সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 03 মে, 2026

একতা ডেস্ক : [এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। (৮) [দেশভাগের পরে কমিউনিস্ট পার্টি এদেশে একটি স্বাধীন পার্টি হিসেবে যাত্রা শুরুর সময়টাতে ‘বাম বিচ্যুতির’ লাইনে অগ্রসর হচ্ছিল। তখনকার দিনে পার্টি কমরেডরা কী ধরনের ও কী পদ্ধতিতে কাজ করতেন তার নির্দশন হিসেবে ২টি শাখা সভার ও ১টি সাধারণ সভার কার্যবিবরণী (আংশিক) আজ এখানে মূদ্রিত হলো। সেই সাথে গ্রামে গ্রামে ক্ষেতমজুর সমিতি গড়ার আহ্বান জানিয়ে একই মাসে কৃষক সভার পক্ষে প্রচারিত একটি প্রচারপত্র (আংশিক) মূদ্রিত হলো] ॥ এক ॥ সুরদিয়া এলাকার কয়েকজন সভ্যের সভা স্থান : সুরদিয়া তারিখ : ০৬.০২.৪৯ উপস্থিত : ১। কম. কালী শংকর দাস ২। শাহেদ আলি ৩। সুনীল ঘোষ ৪। সুধীর চন্দ আলোচ্য বিষয় : ১। সেল গঠন ২। রিপোর্ট ৩। কর্মপন্থা ৪। বিবিধ সভাপতি : কমরেড সুধীর চন্দ। ১. এলাকার কার্য্য পরিচালনা করিবার জন্য একটি সেল গঠন বড় দরকার। উপরে লিখিত কমরেডদের নিয়া সুরদিয়া সেল গঠন করা হইল। সেলের সম্পাদক কমরেড সুনীল ঘোষকে করা হইল। ২. রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে আলোচনা এবং এলাকার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা আলোচনা করা হইল। ৩. কর্মপন্থা : ক্ষেতমজুরের তথ্য সংগ্রহ করিবার জন্য কমরেড কালী শংকর দাসকে পাইল ভোগ এবং কমরেড শাহেদ আলিকে টুইন্যা মান্দ্রা গ্রামের ভার দেওয়া হইল। আগামী ১৫ তারিখের মধ্যে পাইলভোগে বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা করিবার জন্য একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করিতে হইবে। কুকুটিয়া স্কুলে ছাত্রদের মাহিনা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছাত্রদের ধর্মঘট আন্দোলন চালনা করিবার ভার কমরেড সুনীল ঘোষকে দেওয়া হইল। ৪. পার্টি তহবিল আদায়ের জন্য নিম্নলিখিত কোটা দেওয়া হইল। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে কমরেড কালী- ৩ টাকা, কমরেড শাহেদ আলি- ১০ টাকা। (খ) রাজনৈতিক কাজ- (সাম্যবাদের ফতোয়া) আগামী বুধ, বৃহস্পতি, শুক্রবার- কমরেড সুধীর চন্দকে দায়িত্ব দেওয়া হইল। (গ) আগামী সেল সভা ১৫ দিনের মধ্যে করা হইবে। রাত্রি ৮টায় সভা শেষ হইল। ॥ দুই ॥ ১নং সেলের ২য় সভা তারিখ : ১৬.০২.৪৯ উপস্থিত: (১) কম. কৈলাশ (২) সরাফত আলী (৩) সুলতান (৪) সুজাত আলী (৫) শশধর আলোচ্য বিষয়- ১। গত সভার কার্যবিবরণী পাঠ; ২। রিপোর্ট ও আত্মকথা; ৩। শশধরকে সেলের অন্তর্ভুক্ত করা; ৪। কর্মপন্থা। বিবিধ- সভাপতি- সরাফত আলী ১। গত সভার কার্যবিবরণী পঠিত ও গৃহীত হইল। (২) কৈলাশ- পাইলভোগে কয়েকজন ক্ষেতমজুরের সাথে আলাপ করিয়াছি, তাহাদের বেশ উৎসাহ আছে। আমার গাফলতির দরুণ সেটি করা সম্ভব হয় নাই। আলোচনা করিয়া বুঝা যায় যে, একটি কমিটি করা সম্ভব এবং কয়েকজনকে দিয়া কাজ করানো যাবে। আজ পর্য্যন্ত পার্টি ফাণ্ড তুলিতে পারি নাই, তবে ২/১ দিনের ভিতর তুলিয়া দিব। সুলতান : স্কুলে ধর্ম্মঘট করা সম্বন্ধে কয়েকজন ছাত্রের সাথে আলোচনা করিয়াছি, তাহার স্কুলের সমস্ত ছাত্রের সাথে আলাপ করিবে। ধর্ম্মঘট সম্বন্ধে পোষ্টার দেওয়ার ভার দেওয়া ছিল কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে বচসা হওয়ায় ছাত্র দ্বারা দেওয়া হয় নাই। তবু পোষ্টার দেওয়া হইয়াছে। আবার ছাত্রদের সাথে আলাপ করিতে হইবে এবং পোষ্টার দিতে হইবে। আলোচনা করার পর বুঝা যাবে ধর্ম্মঘট করা যাবে কি-না। সরাফত আলী- কমরেড কৈলাশের গাফিলতিতে সাম্যবাদের ফতোয়া পড়া হয় নাই। বর্তমান বিপ্লবী আন্দোলনে রাজনৈতিক জ্ঞান না থাকিলে আমরা কিছুই করিতে পারিব না। সরাফত আলী সময় দিয়া দুদিন সময় বদলায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ইহা খুবই খারাপ। আমাদের এই সম্বন্ধে হুশিয়ার হওয়া দরকার। ৩। কমরেড শশধর শিলার থেকে এসে সে যদি এখানে থাকে তবে ২০ দিন পর তাহাকে সেলে নেওয়া হইবে। ৪। কর্মপন্থা- সরবত ও কৈলাশ পূর্ব্বের কর্মপন্থাই ছিল। শশধর তার পাড়ায় আগামীকল্য একটা ছোটখাটো বৈঠক করিবে। বর্তমানে মহাজনে ও কারীয়াদের যে সংঘর্ষ চালাইয়াছে তাহার জন্য এবার আন্দোলন চালাইতে হইবে। আগামী সভা ২৩ তারিখ। ॥ তিন ॥ পশ্চিম বিক্রমপুর পার্টি সভ্যদের সাধারণ সভা স্থান : ২নং এলাকা তাং : ২৬.০৩.৪৯ উপস্থিত : ১। রমিজউদ্দিন ২। জিয়ারত ৩। সুবেদ আলী ৪। সরাফত আলী ৫। সুলতান ৬। সুজাত আলী ৭। কৈলাস আলোচ্য বিষয় : ১। রিপোর্টিং-আলোচনা ও সমালোচনা ২। কর্মপন্থা গ্রহণ ৩। বিবিধ। সভাপতি- সুজাত আলী : গত সেল সভা হইবার ২ দিন পরই রমিজউদ্দিন গ্রেপ্তার হন। এবং অদ্য হইতে ২ দিন পূর্বে মুক্তি পান। ---তাহার গ্রেপ্তার হওয়ার জন্য সে কিছুটা দায়ী কারণ পার্টি তাহাকে ঈঙ- এর ডাকে তার বাসায় যাইতে নিষেধ করা সত্ত্বেও সে গিয়া ধরা পড়িয়াছে। তাই পার্টি থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে শাস্তি দিতে প্রস্তুত। রমিজউদ্দিনের অভিমত যে, জিয়ারতকে পার্টি থেকে রিপোর্ট করা দরকার, কারণ সে ভয় পাইয়া কাজে ফাঁকি দিয়াছে অথচ মুখে সাহস দেখাইয়াছে। তাহার মতে, সুলতান তাহার মুক্তির আন্দোলন করার চেষ্টা করে নাই। কৈলাস : পার্টি শৃঙ্খলা বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণভাবে পালন করা উচিত। রমিজউদ্দিনের রিপোর্ট অনুযায়ী সে এবং জিয়ারত শাস্তি পাইতেও পারে। শরাফত : ২নং এলাকায় কমরেডগণ রমিজউদ্দিনের গ্রেপ্তারের পর অত্যন্ত ভীত। তাহারা যে বিজ্ঞাপন বিতরণ করেছিল জনসাধারণ তাহা আবার রাস্তায় রাস্তায় দেওয়ালের গায়ে লাগাইয়া দিয়াছিল। গ্রামে দারোগা আসার ভয়ে তাহারা জিয়ারতের নেতৃত্বে ওই সমস্ত বিজ্ঞাপন তুলিয়া নিয়াছে। জনগণ অগ্রসর হইতে চাহিতেছে আর কমরেডগণ তাহাদের পিছনে নিতে চাহিতেছে। ইহা পার্টি নীতি বিরোধী।--- জিয়ারত : আমি গত সেল সভায় যে কাজ নিয়াছিলাম; তাহা করি নাই এবং ভয়ে পার্টিকে ফাঁকি দিয়াছি। আমি শাস্তি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত। সুবেদ আলী : আমি যে কাজ নিয়েছিলাম তাহা করিয়াছি। কিছুটা অকৃতকার্য্য হওয়ার কারণ এই যে- রমিজউদ্দিনের গ্রেপ্তারের পর আমরা সব ঘাবড়াইয়া গিয়াছিলাম।--- সুলতান : রমিজউদ্দিনের ৭ দিন পার্টিসভ্য পদ বাতিল ও জিয়ারতের ১ মাস এবং সুবেদ আলীকে ভলান্টিয়ার গ্রুপে রাখিয়া তাহাকে রাজনৈতিক শিক্ষা দিয়া উন্নত করা যাতে সে সত্যিকার পার্টিসভ্য হইয়া পার্টিতে আসিতে পারে। সুজাত আলী : কমরেড সুলতানের সহিত একমত। এই সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হইল।--- কর্মপন্থা : ১। পোস্টার লাগানোর দায়িত্ব- জিয়ারত। একটি স্কোয়াড পরিচালনা করার দায়িত্ব জিয়ারতের উপর। ২। জঙ্গী ক্যাডারদের রাজনৈতিক ক্লাস অর্গানাইজ করার দায়িত্ব রমিজউদ্দিনের উপর।--- সুজাত আলী, সভাপতি। ২০.০৩.৪৯ ॥ চার ॥ ১নং সেলের সভা তারিখ: ০৪.০৮.৮৯ উপস্থিত সদস্য- ১ জন, কেলাশ ২ জন, সুজাত আলী ১ জন, সুলতান ৪ জন। সুজাত আলী আলোচ্যসূচি ১। গত সভার বিবরণী পাঠ ও গ্রহণ ২। আলোচনাসভা ৩। সাংগঠনিক পাঠ ৪। কর্মসূচি গ্রহণ  (ক) ১৫ আগস্ট  (খ) খাদ্য  (গ) ফান্ড ৫। বিবিধ সভাপতি : সুজাত আলী ১, ২, ৩ নং আলোচ্য বিষয় পাঠ ও আলোচনা করিয়া গ্রহণ করা হইল। ৪। নিম্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হইল- (ক) ১৫ আগস্টের প্রস্তুতি করার জন্য-  (১) পাইলটতলা  (২) কাজলপুর  (৩) ইঞ্জিনিয়ার  (৪) পূর্ব মুন্সা বৈঠকের দায়িত্ব কেলাশের উপর দেওয়া হইল। (খ) ঝাড়াইটা গ্রামের দায়িত্ব শরাফত ও সুজাত আলীর ওপর দেওয়া হইল। (গ) নাগরগাঁও গ্রামের বৈঠকের দায়িত্ব সুলতান মিয়ার উপর দেওয়া গেল। (ঘ) বৈঠকের তালিকা - ১৩ আগস্টের মধ্যে শেষ করিতে হইবে। (ঙ) স্কোয়াড শনিবার পাইলটতলা, ইঞ্জিনিয়ার, নংপাড়া দায়িত্ব কেলাশ ও সূর্যতালির উপর রহিল। রবিবার - কুটুরিয়া, ঝাড়াইটা, কাজলপুর গ্রামের দায়িত্ব কেলাশ, সরবত আলীর উপর ভার দেওয়া হইল। (চ) ১৪ আগস্ট (১৫ আগস্টের প্রস্তুতি) কুটুরিয়া স্কুল, বাজারে প্রচার করিতে হইবে। (ছ) ১৫ আগস্ট - শোভাযাত্রা (জ) পোস্টারিং- সোমবার - গোপালী মাঠ লিখিবার দায়িত্ব (কৈলাশ, সুজাত আলী, সুলতান) ফান্ড সম্পর্কে পরবর্তী সভাতে আলোচনা হইবে। সুজাত আলী ০৪.০৮.৮৯ ॥ পাঁচ ॥ প্রচারপত্র গ্রামে গ্রামে ক্ষেতমজুর সমিতি গড়িয়া তুলুন লাঙল যার জমি তার জমিদারি খতম কর     বাঁচার মত মজুরি চাই ঢাকা জেলার প্রতি গ্রামে জমিহীন এবং অপ্রতুল জমির মালিক বিপুল সংখ্যক লোককে ক্ষেত মজুরি করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতে হয়। বৎসরের সমস্ত সময় তাহাদের কাজ থাকে না, মজুরিও কোনো নির্দিষ্ট নাই, পেটের দায়ে এক গ্রাম হইতে অন্য জেলায় যাইয়া অনেক বর্ষা মৌসুমে কাজ করিতে হয়।--- আমাদের দেশের জমিদারি ব্যবস্থা এবং জমিদার, জোতদার ও চোরাকারবারীর স্বার্থে পরিচালিত বর্তমান সরকারই তাহাদের এই দুরবস্থার জন্য দায়ী। কাজেই নিজেরা নিজেদের বিরাট শক্তিকে সংগঠিত করিয়া বর্তমান ব্যবস্থা বিরোধে লড়াই করিলেই তাহাদের বাঁচার ব্যবস্থা হইবে, তা না হইলে দ্রুত মৃত্যুর দিকে যাইতে হইবে। ঢাকা জেলা কৃষক সমিতি জেলার ক্ষেত মজুরদের গ্রামে গ্রামে নিম্নলিখিত দাবির ভিত্তিতে নিজেদের নিজস্ব সমিতি গড়িয়া তুলিবার জন্য এবং জমিদারি ব্যবস্থার অবসান ঘটাইবার জন্য আহ্বান জানাইতেছে।--- অবিলম্বে ব্যাপকভাবে সভা, শোভাযাত্রা ও সমাবেশের ভিতর দিয়া ক্ষেত মজুরদের ন্যায্য দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। দাবি : ১। অবিলম্বে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করিতে হইবে এবং ---উদ্বৃত্ত জমি গরিব কৃষক ও ক্ষেত মজুরদের ভিতর বণ্টন করিতে হইবে। ২। ক্ষেত মজুরদের প্রতিদিনের মজুরী হিসাবে ৬ সের ধানের গড়মূল্য অথবা ঐ পরিমাণে ধান (মজুর যাহা লইতে চাহিবে তাহা) দিতে হইবে। ৩। প্রত্যেক পরিবারের ---প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জিনিষ সরকার হইতে সরবরাহ করিতে হইবে। ৪। তাহাদের সমস্ত রকম খাজনা ও ট্যাক্স হইতে রেহাই দিতে হইবে। ৫। সরকার ও নিয়োগকারীদের ক্ষেতমজুর সমিতিকে মানিয়া নিতে হইবে। ক্ষেতমজুর ভাইসব! এই ইস্তাহার হাতে পাওয়া মাত্র কাজ আরম্ভ করিয়া দিন আর অন্য কাহারও নির্দ্দেশের অপেক্ষায় বসিয়া থাকিবেন না। এখনই প্রথমতঃ নিজের গ্রামের সমস্ত ক্ষেতমজুর একত্র ডাকিয়া সভা করুন। ঐ সভায় বা মজলিশে ক্ষেত মজুর ব্যতীত আর কাহাকেও ডাকিবেন না, বা আসিতে দিবেন না; হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল ক্ষেতমজুর ঐ সভায় জমায়েত হইবেন।--- দ্বিতীয়তঃ ---এখনই ঐ সভা হইতে বাছা বাছা জঙ্গী কর্মীদের লইয়া কমিটি গঠন করিতে হইবে।--- তৃতীয়তঃ এই লড়াই কমিটির নির্দেশে সকলে একজোট হইয়া দাঁড়াইতে হইবে; সকলে মিলিয়া কাজ হরতাল প্রভৃতি করিয়া জোতদারদের দাবী মানিতে বাধ্য করিতে হইবে। আওয়াজ তুলুন-দুনিয়ার মজুর এক হও। লাঙ্গল যার জমি তার ক্ষেতমজুর সমিতি জিন্দাবাদ জমিদারি খতম কর: ইনক্লাব জিন্দাবাদ ঢাকা জেলা কৃষক সমিতি [চলবে]