বলুহর বাঁওড়সহ দেশের কোটি জেলের কী হবে?

Posted: 05 এপ্রিল, 2026

নদী-নালা-খাল-বিল-বাঁওর-খাস জলাশয়বেষ্টিত দেশের দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং পর্যটন ও অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনাময় বাঁওড় জলাভূমির রাজধানী ঝিনাইদহ জেলা। এ অঞ্চল মানচিত্রে দেশের সীমান্তবর্তী এক জেলা। বর্তমানে খুলনা বিভাগে অবস্থিত ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পূর্বে ৩০ কিলোমিটার দূরে কোটচাঁদপুর উপজেলার ৪নং বলুহর ইউনিয়নের বলুহর বাঁওড়টি প্রায় হেক্টর বা প্রায় ৬৯৬ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি অন্যতম বড় জলমহাল। এটি জেলার অন্যতম প্রধান মৎস্য উৎপাদনকারী বাঁওড় হিসেবে পরিচিত এবং এর আয়তন ও উৎপাদন ক্ষমতা বিশাল। পরিচালিত গবেষণা অনুসারে বলুহর বাঁওড়কে সবচেয়ে বড় বাঁওড় ও পর্যটন শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা শহর থেকে প্রত্যন্ত কোটচাঁদপুর উপজেলাস্থ বৃহত্তম বলুহর বাঁওড়সহ ঝিনাইদহ-যশোরের ৬টি বাঁওড় থেকে ৫০ হাজার জেলে পরিবার ইজারাদার পদ্ধতির উচ্ছেদ হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইজারা প্রথায় সারাদেশে হাওর-বাঁওড়-বিল-খাস জলাশয়ের মতো জলমহাল থেকে দুই কোটি জেলে পেশা হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বলুহর বাঁওড়ের প্রবীণ জেলে বাসুদেব বিশ্বাস বলেন, ‘সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাঁওড় ও খাস জলাশয়ে ইজারা বাতিলের দাবিনামা মেনে নিতে হবে। ‘জাল যার, জলা তার’ নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে ‘ইজারা যার, জলমহাল তার’ এবং আরো নির্মম বাস্তবতা ‘টাকা যার, বাঁওড় ইজারা তার’।’ ইজারার কবলে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বলুহর, জয়দিয়া, মহেশপুরের কাঠগড়া, ফতেপুর, কালীগঞ্জের মর্জাদ ও যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুরসহ ৬টি বাঁওড়ের বঞ্চনার শিকার ৫০ হাজার জেলে পরিবারের সাথে সারাদেশে কোটি জেলে জনগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে ইজারা পদ্ধতি বাতিল চেয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম বলুহর বাঁওড়সহ সারাদেশে জলমহালে সামাজিক মালিকানার দাবিতে আন্দোলনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলে। জলাভূমিতে জেলেদের যৌক্তিক দাবিসমূহ সর্বমহলের সমর্থন লাভ করে। জাতীয় তথ্যবাতায়নে উল্লেখিত, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাঁওড় জনপদের অধিবাসী ও প্রান্তিক মৎস্যজীবী সম্প্রদায় প্রাচীন জনবসতি কাল থেকে বংশানুক্রমে ঝিনাইদহ-যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন বাঁওড় সংলগ্ন গ্রামগুলোতে বসবাস, বাঁওড়ে মাছধরা ও বিপণন হল পেশাগত পরিচয়। নদীর বাঁকে অবরুদ্ধ স্রোত ও নিম্নভূমিতে জমে থাকা পানিতে প্রাকৃতিকভাবে বাঁওড়ের সৃষ্টি হয়েছে। নদীর পরিত্যক্ত বাহু বা অশ্বক্ষুরাকৃতির হৃদ হিসেবে বাংলাপিডিয়া বাঁওড় এর সংজ্ঞায়ন করেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ঝিনাইদহ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে অধিক সংখ্যায় বাঁওড়ের সন্ধান পাওয়া যায়। বাঁওড় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য-উপাত্ত সংগৃহিত ও সংরক্ষিত নেই। অতীতে এর পরিমাণ আরো বেশি থাকলেও প্রভাবশালীদের দখল, ভরাট ও দূষণে কিছু কিছু বাঁওড় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে বাঁওড় অঞ্চল ঘুরে প্রকৃতপক্ষে বাঁওড় ও জলমহালের সংখ্যা ও সংরক্ষিত তথ্যের থেকেও অনেক বেশি হিসাব মিলেছে। আশির দশকে ঝিনাইদহ জেলার পাঁচটি ও যশোর জেলার একটি বাঁওড় নিয়ে