কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় অনুমোদিত ‘নির্বাচন পর্যালোচনা’ ও ‘রিপোর্ট’ থেকে উদ্ধৃতি
Posted: 12 এপ্রিল, 2026
সিপিবির ৩-৪ এপ্রিল ২০২৬-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ত্রয়োদশ কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের আলোকে পার্টির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে এক তাৎপর্যপূর্ণ উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে যৌথ সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত দায়িত্ব, চেকআপ, কাজের সমন্বয়, তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয়, ‘নিবিড় আবাদের’ কায়দায় ‘ম্যান টু ম্যান সংযোগের’ পদ্ধতিতে কাজ ও রিক্রুটমেন্ট, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বর্ধিত ব্যবহার, ক্যাডারদের সংখ্যা ও তাদের দক্ষতা উন্নত করা–ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সভায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। একইসাথে কংগ্রেসের গৃহীত সাধারণ রাজনৈতিক লাইনের আলোকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্তব্য পালনে পার্টির সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কেন্দ্রীয় কমিটির এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় অনুমোদিত ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পর্যালোচনা’ ও ‘রিপোটর্’ এই দুটি দলিলে এসব সিদ্ধান্তের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। পার্টি কর্তৃক নির্ধারিত কর্তব্য বুঝে নিতে সহায়ক হবে মনে করে এই দুটি দলিল থেকে কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হচ্ছে।
॥ ১ ॥
“ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমিতে আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল দেশি-বিদেশি নানান গভীর ষড়যন্ত্র। ---
“উগ্র ডানপন্থী ও চরম সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট মহলের নির্বাচন বানচালের এই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার কর্তব্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে পার্টি শুরু থেকেই অবাধ নিরপেক্ষ পরিবেশে ও সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি করে আসছিলো। নির্বাচন বানচালের প্রবল শক্তিধর এই ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে পারাটি সেক্ষেত্রে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক বিজয়।
॥ ২ ॥
“২৬’এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন রাষ্ট্রীয় ও সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তির মদতে চরম দক্ষিণপন্থী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক অভূতপূর্ব উল্লম্ফন প্রচেষ্টার পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। --- এই বিপজ্জনক শক্তির উত্থান মোকাবিলার ক্ষেত্রে দেশের বামপন্থীরা যে পর্যাপ্ত শক্তি সম্পন্ন ও স্বক্ষম– এমনটি জনগণ মনে করেনি। এমতাবস্থায় নানা প্রকারে শক্তিশালী হয়ে ওঠা স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক, আলবদর-রাজাকারের প্রেতাত্মা শক্তির বিপদজনক আঘাত থেকে আশু পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য দেশবাসী ‘মন্দের ভালো’ বিবেচনায় মাঝামাঝি রাজনৈতিক শক্তি বলে গণ্য- বিএনপির দিকে ঝুঁকেছে। ---
“আমাদের পার্টি ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, তথা দেশের বামপন্থী দলগুলো তাদের ভোট তেমন বাড়াতে পারে নাই। তাদের ভোটের পরিমাণ বলতে গেলে আগের প্রান্তস্থিত অবস্থায়ই থেকে গেছে। ---
“সেপ্টেম্বর মাসের শেষার্ধে পার্টির ত্রয়োদশ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। --- ২৯ নভেম্বর জাতীয় রাজনৈতিক কনভেনশন করে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। যুক্তফ্রন্টের আগে গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা চলে আসে। এভাবে, কার্যতঃ প্রস্তুতিহীন অবস্থায় নির্বাচনী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। বামপন্থীদের ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ‘প্রত্যাশার বিপর্যয়ের’ কারণের এটি হলো একটি দিক। ---
“এছাড়াও নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ছিল ঢিলেঢালা ভাব। প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টি মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর একান্ত নিজের সিদ্ধান্তের বিষয় করে তোলা হয়েছিল। জোটের শরিক দলগুলোর প্রার্থী সংখ্যা ছিলো ১৫০-এরও অনেক কম। ফলে বিকল্প হিসেবে জনগণের স্বীকৃতি লাভ বড় রকম প্রশ্নের মুখে পড়ে। ---
“এদিকে, এবারের নির্বাচনে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রার্থীরা বরাবরের মতো বেসুমার টাকা ব্যয় করে চমক লাগানো প্রচারণা দ্বারা মোহিত করতে চেষ্টা করেছে। জামাত তার বিপুল অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি ‘বেহেশতের প্রবেশপত্র’ প্রদানের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মপ্রাণ জনগণের মন জয় করতে সচেষ্ট হয়েছে।
॥ ৩ ॥
“আমাদের পার্টি ও যুক্তফ্রন্টের ঘোষিত মেসেজটি---জনগণের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয় নাই। কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। নির্বাচনী ব্যবস্থায় অর্থ শক্তির ব্যবহার, পেশি শক্তির প্রয়োগ, প্রশাসনিক কারসাজি, সূক্ষ্ম জালিয়াতি ইত্যাদি থেকে এবারের নির্বাচন মুক্ত ছিল না। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার পরিবেশ রচনা, জনতুষ্টিবাদী মায়াজালের বিস্তৃতি প্রভৃতিকে মোকাবিলা করে পার্টি ও বামপন্থীরা দেশের মানুষের কাছে একটি জাতীয় রাজনৈতিক শক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি।
“জনগণের সামনে একটি ‘মিশনের’ বার্তা নিয়ে হাজির হতে পারার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করার ক্ষেত্রে অন্যান্য দলগুলির মধ্যে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এমনকি, জোটের কোনো কোনো শরিকদল ঐক্যের প্রয়োজনীয়তাকে গৌণ করে নিজ দলীয় স্বার্থের ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে একদিকে যেমন কিনা সব নির্বাচনী এলাকাতে যুক্তফ্রন্টগতভাবে প্রার্থী নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নাই, তেমনি বিকল্প সরকার করতে হলে ন্যূনতম যে ১৫১টি আসনে জয়যুক্ত হওয়া দরকার, সে সংখ্যক আসনে প্রার্থী দেয়া যায়নি।”
॥ ৪ ॥
“--- দেড় মাসেই বিএনপি সরকারের শ্রেণি চরিত্র ও প্রকৃত চেহারা জনগণের সামনে উন্মোচিত হতে শুরু করেছে।--- লুটেরা ধনিকশ্রেণির সরকার সাময়িক জনতুষ্টকারী যত কর্মসূচি গ্রহণ করুক না কেন তার প্রকৃত জনবিরোধী স্বরূপ শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ পেতে বাধ্য। তাই, রাজপথে লড়াইয়ের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি ও তার রাজনৈতিক সহযোগিদের সর্বাত্মক প্রস্তুত থাকতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতির একটি অভিনবত্ব হচ্ছে ইতোপূর্বে ক্ষমতাসীন দলকে আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করে আমাদেরকে লড়াই করতে হয়েছে। একই শ্রেণির দল হওয়া স্বত্ত্বেও প্রধান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কখনই আমাদেরকে মূল আঘাত শাণিত করতে হয়নি। এবারই প্রধান সংসদীয় বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে এমন একটি শক্তি যারা স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র সাম্প্রদায়িক, ধর্ম-ব্যবসায়ী, মতান্ধ, ফ্যাসিস্ট ভাবধারাসম্পন্ন ও পশ্চাদপদ মধ্যযুগীয় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রবর্তন প্রয়াসী। ফলে এবার, সরকারি দলের পাশাপাশি চরম প্রতিক্রিয়াশীল এই বিরোধী দলের বিরুদ্ধে আমাদেরকে আরও জোরের সাথে লড়াই চালাতে হবে। একইসাথে, তৃতীয় আরেকটি শক্তি–‘পতিত আওয়ামী স্বৈরাচারের’ বিরুদ্ধেও আমাদেরকে লড়তে হবে। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধকে ব্যক্তি, পরিবার, দলীয়করণ, ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির কাজে ব্যবহার প্রভৃতি উদ্দেশ্যে মিথ্যা-বয়ান নিয়ে পুনরায় অবস্থান নিতে চাইলে তাকেও আমাদের রুখতে হবে। ---”
॥ ৫ ॥
“--- রাজনৈতিক-সাংগঠনিক-আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়ে আমরা এখনই তিন মাসের একটা অন্তর্বর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কাজে নেমে পড়বো। এ পরিকল্পনার সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে আমরা দুইভাগে পরবর্তী সোয়া তিন বছরের জন্য একটি বৃহত্তর কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করব। তার প্রথম অংশ আমাদের ৮০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী ২০২৮ সালের ৬ মার্চের মধ্যে। আর, দ্বিতীয় অংশ আমরা সমাপ্ত করবো পার্টির পরবর্তী চতুর্দশ কংগ্রেসের ঘোষিত তারিখের মধ্যে। এসময়ে ত্রয়োদশ কংগ্রেসের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্টিকে ঘোষিত গুণে, মানে, সংখ্যায়, শৃংখলায় উত্তীর্ণ করার লক্ষ্য নিয়ে আমাদের সকলকে প্রয়োজনে বাড়তি পরিশ্রম করে হলেও পার্টির কাজ পরিচালনা করতে হবে।
॥ ৬ ॥
মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোটের সভায় আলোচনা স্থির হয়েছে যে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে সংগঠিত আন্দোলনের পিস্টন বা কোর শক্তি হিসাবে বাম গণতান্ত্রিক জোটকে কাজ করতে হবে। যে সকল কর্মসূচি গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে করা সম্ভব হবে না, তা বাম গণতান্ত্রিক জোটের মাধ্যমে করা হবে।
॥ ৭ ॥
আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের প্রতিটি শাখা, প্রতিটি সদস্যকে সক্রিয় করা। পার্টিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। পার্টির অভ্যন্তরে যে কোন উপদলীয় কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। গণসংগঠনসমূহের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিবছর প্রতিটি শাখায় শাখা সদস্যের সমপরিমাণ নতুন গ্রুপ সদস্য যুক্ত করা। আগামী সাড়ে তিন বছরে এক লাখ সহযোগী সদস্য পার্টির সাথে যুক্ত করা। প্রতিটি সদস্যকে তাদের বর্তমান মান অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা। সর্বোপরি আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ পার্টিকে ‘ক্ষমতা অর্জনে’র যোগ্য করে তোলা।