দেশবিরোধী-অসম চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বাতিল কর

Posted: 03 মে, 2026

একতা প্রতিবেদক : যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত অসম বাণিজ্য চুক্তিসহ জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী সকল চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। গত ২৭ এপ্রিল সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল ও স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি পেশ করে এই দাবি জানায় তারা। একইসঙ্গে বৈদেশিক চুক্তি জনসম্মুখে প্রকাশ ও সংসদে উত্থাপন করে বাতিলের দাবিতে এবং ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা, ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যা ও সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন-যুদ্ধ বন্ধের জন্য সংসদে নিন্দা প্রস্তাবের দাবি জানিয়েছে তারা। মিছিলের আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জোটের নেতা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফি রতন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত এই অসম বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্যনীতি, কর-সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় ক্রয়নীতিকে মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দেওয়ার শামিল। এ ধরনের চুক্তির ফলে দেশীয় শিল্প ও কৃষিখাত ধ্বংস হবে, শ্রমিকের মজুরি ও অধিকার সংকুচিত হবে, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে এবং রাষ্ট্রের বিনিয়োগ-সিদ্ধান্তে বিদেশি কোম্পানির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পসহ রপ্তানিমুখী খাতগুলো মার্কিন বাজারে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বিদেশি কর্পোরেট সংস্থার কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তিনি সংসদের সকল দল ও সদস্যকে এই জাতীয় স্বার্থ-বিরোধী চুক্তি বাতিলের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এবং সংসদে আনুষ্ঠানিক নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের দাবি জানান। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন কেন্দ্রীয় পাঠচক্র ফোরামের সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মার্কসবাদী)-র সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাসদ (মাহবুব)-এর সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ ভূইয়া, গণমুক্তি ইউনিয়নের আহ্বায়ক নাসিরউদ্দীন নাসু, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, বাংলাদেশের সোশ্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম এবং সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী প্রমুখ। বক্তারা বলেন, এ চুক্তি গোপনে করা হয়েছে- জনগণ কিংবা সংসদকে অবহিত না করেই- যা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সরাসরি লঙ্ঘন। এছাড়াও এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। রাশিয়া-চীনসহ বিভিন্ন দেশের সাথে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে মার্কিন মুখাপেক্ষি হয়ে থাকতে হবে, মার্কিনীদের কাছ থেকে চড়া মূল্যে সামরিক সরঞ্জামাদি কিনতে হবে। এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার কথা বলা হচ্ছে যা বাড়তি মূল্যে যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। পরে প্রেস ক্লাব থেকে যাত্রা শুরু করে মিছিলটি শাহবাগ, কাওরানবাজার ও ফার্মগেট হয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সমবেত হয়। সংসদের ১২নং গেটের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রাগিব আহসান মুন্না, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, সাম্যবাদী আন্দোলনের বেলাল চৌধুরী এবং বাসদ-মার্কসবাদীর সীমা দত্ত। এরপর সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাসদ-(মার্কসবাদী)র সমন্বয়ক মাসুদ রানা এবং বাসদ (মাহবুব)-এর মহিন উদ্দিন চৌধুরী লিটনসহ পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি প্রদান করেন। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সরকার দলীয় চিফ হুইপের কাছেও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সংসদ ভবন থেকে বের হয়ে নেতৃবৃন্দ জানান, চলতি সংসদ অধিবেশনের মধ্যেই চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করে তা বাতিল করতে হবে। অন্যথায় আগামী ৩ মে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। ৪ ও ৫ মে বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতিনিধিসভা অনুষ্ঠিত হবে। আর ৯ মের মধ্যে চুক্তি বাতিল না হলে আরও বৃহত্তর ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে নেতৃবৃন্দ হুঁশিয়ারি দেন। এর আগে একই দাবিতে গত ২৬ এপ্রিল সকাল ১১টায় সেগুনবাগিচাস্হ রিপোর্টার্স ইউনিটি, প্রেসক্লাব ও হাইকোটে গণসংযোগ এবং লিফলেট বিলি করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন, সাজ্জাদ জহির চন্দন, বজলুর রশীদ ফিরোজ, নাজমুল হক প্রধান, ইকবাল কবির জাহিদ, বেলাল চৌধুরী, ডা. হারুনুর রশীদ, সৈয়দ হারুন অর রশীদ, নাসির উদ্দিন আহমেদ নাসু, মাসুদ রানা, মহিন উদ্দিন চৌধুরী লিটন, শম্পা বসু, মঞ্জুর আলম মিঠু, ওবায়দুল্লাহ মুসা, এডভোকেট প্রিন্স, সুস্মিতা মরিয়ম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। গণসংযোগের সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, বিদায় নেয়ার মাত্র ৩দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার আমেকিরার সাথে অসম বাণিজ্য চুক্তি করে দেশকে গোলামির শৃংখলে আবদ্ধ করেছে। এ চুক্তির প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। নেতৃবৃন্দ বলেন, স্বাক্ষর হলেও ৯০ দিন পর অর্থাৎ ৯ মে থেকে চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা। মালয়েশিয়া ইতিমধ্যেই চুক্তি বাতিল করেছে, ভারত স্থগিত করেছে। তাই এখনও সময় আছে চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই মালয়েশিয়ার মতো বিএনপি সরকারকে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে। পরদিন ২৫ এপ্রিল বিকাল ৫টায় পল্টন, বায়তুল মোকাররম, গুলিস্তান এলাকায় গণসংযোগে উপস্থিত ছিলেন, সাজ্জাদ জহির চন্দন, বজলুর রশীদ ফিরোজ, বেলাল চৌধুরী, নজরুল ইসলাম, সৈয়দ হারুনুর রশীদ, নিখিল দাস, মঞ্জুর আলম মিঠু, ডা. হারুনুর রশীদ, সাদিকুর রহমান শামীম, মনিরুজ্জামান, আনোয়ারুল ইসলাম, রায়হান উদ্দিন, সুস্মিতা মরিয়ম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। গণসংযোগের সময় পথসভায় নেতৃবৃন্দ বলেন, ইতিপূর্বে অন্তর্বর্তী সরকার চট্টগ্রামে লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ এবং পানগাঁও টার্মিনাল হ্যান্ডলিং এর জন্য বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দিয়েছে। লাভজনক নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। যা এখনও চলমান আছে। নেতৃবৃন্দ বলেন, অবিলম্বে লালদিয়া ও পানগাঁও ইজারা চুক্তি বাতিল এবং নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। আমেরিকা, ভারতসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশের সাথে স্বাধীনতাত্তোরকালে সম্পাদিত সকল চুক্তি জনসমুক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং জাতীয় স্বার্থ বিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করতে হবে। আমেরিকার সাথে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিসহ চট্টগ্রাম বন্দর, রামপাল, রূপপুর, আদানি ও টার্মিনাল সংক্রান্ত জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি ও প্রকল্পগুলো বাতিল করতে সরকারকে বাধ্য করতে সর্বাত্মক গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সকল বাম, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, সামাজিক, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যক্তি, গোষ্ঠীসহ সকল দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি আহ্বান জানান নেতৃবৃন্দ।