বাজেট ২০২৬-২৭ : গ্রামীণ মজুরের সমস্যা ও করণীয়

Posted: 17 মে, 2026

একতা ডেস্ক : (বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির উদ্যোগে গত ৮ মে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় পঠিত ধারণাপত্রটি পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো) বাংলাদেশ এখন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি দেশ। ঔপনিবেশিক পশ্চাদপদতার অচলায়তন ও প্রাক-পুঁজিবাদী অতীতকে ভেঙে সে এখন পুঁজিবাদের গাড়িতে সওয়ার হয়েছে। পুঁজিবাদের সেই গাড়িতে তার আসন এখনো প্রায় শেষ প্রান্তে হওয়ায় কতগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে পুঁজিবাদ বাংলাদেশি পুঁজিবাদ তার চেহারা রূপ ও চরিত্র সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তথাপি একথা ঠিক যে, বর্তমানে বাংলাদেশের মূল সমস্যা পুঁজিবাদের অসম্পূর্ণ বিকল্প নয়। সমস্যা হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, যে কারণে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অপসারণ করাটিই বর্তমানে মৌলিক কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষ হলো এদেশের ক্ষেতমজুররা। কথায় বলে– “ভর্তার নিচে যেমন তরকারি হয় না, নেংটির নিচে যেমন কাপড় হয় না–তেমনি ক্ষেতমুজরের নিচে মানুষ হয় না।” আসন্ন বাজেটকে সামনে রেখে সেই ক্ষেতমজুরদের একান্ত জরুরি কিছু প্রয়োজন ও স্বার্থের কথা এখানে আজ তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। ক্ষেতমজুররা এ দেশের কৃষি ব্যবস্থারই অন্যতম অংশ। কোনো সন্দেহ নেই যে এদেশের কৃষিতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সাথে সাথে একথাও সত্য যে, কৃষিতে ঘটে যাওয়া এই উন্নয়নের প্রধান কারিগর হলো ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুর এবং মেহনতি কৃষক। অথচ জাতীয় বাজেট নিয়ে ভাবনার ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ-চিন্তা আগাগোড়া একেবারেই উপেক্ষিত থেকেছে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংযুক্তি, উৎপাদনের বহুমুখীকরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন উন্নত উৎপাদন উপকরণ ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কৃষিখাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুর এবং মেহনতি কৃষক তার প্রধান কারিগর হলেও, পুঁজিবাদের কাঠামোতে থেকে নয়া-উদারবাদী মডেলে তাদের এর সুফলের ন্যায্য ভাগিদার হওয়ার কোনো সুযোগ তাদের ছিল না। তারা শুধু বঞ্চিতই হয়নি, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তাদের বরঞ্চ ‘উন্নয়নের প্রসব বেদনার ভিকটিম’ করে রেখেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উন্নয়ন পরিমাপের ক্ষেত্রে জিডিপি বা সামষ্টিক জাতীয় আয়কে প্রধান সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও অংশের মধ্যে উন্নয়নের ফসল কী প্রকারে ও কী অনুপাতে বণ্টন হলো, সে বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে জিডিপিকে উন্নয়নের একমাত্র বা প্রধান মাপকাঠি বলে গণ্য করা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তা সত্ত্বেও, এটিকেও যদি উন্নয়ন বলে গণ্য করা হয়, তাহলেও বলতে হয় যে সেক্ষেত্রেও এদেশে তার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিল ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুরেরা। একদিকে গ্রামাঞ্চলে ক্রমবর্ধমানভাবে চলতে থাকা নিষ্ঠুর ‘নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া’ ও পাশাপাশি জমির বিভক্তি হতে হতে এক পর্যায়ে কেউ প্রান্তিক কৃষক, কেউবা ভূমিহীন দিনমজুরে পরিণত হয়েছে। এদের অধিকাংশই একসময় ক্ষেতমজুর হিসেবে শস্য পণ্য উৎপাদনের কাজ করতেন। অন্য একটি অংশ সনাতনী ধারায় বংশানুক্রমিক কিংবা স্থায়ী সামাজিক শ্রম বিভাগের প্রথা অনুসারে জেলে, কামার, কুমার ইত্যাদি হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্তমানে দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৭.