জাতীয় বাজেট, প্রান্তিক অর্থনীতি ও ব্যাটারিচালিত পরিবহন
Posted: 17 মে, 2026
প্রতি বছর জুন মাসে যখন মহান জাতীয় সংসদে জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়, তখন তা কেবল আগামী ৩৬৫ দিনের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বাজেট হলো একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের দর্পণ। একটি উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পদের সুষম বণ্টন এবং আয় বৈষম্য হ্রাস করা। বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও পদ্ধতিগত। সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে ব্যয়ের প্রস্তাবনা আহ্বান করে। বিভিন্ন ধাপে এনবিআর, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং সিভিল সোসাইটির সাথে প্রাক-বাজেট আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের সবচেয়ে বড় অংশীদার- পরিবহন শ্রমিক, বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চালকদের কণ্ঠস্বর এই নীতি-নির্ধারণী টেবিলে পৌঁছাতে পারে না। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় এই শ্রমজীবী মানুষগুলো কেবল যাত্রী বহনকারী চালক নন, বরং তারা গ্রামীণ ও উপশহরের অর্থনীতির শিরা-উপশিরা সচল রাখার প্রধান কারিগর। তাদের শ্রমের ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে দেশের বিশাল এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাটারিচালিত
পরিবহন খাতের গুরুত্ব
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক খাতের গুরুত্ব এখন আর কেবল যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের (আনুমানিক) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ লাখ (৭ মিলিয়ন) ব্যাটারিচালিত ক্ষুদ্র যানবাহন চলাচল করছে। যদি গড়ে প্রতিটি যানবাহনের ওপর ৪ থেকে ৫ জন মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্ভরশীলতা ধরা হয়, তবে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি এই খাতের সাথে যুক্ত।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খাতটি দেশে ‘তৃণমূল উদ্যোক্তা’ তৈরির এক কারখানা। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ বা সরকারি বড় বিনিয়োগ ছাড়াই সাধারণ মানুষ জমি বিক্রি করে বা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে এই যানগুলো ক্রয় করে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এটি বাংলাদেশের বেকারত্ব হ্রাসে অভাবনীয় ভূমিকা রাখছে। প্রতিদিন এই ৭০ লাখ যানবাহনের মাধ্যমে যে পরিমাণ ভাড়া আদায় হয়, তার সিংহভাগই স্থানীয় বাজারে ব্যয় হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের তারল্য (খরয়ঁরফরঃু) বজায় রাখে। এছাড়া ইজিবাইকের বডি তৈরি, ব্যাটারি রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার-টিউব এবং যন্ত্রাংশের দোকান মিলিয়ে দেশজুড়ে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটেছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ জাতীয় জিডিপিতে (এউচ) অদৃশ্যভাবে এক বিশাল অবদান রেখে চলেছে, যা সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে প্রায়শই অবমূল্যায়িত থেকে যায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিপ্লব
বিশ্বজুড়ে যখন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েলের ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের ব্যাটারিচালিত যানবাহনগুলো নিঃশব্দে একটি ‘গ্রিন রেভোলিউশন’ বা সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছে। এগুলো আমদানিকৃত অতি মূল্যবান ডিজেল বা পেট্রোলের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং দেশীয় বিদ্যুতের ওপর চলে। এতে করে সরকারের জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। যদিও বিদ্যুতের ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, কিন্তু এটি ভুলে গেলে চলবে না যে, এই যানবাহনগুলো মূলত রাতে চার্জ হয় যখন গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে এবং সরকার নির্ধারিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে।
যদি আমরা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাটারি এবং পরিকল্পিত স্মার্ট চার্জিং স্টেশন প্রবর্তন করতে পারি, তবে এই খাতটি এশিয়ার মধ্যে পরিবেশবান্ধব পরিবহনের অন্যতম মডেলে পরিণত হবে। এতে যেমন শব্দ দূষণ নেই, তেমনই বিষাক্ত কার্বন নিঃসরণও শূন্য। জাতীয় বাজেটে যদি এই খাতের আধুনিকায়নের জন্য আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ছাড় ও স্থানীয় উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।
আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক স্বীকৃতির সংকট
এই খাতের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও, শ্রমিকরা আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি। ব্যাটারিচালিত যানবাহনের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল না হওয়ায় চালকরা প্রতিনিয়ত স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রভাবশালী মহলের হয়রানির শিকার হন। বাজেটে এই খাতের জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বা ‘রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা জরুরি। রেজিস্ট্রেশন ফি-র মাধ্যমে সরকার এখান থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে, যা দিয়ে পুনরায় এই খাতেরই উন্নয়ন সম্ভব। নীতিমালার অভাবে এই খাতের শ্রমিকরা কোনো ব্যাংক ঋণ পায় না, ফলে তারা মহাজনদের চড়া সুদের ফাঁদে আটকে থাকে। বাজেটে সরকারি ব্যাবস্থাপনায় এসএমই (ঝগঊ) খাতের আওতায় এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তা তাদের আত্মনির্ভরশীলতাকে আরও শক্তিশালী করবে।
মহাসড়কে নিরাপত্তা ও সার্ভিস লেনের দাবি
