত্মীয়তার গোষ্ঠী এবং বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের ব্যক্তিগত পর্যায়ের অভিবাসন। এ ধরনটি রোমের পতনের পর সেই চিরাচরিত ‘বর্বর আক্রমণের’ বর্ণনাকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করেছে।” রোমুলাস অগাস্টুলাস ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগেই রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম এ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘকালীন অস্থিরতা ও সামরিক বিপর্যয়ের পর পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) কেন্দ্রিক পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য হয়, যা পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে পরিচিত পায়, তা বেশ সমৃদ্ধির সঙ্গেই টিকে ছিল। গবেষণায় প্রাপ্ত জিনোম ডেটা সেই সময়কার জনসংখ্যার জনতাত্ত্বিক চিত্রও তুলে ধরেছে। সেই সমাজে নারীদের গড় আয়ু ছিল প্রায় ৪০ বছর ও পুরুষদের প্রায় ৪৩ বছর। এ ছাড়া শিশু মৃত্যুর হার ছিল অনেক এবং এ এমন এক সমাজ ছিল, যেখানে প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিশু ১০ বছর বয়সের আগেই অন্তত একজন অভিভাবককে হারাত। ততদিনে খ্রিস্টধর্ম রোমানদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গবেষণায় প্রাপ্ত জিনোম তথ্যে ইঙ্গিত মেলে, সেই সময়কার বিভিন্ন পরিবার ছিল একগামী ও একক পরিবার। বিধবা নারীরা তাদের স্বামীর পরিবারে পুনরায় বিবাহ করতেন না এবং নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে মামাতো-ফুপাতো বা খালাতো-চাচাতো ভাইবোনের মধ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ বা সামাজিক পরিহারের নীতি প্রচলিত ছিল। গবেষক বার্জার বলেছেন, “এসব বৈশিষ্ট্যই প্রাচীন যুগের শেষভাগের খ্রিস্টীয় রীতিনীতির প্রতিফলন ঘটায়।” সাম্রাজ্যের পতনের পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে উত্তর দিক থেকে আরও মানুষ এ অঞ্চলে এসে পৌঁছায়। ফলে প্রায় সপ্তম শতাব্দীর দিকে নতুন ধরনের এক জিনগত কাঠামোর আবির্ভাব ঘটে। গবেষক বার্জার বলেছেন, “এ নতুন কাঠামোটি বর্তমান মধ্য ইউরোপের মানুষের মধ্যে আমরা যে ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই এর সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।”