৫ কোটি (প্রায় ৪৭%) গ্রামীণ মজুর। নিঃস্ব হয়ে পড়া সবার জন্য কৃষিতে সারা বছর কাজের সংস্থান হয় না। ফলে ক্ষেতমজুরি করার বাইরে তাদের অনেককেই বছরের অধিকাংশ সময় নানা ধরনের অকৃষিজ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আজকাল তাদের একাংশ, অনাবাসী কৃষক অথবা কৃষিকাজ লাভজনক না হওয়ায় তাতে উৎসাহ হরিয়ে ফেলা কিছু মাঝারি ও গরিব কৃষকের কাছ থেকে জমি বর্গায় অথবা চুক্তিতে লিজ নিয়ে চাষ করছেন। যেসব গ্রামীণ মজুরেরা এভাবে চুক্তিতে জমি নিয়ে দিন রাত পরিশ্রম করে ফসল ফলান তারা উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম পান না। আবার অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে তারা যে মজুরি পান তাতেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণ হয় না। এই অবস্থায় কৃষিকাজের ফাঁকে কেউ কেউ অকৃষি কাজে যেমন ভ্যান-রিকশা চালানো, মুটেগিরি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নির্মাণকাজ, হকারি ইত্যাদি করে দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে চেষ্টা করেন। গ্রামীণ মজুরদের অনেকের ক্ষেত্রেই ফসলি মৌসুমের বিশেষ সময়ে (যখন মজুরি তুলনামূলক বেশি) কৃষিকাজ করলেও, বছরের বেশিরভাগ সময় অকৃষি কাজের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করার প্রবণতা বাড়ছে। এতকিছুর পরও দিন মজুরদের সারাবছর নিশ্চিত কাজ ও ন্যূনতম মজুরি না থাকায় তাদের অনিশ্চয়তার নিদারুণ যন্ত্রণায় নিরাপত্তাহীন মানবেতর জীবন কাটাতে হয়। উপরন্তু, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামীণ মজুর ক্ষুদ্র ঋণের চক্রে আটকা পড়ে রয়েছে। সাম্প্রতিককালে জাতীয় ‘উন্নয়নের’ নামে পুঁজি ও নির্বিচারে প্রযুক্তির প্রয়োগের আগ্রাসনে গ্রামাঞ্চলে গ্রামীণ মজুরদের কাজের ক্ষেত্র ক্রমান্বয়ে কমছে। যেমন: (১) কৃষিতে পাওয়ার টিলার, মাড়াই কল, হার্ভেস্টর ইত্যাদির ব্যবহার শ্রমঘন প্রযুক্তির জায়গা ক্রমে দখল করে নিচ্ছে। (২) আধুনিক কৃষি খামার গড়ে উঠছে যেখানে স্বল্প সংখ্যক মজুরের প্রয়োজনীয়তা থাকে। (৩) বিভিন্ন ফলের বাগান, মৎস্য চাষ ইত্যাদির প্রসার ঘটেছে–যেখানে কাজে আপেক্ষিকভাবে কম মজুর লাগে। (৪) রাস্তাঘাট নির্মাণ সংস্কার, খাল খনন ও পুনঃখনন ইত্যাদি কাজে যন্ত্রের ব্যবহারের কারণে শ্রমিকের আপেক্ষিক নিয়োগ সেখানেও সীমিত থাকছে। নিজ এলাকায় সুবিধাজনক কাজ না থাকায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা সংখ্যক মজুর কাজের জন্য অন্য জেলায় বা এলাকায় চলে যান। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে মজুরেরা দলে দলে তুলনামূলক উচ্চ মজুরির জন্য এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যান। যাবার পথে দুর্ঘটনায় মৃত্যু, পঙ্গুত্ববরণ, বজ্রপাতে অকালমৃত্যু ইত্যাদি ঘটে থাকে। বজ্রপাত ও দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে এককালীন কমপক্ষে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ও আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক কর্তব্য হলেও তা করা হয় না। সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মাধ্যমে প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলেও তার সামান্যই এসব গ্রামীণ মজুরের ভাগ্যে জোটে। ফলে প্রায়শই অভাবের তাড়নায় বা যেকোনো দুর্যোগে তাদের, বিশেষ করে নারী মজুরদের উচ্চ সুদে এনজিও/মহাজনদের নিকট থেকে ঋণ নিতে হয়। এই ঋণের কিস্তি পরিশোধে তাদের তটস্থ থাকতে হয়। কেউবা পালিয়ে বেড়ান, এমনকি কেউ কেউ আত্মহত্যাও করেন। খাইখালাসি ব্যবস্থায় এই ঋণ মওকুফ করা একান্তভাবে প্রয়োজন ও জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ও বিনা সুদে এই মজুরদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে। কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামোতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ব্যবহার যেন গ্রামের বিত্তহীন মজুরদের স্বার্থকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে সমাজ নিয়ন্ত্রণে বিত্তবানদের একতরফা হাতিয়ার না হয়ে উঠতে পারে সেজন্য পাওয়ার টিলার, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, ভেকু ইত্যদি ব্যক্তিগত মালিকানায় না দিয়ে ক্ষেতমজুর-মেহনতি কৃষককে নিয়ে সমবায় গঠন করে তাদের সহজ শর্তে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। হাওরসহ নিম্নাঞ্চলের ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষেতমজুর বা গ্রামীণ মজুররা এই সকল জমির মালিক না হলেও তারাই লিজ বা বর্গা নিয়ে এসব জমি চাষ করে থাকেন। ফলে এই বর্গাচাষী দরিদ্র মানুষগুলোর ক্ষতিই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সকল ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক তালিকা করে আগামী ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত সরকারি সহায়তা দেওয়া নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া রোধ করার জন্য জরুরি। জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ। আর্থিক ক্ষমতাসহ এসব স্বশাসিত স্থানীয় সংস্থার ক্ষমতায়নের জন্য মৌলিকভাবে সংস্কার শুরু করা প্রয়োজন। তা না করে উপজেলা পরিষদে এমপিদের বসার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং জনগণের ক্ষমতায়ন- উভয় ক্ষেত্রেই তা বিপরিতমুখী ও প্রতিবন্ধক হবে এই বিধান বাতিল করা তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে গ্রামীণ বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বরাদ্দ সম্পর্কিত সব তথ্য, বিতরণে অনিয়ম দূর করার সুবিধার্থে সাধারণ মানুষকে জানার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড যেন প্রকৃত দরিদ্র, অসহায় পরিবারগুলো পায় তা নিশ্চিত করার জন্য এসবের বিতরণ ব্যবস্থাপনায় ক্ষেতমজুর সমিতির প্রতিনিধি রাখা একান্ত প্রয়োজন। একসময় আদিবাসী ও নিম্নবর্ণের নারী গ্রামীণ মজুর হিসেবে কাজ করলেও অন্যরা বাড়ির বাইরে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন না। এখন গ্রামীণ মজুর পরিবারের অনেক নারী, এমনকি অনেক শিশুও মজুরের কাজ করেন। কিন্তু নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম। ‘সমান কাজে সমান মজুরি’র নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা সাপেক্ষে মজুরি বৈষম্য দূর করা একান্তভাবে প্রয়োজন। অনেক গ্রামীণ মজুরদের বৃদ্ধ বয়সেও মজুরি খাটতে হয়। তার পক্ষে এই বয়সে যেমন দূর-দূরান্তে গিয়ে কাজ করা সম্ভব হয় না, তেমনই নিজ এলাকায় ভারী কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করাও সম্ভব হয় না। বর্তমানের ৬৫০ টাকা মাসিক বয়স্ক ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়, তা কোনোভাবেই ন্যূনতম চাহিদার ধারে কাছে নয়। আসন্ন বাজেটে ষাটোর্ধ্ব মজুরদের জন্য বিনা কিস্তিতে কমপক্ষে ১০,০০০ টাকা পেনশন চালু করতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। সাধারণ জীবনযাপনের উপযোগী পরিমাণ মজুরিতে সরকারিভাবে ‘১০০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। সেই সাথে ক্ষেতমজুরদের সন্তানদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অগ্রাধিকারমূলকভাবে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া প্রচলিত বিভিন্ন ভাতা যেমন বিধবা ভাতা, প্রসূতি ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদির পরিমাণ দ্রব্যমূল্যের সাথে সঙ্গতি রেখে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। গ্রাম-শহরের গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বল্প দামে নিত্যপণ্য স্থায়ীভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করতে রেশনিং ব্যবস্থা চালু ও তার অংশ হিসেবে পল্লী রেশনিং চালু করা খুবই জরুরি। তাছাড়া, হাট-বাজারে ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ মজুরদের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে খাজনা/তোলা আদায় সম্পূর্ণ বাতিল করাও একান্তভাবে প্রয়োজন। সংবিধানে খাদ্য-বস্ত্র-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থান রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলেও, এগুলিকে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যা খুবই জরুরিও অত্যাবশ্যক। এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের আইনি পদক্ষেপ ও তা বাস্তবায়নে উপযুক্ত বিধি-বিধান তৈরি করা প্রয়োজন। গ্রাম-ইউনিয়ন-উপজেলা পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধে টিকা, ভিটামিন ধারবাহিকতা রক্ষা করাটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এবার ৪৫ হাজার-এর বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রায় ৩০০ জনেরও বেশি শিশুর হামে মৃত্যুর ঘটনা প্রতিরোধী চিকিৎসা ঘাটতির জ্বলন্ত প্রমাণ। ক্ষেতমজুররা সুষম খাদ্যের অভাবে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন এবং ঠিকমত চিকিৎসার অভাবে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। ফসল ফলাতে ফসলি জমিতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কীটনাশক ব্যাবহার করার ফলে ক্ষেতমজুররা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি মরণব্যাধি ক্যানসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি কাজ। উপরের স্তরের হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দালালের দৌরাত্ম্যের ফলে মজুররা প্রায়শই চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এসব সমস্যা নিরসনে যথাযথ সরকারি উদ্যোগ খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ মজুরদের বসতভিটা নেই। যাদের বসতভিটা আছে তারাও গাদাগাদি করে থাকেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের যে আশ্রয়ণ প্রকল্প তাতেও দুর্নীতি হয়েছে। বসত-ভিটাহীন প্রতিটি পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বসতভিটার ব্যবস্থা করতে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা আবশ্যক। আইন অনুযায়ী দেশের সমুদয় খাসজমির মালিক দেশের ভূমিহীনরা। ক্ষেতমজুর সমিতির আন্দোলনের ফলে অতীতের স্বৈরাচার এরশাদ সরকার ১ টাকা সেলামিতে স্বামি-স্ত্রীর যৌথ নামে বিক্রয় অযোগ্য শর্তে ভূমিহীনদের খাসজমি প্রদানের আইন ও হাওর-বাঁওড় সকল খাস জলাশয় জেলে তথা মৎস্যজীবীদের বরাদ্দ দিতে বাধ্য হয়েছিল। এই বরাদ্দকৃত জমি-জলাশয় আজ বেশিরভাগ বেআইনি দখলদারদের কব্জায়। দেশের প্রতি ইঞ্চি খাসজমি-জলাশয় অবৈধ দখলমুক্ত করে প্রকৃত ভূমিহীনদের দখল প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষেতমজুর সমিতিকে সাথে নিয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা জরুরি ও একান্ত আবশ্যক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আই.এল.ও) সনদে ক্ষেতমজুরসহ গ্রমীণ মজুরদের শ্রমিকরূপে স্বীকৃতি প্রদান ও তাদের অধিকারের নিশ্চয়তা বিষয়ক যেসব কনভেনশন ও সুপারিশ আছে, আজও সেসবের বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো যাদের শ্রমিক হিসেবে আইনি স্বীকৃতি না থাকায় ক্ষেতমজুররা জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অধিকার ভোগ করতে পারছে না। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান ও ৩০,০০০/- টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ক্ষেতমজুরদের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা আজ সরকারের জরুরি কর্তব্য। শেষ কথা বাংলাদেশের ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুররা জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম কারিগর। দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক মেহনতি মানুষ সবচেয়ে শোষিত, বঞ্চিত ও নিরাপত্তাহীন। তাদের অবহেলায় পাশ কাটিয়ে এবং তাদের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে কৃষি তথা গ্রামীণ অর্থনীতিতে দ্রুত নানামুখী পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে। এর ফলে সমাজে শ্রেণি হিসেবে তাদের মূল্য, মর্যাদা, শক্তি, সংগঠিত হওয়ার সুযোগ ইত্যাদি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। তাই, উল্লিখিত ব্যবস্থাগুলো গ্রহণের স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সরকারকে বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। উন্নয়নের ভিন্নতর যে গণমুখী মডেল আছে তা অনুসরণে তাকে বাধ্য করতে হবে, সে তা না করলে নিজেরা রাষ্ট্রক্ষমতার অধিষ্ঠিত হয়ে সেই পথে দেশ পরিচালনা করতে হবে। ক্ষেতমজুরদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। আমাদের এই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সেজন্য সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে ক্ষেতমজুরসহ গ্রামীণ মজুরদের ঐক্যবদ্ধ জাগরণের বিকল্প নেই এবং শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র জনতার জয় অবশ্যম্ভাবী।