বেশি দামেই কিনতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস

Posted: 01 মার্চ, 2026

একতা প্রতিবেদক : উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারসহ নানান পদক্ষেপেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার। সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও মিলছে না সিলিন্ডার। ভোক্তাদের অভিযোগ, খুচরা পর্যায়ে বিক্রেতারা পরিবহন খরচ, ডিলার কমিশন ও সরবরাহ সংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি টাকা গুনেই এলপিজি কিনতে হচ্ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে চাপে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১২ কেজি সিলিন্ডারে ১৫ টাকা দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। নতুন আদেশে খুচরা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্য এখন ১ হাজার ৩৪১ টাকা। কিন্তু ভোক্তাদের সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ১৮০০-১৯০০ টাকায়। রাজধানীর পল্টনের এক বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকুরিজীবী আব্দুর রহমান বলেন, “সিলিন্ডার সরকারি দামে কিনতে পারি না। এই মাসেও ১৯শ টাকা দিয়ে কিনেছি। এমনিতেই জিনিসপত্রের দাম বেশি। মধ্যবিত্তের সংসারে আমরা এক-দুইশ টাকাও হিসাব করে খরচ করি। তার ওপর গ্যাসের জন্য প্রতি মাসেই বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে।” লালবাগের বাসিন্দা ফাতেমা আক্তার বলেন, “শুধু শুনি যে সরকার দাম কমাইছে। কিন্তু বাজারে কিনতে গেলে তো পাই না। এবারও ১৮শ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি। কোথাও কম দামে পাইলাম না।” এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আন্তর্জাতিক বাজারদর সমন্বয় করে সরকার নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করা হয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই দর কার্যকর হচ্ছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি নেওয়া হলে নজরদারি কোথায়-এই প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তারা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তার প্রভাব স্থায়ী নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রেতারা বলছেন, তাদের কেনা পড়ে বেশি টাকায়। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করবেন কীভাবে? এজন্য সরকারি দামে বিক্রি করতে পারি না। বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। সেখান থেকে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা অধিদপ্তরকেও জানিয়েছি। সবাই কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি এসেছে। এ মাসের আরও তো কিছুটা সময় বাকি আছে। একটু ধৈর্য ধরেন, আশা করি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’ তবে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা প্রফেসর ড. শামসুল আলম বলেন, ‘বিইআরসি ঘরে বসে দাম নির্ধারণ করে। দাম নির্ধারণের জন্য গণশুনানি হওয়ার কথা। সেখানে ব্যবসায়ীদের থাকার কথা। কিন্তু কোনোটিই হয় না। এজন্য বিইআরসি যে দাম নির্ধারণ করে ব্যবসায়ীরা তা মানে না। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বিইআরসির ধার্য করা দাম না মানলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা এমনকি লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে বিইআরসি সেটিও করে না।’ দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। বাজারটি পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫২টি। এর মধ্যে ৩২টি কোম্পানির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের। তবে গত বছর কোনো না কোনো মাসে আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। নিয়মিত আমদানি করেছে মাত্র ৮টি। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত বছরের শুরুতে কয়েকটি কোম্পানি আমদানি করলেও শেষ দিকে অনেকেই আমদানি কমিয়ে দেয়। সেই ঘাটতির প্রভাব পড়ে বাজারে। হঠাৎ সংকটে পড়েন গ্রাহকেরা। এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান বলেন, শহরে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডারের চাহিদা রয়েছে। এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ঘাটতি আছে। তাঁর দাবি, সরবরাহ বাড়লেও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে বাড়তি দাম নিচ্ছেন। তবে ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সমস্যা কেবল সুযোগসন্ধানীদের নয়। অনেক দোকানে সিলিন্ডার থাকলেও চাহিদার তুলনায় কম। দরদামের সুযোগ থাকে না। ক্রেতা বেশি, পণ্য কম-এই বাস্তবতায় বাড়তি দাম যেন অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। দোকানিরাও স্বস্তিতে নেই। একদিকে ক্রেতার চাপ, অন্যদিকে পরিবেশকের বাড়তি দর-এই দুইয়ের মধ্যে পড়েছেন তাঁরা।