বাঁওড় মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প নামে মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাঁওড়গুলো ছিল ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর ও জয়দিয়া, মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া ও ফতেপুর, কালীগঞ্জ উপজেলার মর্জাদ এবং যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর। এ প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বলুহর রেনু উৎপাদনকারী কেন্দ্রীয় মৎস্য হ্যাচারি। বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রির পাশাপাশি হ্যাচারির রেনু সরকারি এসব বাঁওড়েও ছাড়া হত। প্রকল্পের অধীনে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মাছ চাষে এক হাজার জেলে পরিবারের ৫ হাজার সদস্য নিয়োজিত হয়ে জীবিকা চালিয়েছে। প্রতিবছর এসব বাঁওড় থেকে প্রায় ৫’শ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হত। উৎপাদনের অংশীদারত্ব চুক্তি অনুযায়ী মৎস্য বিভাগের অর্থায়নে জেলেরা শ্রম দিত। বিনিময়ে উৎপাদিত মাছের ৪০ শতাংশের মালিকানা জেলেদের অধিকারে যেত, বাকি ৬০ শতাংশ মৎস্য অধিদপ্তর পেত। এই প্রকল্পের তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল যে, এটি মাছের বেড়ে ওঠার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করেই মাছ চাষ করত। যার ফলে কৃত্রিমভাবে রেনু ছাড়াও বিপুল পরিমাণ দেশি জাতের প্রাকৃতিক মাছ উৎপাদিত হত এবং এই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের নিরঙ্কুশ মালিকানা থাকত অংশগ্রহণকারী জেলেদের। প্রকল্পের ত্রিশ বছর পূর্তির পর ২০২২ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় বাঁওড়গুলোকে মৎস্য অধিদপ্তর থেকে নিয়ে দরপত্রের মাধ্যমে ইজারার ব্যবস্থা করেছে। বিগত সময়ে মৎস্য অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে বাঁওড় ব্যবস্থাপনাও দুর্নীতিমুক্ত ছিলনা বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকৃত মৎস্যজীবীদের এসব বাঁওড় ইজারা নেয়ার সামর্থ্য নেই। এ সুযোগে মৎস্যজীবীদের নামে ভুঁইফোড় সমবায় সমিতি-সংগঠন তৈরি করে তার নামে প্রকৃতপক্ষে ইজারা নিয়ে আসছে স্থানীয় স্বার্থবাদী মহল। তাদের বাণিজ্যিক মৎস্য চাষের পরিকল্পনায় উচ্ছেদ হয়ে গেছেন প্রকৃত জেলেরা। বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের উপযোগি করতে বাঁওড়ের জলজ উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক মাছ, কাঁকড়াসহ জলজ প্রাণিকুলকেও ক্যামিক্যাল প্রয়োগে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। ফলাফলে বাস্তুতন্ত্র ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এদিকে উচ্ছেদ হওয়া অসহায় জেলেরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দপ্তরে ধর্ণা দিয়েছে, আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেছে, সুবিধাভোগীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে; কিন্তু অধিকার পায়নি। এরপর কেউ দেশ ছেড়েছেন, বাকিরা পেশা বদলের চেষ্টা করছেন, অভাব-অনটনে বিনা চিকিৎসায় অকাল মৃত্যু হয়েছে, অনেকে নিঃস্ব হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। জমিজমাহীন ভূমিহীন জেলেরা মাছ উৎপাদন ব্যতীত ভিন্নধর্মী কাজে অদক্ষ এবং নিরুপায় হওয়ায় ক্ষেতে-খামারে মজুর দিতে গেলেও উপযুক্ত মজুরি পান না। এভাবে বঞ্চনার বোঝা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। প্রভাবশালীদের দখলদারত্বে বাঁওড় থেকে উচ্ছেদ হয়ে গেছে ভূমিপুত্র জেলে জনগোষ্ঠী। ২০২২ খ্রিস্টাব্দে বঞ্চনার শিকার প্রবেশাধিকার হারিয়েছেন বাঁওড়সহ জলমহালে, দৈনন্দিন কাজ, কৃষিকাজে পানিসেচের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যায়ভাবে ইজারাদাররা বাঁওড়ে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন। মৎস্যজীবী জেলে নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর ও যুবকেরা এ বঞ্চনায় ফুঁসে ওঠে। বর্ণিত বাঁওড় ছাড়াও অন্যান্য সকল বাঁওড় ও জলমহালের হাজারো মানুষ বিগত সরকারের আমলে বাঁওড় ও খাস জলাশয়ে প্রথাগত মালিকানা হারিয়ে পথে বসেছে। ইজারাপ্রথা চালু থেকে বঞ্চনার ফলে ভূমিহীন, বেকার ও নিঃস্ব হয়ে গেছে বাঁওড় জেলে নরনারীগণ। ঝিনাইদহ জর্জ আদালতের সিনিয়র বিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাড. শামসুজ্জামান খোকন বলেন, ‘ইজারাপ্রথায় সাধারণ মৎস্যজীবীরা টিকতে পারছে না। ইজারা মানেই টাকা লগ্নির ব্যাপার। বাঁওড়ের মালিকানা জেলেদের, জেলেদের আজন্ম অধিকার, তাই এই জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নকে নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এখানে জেলেদের মালিকানার স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা, রাষ্ট্রের অর্থায়নে মৎস্য চাষ পরিচালনা, জেলে সম্প্রদায় ও রাষ্ট্র কর্তৃক উৎপাদনের অংশীদারত্বের চুক্তি অনুযায়ী উৎপাদনের ন্যায্য বণ্টননীতি থাকা চাই। আর এগুলোর সাথে অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।’ উপজেলা ও জেলা পর্যায় বিভিন্ন দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় শেষে ২৮ মে ২০২৩ সালে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে হাজার হাজার জেলে নারী-পুরুষের প্রতিনিধিরা বিক্ষোভ সমাবেশ-মিছিল থেকে স্মারকলিপি দেয় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সমীপে। সরকারের তরফ থেকে বাঁওড় মৎস্যজীবীদের নিয়ে ভাবনা আছে বলে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ির ছড়ানো হয়েছিল। বাস্তবে জেলেদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। ১২ মার্চ ২০২৫ তারিখে আবার দলবেঁধে সারাদেশের জেলে প্রতিনিধিরা ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবরে বাঁওড়সহ জলমহালে প্রথাগত সমাজিক সমবায় মালিকানার ৪ দফা দাবিতে স্মারকলিপি পেশ, ধর্না ও বৈঠকে মিলিত হয়। বাঁওড় জলমহালসমূহের ইজারা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে জেলেদের ন্যায়সঙ্গত মালিকানার স্বীকৃতি দিয়ে সমাজভিত্তিক সমবায় মালিকানা নিশ্চিত করার জোরদার দাবি পুনর্ব্যক্ত করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে বাঁওড় পরিদর্শন ও সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। ২৭ মে ২০২৫ কোটচাঁদপুরে বলুহর বাঁওড়ে সরেজমিনে মৎস্য উপদেষ্টার আগমন ঘটে। কোটচাঁদপুর উপজেলা মিলনায়তনে জেলেদের মতবিনিময় সভায় প্রকাশ্য উল্লেখিত দাবিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের ঘোষণা করেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৪’র ৫ আগস্টে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এ বিষয়ে সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নানাবিধ সম্পদ সম্ভারে পরিপূর্ণ জলমহালের খোদ প্রথাগত মালিকানার অধিকারী জেলে জনজীবনের বঞ্চনার কথা অগোচরেই থেকে যায়। দেশের মোট পানি, মৎস্য, জলজ, জীববৈচিত্র্য, প্রাণ, পরিবেশ, প্রতিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বাঁওড় ঘিরে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, শিল্প ও অর্থনীতি সম্পর্কিত। সমগ্র দেশে জলসম্পদের বৃহৎ অংশের মধ্যে বাঁওড়গুলো অন্যতম হলেও প্রান্তিকতায় অনালোচিত থাকায় রাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় খাসখতিয়ানভুক্ত জলমহাল নিয়ে নানা অব্যবস্থাপনায় সরকার হারাচ্ছে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও পর্যাপ্ত রাজস্ব। সারাদেশে ছোট-বড় অনেকগুলো বাঁওড় ঘিরে বংশপরম্পরায় জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করছে। হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট ও জেলা তথ্যবাতায়নে যশোরে ১০টি ও ঝিনাইদহে ২২টি বাঁওড় উল্লেখ থাকলেও অনুসন্ধান ও সরেজমিনে অধিকসংখ্যক বাঁওড় অস্তিত্ব রয়েছে। সরকারি নথিপত্রে অসংখ্য বিল-বাঁওড় ও খাস জলাশয়ের হদিশ নেই। ৫ হাজার জেলের ৫০ হাজার হাজার পরিবার শুধুমাত্র ঝিনাইদহের ৫টি ও যশোরের ১টি বাঁওড়ে ইজারার অভিঘাতে বেকার জীবনে নিঃস্ব হয়ে গেছে। ইজারা কুফলে বাঁওড়সহ দেশের সকল জলমহালে জেলেপল্লীর মানুষগুলো জীবিকা থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। জেলেপল্লীতে অসহায়গুলো দূরাবস্থা ও কান্না আহাজারিতে শোকের নীরবতা নেমে আসে। বাংলাদেশ বাঁওড় মৎস্যজীবী আন্দোলনের আহ্বায়ক নির্মল হালদার বলেন, বাঁওড়সহ সকল জলমহালে স্থায়ী সমাধানের লক্ষে সারাদেশে কয়টি বাঁওড় ও জলমহাল আছে, তা তালিকায় নথিভুক্তিকরণ, বিশেষ করে বাঁওড় পাড়ের আদিবাসিন্দা জেলে সম্প্রদায়ের মাছ ধরার অধিকার সংরক্ষণ, বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবী জেলে সনাক্তকরণ, বাঁওড় জেলে-মজুর-ভূমিহীনদের সামাজিক সমবায় মালিকানার সদস্য অন্তর্ভুক্তকরণ, ইজারা বাতিল করে সামাজিক মালিকানায় পরিচালনে পৃথক জলমহাল নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবিতে জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্যের দিন বদলে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশ্বাসে নতুন বাংলাদেশে বাঁওড়সহ জলমহালগুলো জেলেদের অনুকূলে ফেরাতে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার সাথে আন্তরিকতাপূর্ণ উদ্যোগের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে সংকট নিরসন করা সম্ভব। সরকারের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের আশায় চেয়ে জেলেদের দিনগোনার অবসান ঘটবে বলে আমরা আশাবাদী।’ জয়দিয়া বাঁওড়ের জেলে শীতল হালদার বলেছেন, ‘দেশের বৃহত্তম জলমহালগুলোর অন্যতম ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বলুহর, জয়দিয়া, মহেশপুরের কাঠগড়া, ফতেপুর, কালীগঞ্জের মর্জাদ ও যশোরের চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুরসহ দেশব্যাপী সকল হাওড়-বাঁওড়-বিল-খাস জলাশয় ও জলমহালে ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে প্রথাগত ও ন্যায়সঙ্গত সমাজভিত্তিক সমবায় মালিকানা নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন, উৎপাদনের অংশীদারিত্ব চুক্তি, রেশন, পেনশন, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও যৌথ তদারকির দাবি মেনে নিতে সরকারের অবশ্যই সদয় হওয়া উচিত।’ ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের বলুহর বাঁওড়সহ সারাদেশের জেলেরা তাদের মাছ ধরার অধিকার, জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি লঙ্ঘন এবং প্রভাবশালী মহলের দখলের প্রতিবাদে ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য দফায়-দফায় উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও মৎস্য মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারক লিপি পেশ ও খোলা চিঠি প্রদান করা হয়েছে। বাঁওড়পাড় থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জে, শহর, উপজেলা, জেলা ও রাজধানীতে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনে বঞ্চিত জেলেরা বারংবার সমবেত হয়েছে। বাঁওড় ও জলমহাল ইজারায় স্থানীয় ভূমিহীন জেলেরা বঞ্চিত হওয়ায় তারা জলমহাল ইজারা সংক্রান্ত বিবাদ: বলুহরসহ ৬টি বাওড় ব্যবস্থাপনায় সরকারি নীতি লঙ্ঘন এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবিকা হারানোর ঝুঁকি, বাঁওড় বা জলমহালগুলো থেকে স্থানীয় প্রকৃত জেলে সম্প্রদায়কে উচ্ছেদের পায়তারা চলায় কর্মসংস্থান হারিয়ে পথে বসে পড়েছেন। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ, স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রতিকার না পেয়ে তারা রাজধানী ঢাকায় এসে জাতীয় পর্যায়ে সমস্যাটি তুলে ধরার চেষ্টা করেও কোন মিমাংসা ঘটেনি। কাঠগড়া বাঁওড় জেলে সাধন বসু বলেন, ‘প্রকৃত মৎস্যজীবীদের বাদ দিয়ে অবৈধভাবে হাওর-বাঁওড়-জলমহাল ইজারা দেওয়ার বিরোধিতার কথা বলে মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা নিতে তৎপর দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। জলমহাল ইজারা পদ্ধতিগতভাবেই অবৈধ। ইজারা হল শোষণমূলক ব্যবস্থা। ইজারা প্রথার বিরুদ্ধে মৎস্যজীবীরা জেলেরা চায় প্রথাগত সামাজিক মালিকানার গ্যারান্টি।’ বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সভাপতি কাজী ফারুক বলেছেন, ‘জলমহালে ইজারা নীতি চলমান থাকায় জেলে জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঝিনাইদহসহ সারাদেশে হাওর-বাঁওড়-খাস জলাশয়গুলোতে হারাচ্ছে মৎস্য উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য। ‘জাল যার, জলা তার’ রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নেই জেলে-মাঝিদের সংকট নিরসন নিহিত রয়েছে।’ এ বিষয়ে কালীগঞ্জ সরকারি মাহতাবউদ্দিন মাহতাবউদ্দিন ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক দীপক অধিকারী বলেন, ‘ঝিনাইদহ-যশোরে শুধু ইজারা পদ্ধতি বাতিল ও প্রথাগত সামাজিক মালিকানার সিদ্ধান্তে বদলে যাবে ৫০ হাজার জেলে পরিবারের ভাগ্য আর সরাদেশে বৃহত্তর পরিসরে দুই কোটি জেলের পেশাজীবন ফিরে পাবে।’ বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের জেলে নারী সাধনা হালদার বলেন, ‘প্রকৃতির জলাধার, মানবনা টেন্ডার’ ‘টাকা যার, জলমহাল ইজারা তার’, ‘টাকা যার, বাঁওড় তার’ এই ফ্যাসিবাদী নীতি আমরা মানি না। মৎস্যজীবী জেলেরা কোনরূপ ইজারা চায় না। বাঁওড়সহ জলমহাল অবিলম্বে ইজারা পদ্ধতি বাতিল করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ জলমহালসমূহের ইজারা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে জেলেদের ন্যায়সঙ্গত মালিকানার স্বীকৃতি দিয়ে প্রথাগত সামাজিক সমবায় মালিকানা নিশ্চিত করার দাবিতে বাঁওড় আন্দোলনের সংগঠক আবু তোয়াব অপু বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ভোটারদের বাঁওড় অঞ্চলের প্রার্থীরা ইজারা বাতিল করে সামাজিক মালিকানার দাবি জন্য জেলেদের সমর্থন করেছেন। সরকার ও সকল বিরোধী দল উভয়ই তখন ইজারার বিলোপ চেয়ে জেলেদের অনুকূলে জলমহালের অধিকারকে বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে মৎস্যজীবীদের জীবিকা নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে যৌথ উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি ও জাতীয় স্বার্থে জলমহাল নীতিমালা, আইন ও বিধি প্রণয়ণ ও রেশন, পেনশন দিতে হবে। বর্তমানের সরকারের উচিত অতিদ্রুত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করা। জেলেদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবি বাস্তবায়নে বর্তমানের সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নয়া সরকারের জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে ইজারা পদ্ধতি বাতিল ও সামাজিক মালিকানার নীতিতে জলমহাল পরিচালনায় কোন সুরাহা না হওয়ার ঘটনায় ভুক্তভোগী জেলেদের আবারও আশাভঙ্গ ও হতাশ করছে।’ লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, ক্ষেতমজুর সমিতি