ইরানে বিপ্লবী সংগ্রামের ধারা

Posted: 12 এপ্রিল, 2026

ইরানে মার্ক্সবাদী বাম কমিউনিস্ট আন্দোলন-সংগঠন সাম্যের সমাজ নির্মাণ এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের যে শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠেছিল তার আছে দীর্ঘ ইতিহাস। ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের ধর্ম, সমাজ এবং রাজনীতি সাম্য, মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের সুগভীর পরিসর বিস্তৃত ছিলো। ব্রিটিশ এবং আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নির্বাসিত আয়াতুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ইরানে যে ইসলামি বিপ্লব সম্পন্ন হয় এবং বিপ্লব পরবর্তীকালে উগ্র ধর্মবাদীদের দ্বারা যেভাবে কমিউনিস্টদের হত্যা করা হয় তারও রয়েছে ইতিহাস। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সময়পর্বে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্থানীয় ক্ষমতাবান ধর্মীয় নেতাদের সহযোগিতায় শুরু হয় সংগঠিত ক্ষমতার পালাবদলের চক্রান্ত এবং সেই চক্রান্ত থেকেই উত্থান ঘটে স্বৈরশাসন এবং ধর্মীয় কট্টর পন্থা। তার আগে দেখা যাক মার্ক্সবাদের ভিত্তি গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক ভিত্তি। খ্রিস্টপূর্ব প্রাচীন পারস্যে জড়থুস্ট্রিয়ান ধর্মের বিকাশের পর্যায়ে মাসদাক নামে একজন পুরোহিত অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে সংস্কার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তা ইতিহাসে মাসদাকিজম বা “প্রথম কমিউনিস্ট সংগ্রাম” হিসেবে বিবেচিত হয়। একে আদি সমাজতন্ত্র বা প্রটো-সমাজতন্ত্র বলা হয়। এই সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে “ব্যক্তি সম্পত্তি বিলোপের” দাবি উঠে আসে। কথিত আছে যে, কার্ল মার্ক্স তাঁর লেখায় মাসদাকের কথা উল্লেখ করেছেন এবং প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের লাল পতাকাও মাসদাকের ব্যবহৃত লাল পতাকার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পরবর্তীতে মাসদাক এবং তার বহু অনুসারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকে ইসলাম ধর্ম বিকাশের পর্যায়ে চতুর্থ খলিফা হিসেবে হযরত আলীকে (রাঃ) অনেকে “প্রথম কমিউনিস্ট” হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। তিনি ইসলামকে কেবল মসলিম উম্মা হিসেবে না, বিশ্ব উম্মা হিসেবে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের উৎস বলে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি সম্পদের সুষম বষ্টন এবং সম্পদের ওপর সকলের অধিকার নিশ্চিত করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। ইরাকে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে সহিংসতার যে ইতিহাস তার কারণ মূলত এই যে, হযরত আলীর পুত্র হাসান-হোসেন হযরত মুয়াবীয়া এবং তাঁর সন্তান ইয়াজিদের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের কাছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাথা নত করেননি। আপস করেননি। পালিয়ে যাওয়া বা আপস করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে মৃত্যুকে বরণ করেছেন। যে কারণে অনেকে বলে থাকেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলমান, “কারবালা চলমান”। ১৯২০ সালের জুন মাসে ইরানের গিলান প্রদেশে ইরানের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশীয় শোষকদের বিরুদ্ধে, প্রায় পাঁচ বছর গেরিলা ট্রেইনিংয়ের পর, সোভিয়েত রেড আর্মির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক অফ গিলান। স্থানীয় সমাজতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা স্থায়ী ছিল প্রায় ১৫ মাস। ১৯৫৩ সালের পরে ইরানের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী ধর্মতাত্ত্বিক আলী শরিয়তি (১৯৩৩-১৯৭৭)। সাম্যবাদী চিন্তার ভিত্তিতে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের দেশীয় এজেন্ট শাহ পাহলভী পরিবারের স্বৈরশাসন এবং বিদেশে সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল মার্ক্সবাদীদের অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম। তিনি প্যারিসে জ্য পল সার্তের তত্ত্বাবধানে অস্তিত্ববাদের ওপর ডক্টরেট সম্পন্ন করেন। আলী শরিয়তির পিতা তাকি শরিয়তি ১৯৪৭ সালে ইরানের খোরাসান প্রদেশে স্বল্পকালীন স্থায়ী এক ধর্মাশ্রয়ী “খোদায়ী সমাজতন্ত্র” প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। রহস্যজনকভাবে ১৯৭৯ সালের অভ্যুত্থানের দুই বছর আগে ফ্রান্সে, ১৯৭৭ সালে এই মার্ক্সবাদী বিপ্লবী তাত্ত্বিকের মৃত্যু হয় । ইরানের ইতিহাসের এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে ইরানের জনমানসে দেশীয় শোষকের বিরুদ্ধে জুলুম, সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট আগ্রাসন এবং সাম্যের সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা ঐতিহাসিকভাবেই প্রোথিত আছে। ধর্মবাদীদের উত্থান, বিদেশি আগ্রাসন, মার্ক্সবাদী সংগ্রাম ইতিহাসের আলোকেই তা বিবেচনায় রাখা দরকার। ১৯৫১-৫৩ সালে ইরানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রিয় বামপন্থি জাতীয়তাবাদী নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় বসায় আমেরিকা এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা। মোসাদ্দেক ক্ষমতায় এসে সকল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ করেন। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এংলো পার্সিয়ান তেল কোম্পানি তখন ইরান থেকে তেল বিক্রির টাকায় তাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছ। মোসাদ্দেকের জাতীয়করণ নীতির বিরুদ্ধে এটি একটি “কমিউনিস্ট’ এবং সোভিয়েতপন্থি সরকার–একমাত্র এই অভিযোগ তুলে “অপারেশন এজাক্স” নামে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান গোয়ান্দা বাহিনীর সহযোগিতায় মোসাদ্দেক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। মোসাদ্দেক নিজে ব্যক্তিগতভাবে কমিউনিস্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী নেতা এবং কমিউনিস্ট সমর্থিত। কেবল তা-ই না, এই ষড়যন্ত্রমূলক ক্যু’র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারে যেসব কট্টর ইসলামিস্টদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তৎকালীন পার্লামেন্ট স্পিকার আয়াতুল্লাহ আবু রাশিম খাশানী। এই আয়াতুল্লাহ খাশানী ছিলেন খামেনির মেন্টর। ১৯৫৩ সালের এই ক্যু এবং সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে শুরু হয় ২৬ বছরের স্বৈরশাসন। তেল ক্ষেত্রগুলো তুলে দেয়া হয় ব্রিটিশদের হাতে। গড়ে ওঠে বিপি বা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। বিরোধী মত দমনের জন্য গড়ে তোলা হয় নিপীড়ক বাহিনী “সাভাক”। দেশীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতির সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠিত ধর্মবাদীদের ছাড় দেয়া হলেও বামপন্থিদের ওপর নিপীড়ন চালান হয়। মোসাদ্দেককে উৎখাতের সময় এবং পরবর্তীতে ক্ষমতার স্বার্থে সেসব ধর্মবাদীদের সহায়তা নেয়া হয়েছিল, তারা সংগঠিত হতে থাকে শাহের এই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। সারাদেশে প্রতিবাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদী খামেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ইরানে গণতন্ত্রকে হত্যা করে কট্টর ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠায় সরাসরি ভূমিকা ছিল আমেরিকা এবং ব্রিটেনের। ১৯৫৩ সালে পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার স্বার্থে “রেজিম চেঞ্জের” ঘোষণা দিয়ে, অগণতান্ত্রিকভাবে গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদের মাধ্যমে ইউরোপ আমেরিকার স্বার্থে, যে ‘পাহলভী ডাইনেস্টিকে’ ক্ষমতায় বসান হয় সেই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে রচিত সংগ্রামের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় ইরানের কট্টর ধর্মবাদী শাসনব্যবস্থা। এখন আবার সেই “রেজিম চেঞ্জের” নামে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় পর্যুদস্ত ইরান এবং ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এক অন্যায় অবিচারমূলক যুদ্ধ। কেবল সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ, হত্যা আর ধ্বংস দিয়ে এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় বোঝা যাবে না। ইরানের জনগণ কিভাবে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া বর্তমান যুদ্ধ মোকাবিলা করবেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবেন তা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে সেটি যেরকমই হোক না কেন, ইরানের জাগ্রত জনগণের সাথে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর কমিটমেন্ট এবং সাম্য-অভিমুখীন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের ধারাবাহিক সংগ্রামের অভিঘাত থেকে যুদ্ধ থামবে না। লেখক : জর্জিয়া প্রবাসী