বিগত বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশের সাধারণ মানুষের প্রধান বাহন ইজিবাইক বা রিকশার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সেখানে অনুপস্থিত। হাইওয়েগুলোতে সার্ভিস লেন না থাকার কারণে এই ধীরগতির যানবাহনগুলো দ্রুতগতির বাসের সাথে একই রাস্তায় চলতে বাধ্য হয়, যা সড়ক-মহাসড়কগুলোকে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাপ্রবণ করে তুলছে।
জাতীয় বাজেটে মহাসড়কের পাশে ‘ডেডিকেটেড সার্ভিস লেন’ নির্মাণের জন্য পৃথক মেগা প্রজেক্ট ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল দুর্ঘটনা কমাবে না, বরং পণ্য পরিবহন এবং স্থানীয় যাতায়াতকে আরও দ্রুততর করবে। ঢাকা-ময়মনসিংহ বা ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো ব্যস্ত সড়কগুলোতে যেখানে স্থানীয় মানুষের জীবনজীবিকা সড়কের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সার্ভিস লেন ছাড়া উন্নয়ন কখনোই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।
সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী (ঝড়পরধষ ঝধভবঃু ঘবঃ)
ও শ্রমিক কল্যাণ
পরিবহন শ্রমিকরা দেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশার মানুষ। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে তারা সেবা দিয়ে যান। অথচ তাদের কোনো স্বাস্থ্য বিমা নেই, নেই কোনো অবসরকালীন সুবিধা। বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর আওতায় এই ৭০ লাখ শ্রমিকের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা উচিত।
স্বাস্থ্য বিমা: পেশাগত দীর্ঘমেয়াদী রোগ ও দুর্ঘটনার চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্য বিমার জন্য বাজেটে উদ্যোগ থাকা জরুরি।
দুর্ঘটনা বিমা: কোনো শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে মারা গেলে বা পঙ্গুত্ব বরণ করলে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে এককালীন যৌক্তিক অঙ্কের অনুদান।
পারিবারিক রেশন: নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এই সময়ে নিম্নআয়ের এই চালকদের জন্য বিশেষ ওএমএস (ঙগঝ) ব্যবস্থা। সরকার যদি এই খাত থেকে ক্ষুদ্র রেজিস্ট্রেশন ফি সংগ্রহ করে একটি ‘শ্রমিক কল্যাণ তহবিল’ গঠন করে, তবে তা বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়েই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও স্মার্ট ট্রান্সপোর্টেশন
ভবিষ্যৎ বাজেটগুলোতে এই খাতের আধুনিকায়নের জন্য ‘প্রযুক্তিগত ভর্তুকি’ রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যদি তা সঠিকভাবে রিসাইকেল না করা হয়। ব্যাটারি রিসাইকেল সেন্টার নির্মাণ এক্ষেত্রে সমাধান হতে পারে। বাজেটে উন্নত প্রযুক্তির ব্যাটারি এবং মোটরের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করলে চালকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আধুনিক প্রযুক্তিতে স্থানান্তরিত হবে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক সোলার চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং গ্রিন এনার্জির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক প্রভাব
ব্যাটারিচালিত যানবাহন কেবল পুরুষদের কর্মসংস্থান নয়, বরং পরোক্ষভাবে নারীর ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখছে। গ্রামের মেয়েরা এখন খুব সহজেই নিরাপদ ও সস্তা এই যানে চড়ে স্কুল-কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে যেতে পারছে। অনেক জায়গায় নারীরাও এখন ইজিবাইক চালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এই সামাজিক পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করতে বাজেটে নারী চালকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
নীতিনির্ধারণী সুপারিশমালা
আগামী জাতীয় বাজেটে এই বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
১. জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা: বিআরটিএ কর্তৃক নামমাত্র ফি-তে যানবাহনের নিবন্ধন ও ডিজিটাল নম্বর প্লেট প্রদান।
২. শ্রমিক ডাটাবেজ: ৭০ লাখ চালকের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা, যেন “সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী”র বরাদ্দ ও দুর্যোগকালীন সময়ে তাদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়।
৩. ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যাটাস: এই খাতকে ‘ক্ষুদ্র শিল্প’ হিসেবে ঘোষণা করা, যেন তারা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা পায়। ভকেশনাল ও পলিটেকনিকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের দিয়ে ওয়ার্কশপসমূহকে নির্মাণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, তাতে একদিকে নতুন বাহন নির্মাণের হার নিয়ন্ত্রিত হবে পাশাপাশি বিপুল দক্ষ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে উঠবে।
৪. হাইওয়ে নীতিমালা: সার্ভিস লেনবিহীন হাইওয়েতে ছোট যান চলাচলের বিকল্প পথ নিশ্চিত করা।
শেষ কথা
একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছায়। বাংলাদেশের ৭০ লাখ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের শ্রমিক কেবল ভোটার নন, তারা দেশের অর্থনীতির অতন্দ্র প্রহরী। তাদের উপেক্ষা করে বা তাদের কর্মসংস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলে কোনো স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হোক এই বিশাল কর্মীবাহিনীর অধিকার আদায়ের হাতিয়ার।
সরকার যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এই খাতকে আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসে এবং বাজেটে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তবে তা হবে একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির মাইলফলক। পরিশেষে, নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান থাকবে–বাজেট যেন কেবল কর আদায়ের যন্ত্র না হয়, বরং তা যেন হয় এই সত্তর লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্নের প্রতিফলন। তাদের ঘাম আর শ্রমের বিনিময়েই গড়ে উঠবে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
লেখক : সংগঠক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন