আমাদের সাহিত্যে রুশ বিপ্লবের প্রভাব

Posted: 26 নভেম্বর, 2017

আহমদ সিরাজ : উনবিংশ শতাব্দি তো বটেই সমগ্র মানবজাতি তথা মানব সভ্যতায় রুশ বিপ্লবের মহাজাগরণ একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হিসেবে পৃথিবীর নিপীড়িত দুঃখী মানুষকে যেভাবে প্রভাবিত করেছে, দ্বিতীয় কোনো ঘটনা এভাবে প্রভাবিত করেনি। ১৯১৭ সালে রুশ দেশে লেলিনের নেতৃত্বে রুশ জনগণের বিপ্লব সংঘটন দেশে দেশে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দেশের ভিতরে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক-সাম্রাজ্যলোভী শক্তির বিরুদ্ধে মানবমুক্তির পথরেখা তৈরি করেছে-যা ছিল পুরাতন ও নতুনের দ্বন্দ্বে একটা শোষণহীন নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন এবং এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নে, চীনে, ভিয়েতনামে, কিউবায়, পূর্ব ইউরোপের দেশসমূহে, এমনকি আমাদের ভারতবর্ষও এই রুশ বিপ্লবের ঢেউ থেকে বাদ পড়েনি। এখানে ভারতবর্ষে বিপ্লবী রাষ্ট্র গঠন সম্ভব না হলেও প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, শ্রমজীবী, কৃষক-শ্রমিকের আন্দোলন সংগ্রামসহ বুদ্ধিজীবীদের জ্ঞান গরিমায়, তাদের সৃষ্টিসম্ভারেও রুশ বিপ্লবের প্রভাব বিরাটভাবে তাড়িত করেছে; আমাদের মহান দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ও কাজী নজরুল ইসলামও রুশ বিপ্লবে দারুণভাবে তাড়িত হয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাজনীতির আলোড়ন-বিলোড়নেও রাজনীতিক কোন দল বা রাজনীতির মোহে আকৃষ্ট হননি। তাকে দূরের সোভিয়েত দেশের বিপ্লবী রাজনীতিক দলের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কথা নয়, তথাপি এই কবি রুশ বিপ্লবের প্রভাব থেকে নিজেকে ঠেকাতে পারেননি। তিনি শেষাবধি রাশিয়ার নির্যাতিত মানুষের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখতে সেই দেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ১৯৩০ সালে, যা তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’র প্রথম চিঠি শুরু হয়েছে এভাবে- “রাশিয়ায় অবশেষে আসা গেল। যা দেখেছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলেছে।” এভাবে অনুভূতির শুরু “তারা সভ্যতার পিলসুজ, মাথায় প্রদীপ নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে- উপরের সবাই আলো পায়, তাদের গা দিয়ে তেল গলিয়ে পড়ে না।” চিঠি-১। রবীন্দ্রনাথ রাশিয়ার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “এখানে এসে যেটা সবচেয়ে আমার ভালো লেগেছে সে হচ্ছে এই ধনগরিমার ইতরতার সম্পূর্ণ তিরোভাব।”... চাষাভূষো সকলেই আজ অসম্মানের বোঝা ঝেড়ে ফেলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে।” চিঠি-২। এখানে এসে রবীন্দ্রনাথের আধুনিক ভারতবর্ষের শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণার পরিবর্তন ঘটে। রুশ বিপ্লবের রাশিয়ায় শিক্ষার গতিপ্রকৃতি দেখে একেবারেই হতবাক হয়ে যান। তাঁর ভাষায়, “কিন্তু এখানে দেখলুম, বেশ পাকা রকমের শিক্ষা, মানুষ করে তুলবার উপযুক্ত, নোট মুখস্থ করে নয় বা পাশ করবার মতন নয়।” চিঠি-৩। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া ভ্রমণে সময় চোখ-কান তথা পঞ্চইন্দ্রিয় সজাগ রেখেই অবলোকন করেছেন। তিনি সকল কিছুই নির্মোহভাবে দেখেছেন। তিনি রাশিয়ার সর্বস্তরের মানুষদের কর্মকাণ্ড জানাবোঝার চেষ্টা করেছেন- এখানকার চাষি-যুব-বৃদ্ধ, তরুণ-তরুণীদেরও। তখন একজন ককেশীয় যুবতী দোভাষীকে বললে “কবিকে বলো আমরা ককেশীয় রিপাবলিকের লোকেরা বিশেষ করেই অনুভব করি যে, অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকেই আমরা যথার্থ স্বাধীনতা এবং সুখ পেতেছি।” চিঠি-৫। এভাবে রবীন্দ্রনাথের গভীর উপলব্ধি তাড়িত করে। তিনি বলেন, “আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনো মতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে, অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতর তল থেকে আজ কেবলমাত্র দশ বছরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক,খ,গ,ঘ শেখায়নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে। অথচ সাম্প্রদায়িক ধর্মের মানুষেরা এদের অধার্মিক বলে নিন্দা করে। ধর্ম কি কেবল পুঁথির মন্ত্রে।” চিঠি-৯। রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ গ্রন্থে উপসংহার ছাড়া ১৩টি চিঠি স্থান পেয়েছে। এই চিঠিগুলোতে কবির রাশিয়া ভ্রমণের নিছক কাহিনি নয়-রাশিয়ার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের আলোকে নিজের দেশ ভারতবর্ষকে দেখেছেন, তেমনি সমগ্র জগৎকে নতুন ভাবে জানার ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে কবির মনোজগৎ। রবীন্দ্রসাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারের মাঝে ‘রাশিয়ার চিঠি’ একখানা দলিল। আজ শত বছর পরেও এ চিঠির গুরুত্ব একটুও কমেনি, বরং বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বিপ্লবের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন, তাও কিন্তু ভবিষ্যতবাণীর মতো বিবেচ্য হচ্ছে। লেলিনের দেশে তিনি লেলিন নন, কিন্তু তাঁর দেশ সম্পর্কে লেলিনদেরও ভাবতে সাহায্য করেছে রবীন্দ্রনাথের দেশ পরিক্রমা। রবীন্দ্রনাথ এভাবেই প্রভাবিত হয়ে উঠেছিলেন। বাংলা ভাষার অন্য কবি কাজী নজরুল ইসলামের আজীবন সর্বহারা বিদ্রোহী কবি হিসেবে অতিবাহিত হয়েছে। নজরুল প্রথাগতভাবে কোনো দলবাজ কবি হিসেবে চিহ্নিত না হলেও রক্ত মাংসে সমাজ, রাষ্ট্রের বিপ্লবী পরিবর্তন কামনা করেছেন। রুশ বিপ্লব সংঘটিত হওয়ায় তিনি উদ্দীপ্ত হয়েছেন। পারলে তিনি সোভিয়েত লাল ফৌজে যোগ দেন। ১৯১৯ সালে তাঁর রচিত ‘ব্যথার দান’ গল্পে দেশপ্রেমের আয়নায় লাল ফৌজের চরিত্র অঙ্কন করেছেন গল্পের ভেতর। শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সঙ্গীত হচ্ছে ‘ইন্টারন্যাশনাল সঙ্গীত’। নজরুল এ গানটি বাংলায় অনুবাদ করেন ১৯২৬ সালে। গানটির শুরু এভাবে- “জাগো জাগো অনশন বন্দী, উঠরে যত জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত।” এ সময়টিতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। নজরুলের কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করে। নজরুল ব্রিটিশ বিরোধী ও রুশ বিপ্লবের চেতনায় আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর সৈনিক হিসেবে যোগদান তাঁর বিপ্লবী চেতনাকে যেমন সমৃদ্ধ করে তোলে, তেমনি এ সময় প্রকাশিত লেখাসমূহ স্বদেশের মানুষকে সংগ্রামী চেতনায় তাড়িত করে। রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বকবিকে কবিতার বাণী পাঠাতে হয়েছে: “আয় চলে আয়রে ধূমকেতু আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তো বিজয় কেতন।” এ সময়ে নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু (১৯২২) কমরেড মুজফফর আহমদ সম্পাদিত ‘লাঙ্গল’ ও ‘গণবাণী’ প্রকাশিত হয়েছে। দুটি পত্রিকাই গণমানুষের চেতনাকে ধারণ করেছে রুশ বিপবের চেতনায়। এই সময়ে রুশ বিপবের প্রভাবকে ধারণ করে যে সমস্ত সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে তার কতিপয় নাম উল্লেখ করা যায়। ১) আর্ত ২) আজাদ ৩) উত্তরা ৪) কর্ম্মী ৫) জনসেবক ৬) তত্ত্ববোধিণী ৭) দেশের বাণী ৮) নোয়াখালী ৯) নব্যভারত ১০) বাংলার বাণী ১১) বিজয়ী ১২) মালঞ্চ ১৩) যুগান্তর ১৪) মুসলেম ভারত ১৫) সোনার মূল্য ১৬) সংহতি ১৭) হিতবাদী ১৮) কল্লোল ১৯) দেশ ২০) সৎসঙ্গী ২১) লাঙ্গল ২২) গণবাণী প্রভৃতি। এই সময় ‘বঙ্গবাণী’, ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকাগুলোতে রুশ বিপ্লবের গুরুত্ব নিয়ে বিরাট বিরাট সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। যেমন- কি হওয়া চাই, আত্মশক্তির সম্পাদকীয়তে শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছেন, “সব্যসাচীর জ্ঞাতিবিরোধের কুরুক্ষেত্রের চেয়ে লেলিনের শ্রেণিবিরোধের কুরুক্ষেত্র ঢের বড়ো আদর্শের দিক দিয়ে, মহত্বের দিক দিয়ে, সম্ভাবনার দিক দিয়ে। জগতের বুদ্ধদেব কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে কঠোর বাস্তবের হাত থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন, কিন্তু লেলিনকে আমি বুদ্ধের চেয়েও বড়ো বলব এই অর্থে যে, তিনি তার কঠোরতম বাহুর ডুরে এই কঠিন বাস্তবকে ভেঙ্গে নতুন করে গড়তে চেয়েছেন।” [৩য় বর্ষ ১লা জানুয়ারি ১৯২৯, ৪১তম সংখ্যা।] রুশ বিপ্লবের পর থেকে ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, কবি, শিল্পীদের সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ প্রভাবিত করেছে- বিদ্যাসাগরের মতো পণ্ডিত ঋষিতুল্য ধার্মিক বিবেকানন্দ পর্যন্ত রুশ বিপ্লবের আলো-বাতাসে তাড়িত হয়েছেন- আরো কত কত বিদ্বানজনেরা রুশ বিপ্লবের প্রভাবকে উপেক্ষা করতে পারেননি তার হিসাব দেয়া সহজ নয়। সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে দুর্দিনের দিনে ভারতীয় গণনাট্যসংঘ সমগ্র ভারতবর্ষ তথা বাংলায় নাচ,গান, অভিনয় এর মাধ্যমে মানুষকে জাগরিত করতে ভূমিকা রেখেছেন। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এ সময় প্রমথ চৌধুরী সহ বিখ্যাত লেখকরা প্রগতিশীল ধারায় এগিয়ে এসেছেন। কবি হিসেবে সুকান্ত ভট্টাচার্য, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ, গল্পকার হিসেবে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বহু লেখক লেখিকা রুশ বিপ্লবের প্রভাবে ভারতবর্ষ তথা বাংলায় গণমানুষের চেতনায় জাগরণ ঘটাতে ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের বাংলাদেশে কবি জসীম উদ্দীন, কবি সুফিয়া কামাল এর নাম উল্লেখ করা যায়। বলা চলে রুশ বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী- যা পরবর্তী পর্যায়ে ভারত-বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। মোটাদাগে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা বাংলাদেশ নির্মাণে এ জাতি একটা বাম উপাদান বহন করছে যা উপেক্ষা করা যায় না। আমাদের সমকালীন সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ ভাবনায় রুশ বিপ্লবের প্রভাব নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। রুশ বিপ্লবের শতবছর পালনে বাম কমিউনিস্ট পার্টি উদ্যোগী হলেও আমাদের প্রগতিশীল সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গন প্রাঙ্গণ এর বাইরে নয়। আমি মানি বা না মানি- যতদিন শোষণ-বঞ্চনা, নিপীড়ন, জুলুম, নির্যাতন থাকবে ততদিন রুশ বিপ্লবের চেতনা গণমানুষকে যেমন প্রভাবিত করবে, তেমনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির দরজা-জানালায়ও আলো ছড়াবেই। লেখক : সদস্য, সিপিবি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি।