ধর্মান্ধতা না কি মানবতা
Posted: 30 জুলাই, 2017
সুতপা বেদজ্ঞ :
মানবতা মানুষের কোনো অলৌকিক গুণাবলী নয়। হঠাৎ করে শূন্য থেকে কুড়িয়ে পাওয়া বস্তুও নয়। এটি এমন এক গুণ যা শুধু মানুষ নামক প্রাণিই অর্জন করতে পারে। একমাত্র মানুষের মধ্যেই থাকে বিবেচনাবোধ, বিজ্ঞান মনস্কতা, বুদ্ধি বিকাশের শক্তি ও সামর্থ। মানুষের মধ্যেই বিরাজ করে ঐঁসধহরংস মানবতা বা মানববাদ। মানববাদের মর্মকথা হল- ‘মানুষের শক্তি ও সম্ভাবনায় বিশ্বাস এবং দৈব ও অলৌকিকে অবিশ্বাস। মানববাদ সব সময়ই বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যকার মহৎ শক্তির বিজয় এবং পাশবিক শক্তির পরাজয় ঘটবে।’ পৃথিবীর তো বটেই এই উপমহাদেশের কবি, সাধক, বুদ্ধিজীবী, সমাজ-সংস্কারক, রাজনীতিক এমনকি ধর্মগুরুরাও মানুষের জয়গান, মানবতার জয়গান গেয়েছেন। মানুষের ওপরেই ভরসা রেখেছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে তাহলে আজকে ধর্মের নামে পৃথিবীতে যা ঘটছে তা কোনো মানুষের ধর্ম। পবিত্র ধর্মকে কারা কলুষিত করে এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই হিসেবটি মেলাতে না পারলে কিছুতেই ধর্মান্ধতার গভীর খাদ থেকে ওঠা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কিন্তু সেই কবির মনুষ্যত্ব, ভ্রাতৃত্ব, সাম্য-মৈত্রী-মানবতাবোধ আমরা আজও ধারণ করতে পারিনি। তিনি লিখেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহিয়ান।’ সকল ধর্ম ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে নজরুল বললেন-‘ ও কারা কোরাণ, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি’ মরি’, ওমুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে, যাহারা আনিল গ্রন্থ কেতাব সেই মানুষেরে মেরে, পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল- মুর্খরা সব শোনো, মানুষ এনেছে গ্রন্থ,– গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’ মন্দির মসজিদ প্রবন্ধে নজরুল বললেন-‘যে দশ লক্ষ মানুষ প্রতি বৎসর মরিতেছে শুধু বাংলায়, তাহারা শুধু হিন্দু নয়, তাহারা শুধু মুসলমান নয়, তাহারা মানুষ, স্রষ্টার প্রিয় সৃষ্টি!’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বমানুষের মিলনের আশায় লিখেছিলেন-‘যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোনো বাঁধন তাকে বাঁধতে পারে না, সে দেশ হতভাগ্য। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ।’ আমরা বর্তমানে সেই বিভেদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি। মানবতা, মনুষ্যত্ব, সাম্য-মৈত্রী-ভ্রাতৃত্ব শব্দগুলি বইয়ের পাতায় বন্দী হয়ে পরেছে।
শাসক গোষ্ঠী চিরকাল তাদের শাসন শোষণের প্রয়োজনে নানা কৌশলে অদৃষ্টবাদকে জনগণের মধ্যে প্রসারিত করে। এ দেশের শাসকগোষ্ঠী আমাদের সমাজকে ক্রমেই যুক্তিহীন অদৃষ্টবাদিতার দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে। যখন সমাজে ন্যায়-অন্যায়ের প্রভেদ কমে আসে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ, দুর্নীতি আর জবরদস্তিই ক্ষমতার প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষ অদৃষ্টবাদকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও মুক্তিকামী বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তৈরি করতে পারছে না। শিক্ষা যদি মানুষকে যুক্তিবাদীই না বানায় তাহলে সে শিক্ষার স্বার্থকতা কোথায়? মাহথির মোহাম্মদ বলেছেন- যে দেশের অধিবাসীরা কাল্পনিক পরলোককে বাস্তবের ইহলোকের ওপর প্রধান্য দেয় সে দেশের উন্নতি হয় না।
ধর্ম মানুষের অন্তরের এক প্রকার বিশ্বাস। যে বিশ্বাসকে ধারণ করে মানুষ অদেখা পরজগতের মুক্তির জন্য ইহজগতে নানা ক্রিয়াকলাপ আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। বস্তুজগতের পালনকৃত ধর্ম সর্বদাই পারলৌকিক বা মৃত্যুর পরের জগতের জন্য। যেহেতু এটি একটি বিশ্বাস যা অধিকাংশক্ষেত্রে বংশ পরম্পরায় আবর্তিত হয়, সেজন্য বিভিন্ন মানুষের ধর্মবিশ্বাস ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব বলেছেন-যত মত তত পথ। সেই পথ পরকালে ভাল থাকার পথ। সৃষ্টিকর্তার করুণা লাভের পথ, তার থেকে পুরস্কার লাভের পথ। সকল ধর্মমতই পরকালের পথ কুসুমাস্তীর্ণ করার জন্য এই বস্তুজগতে সৎ-সত্য-সভ্য-সুন্দর-নির্লোভ-মানবিক পথ অনুসরণ করতে বলেছে।
অথচ সে পথ ভুলে এখন বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে যে উন্মাদনা চলছে তা ভয়াবহ। মানবতাকে ছাপিয়ে ধর্মান্ধতার শেকড় পরিবার-সমাজ এমনকি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করেছে। ধর্মীয় মত প্রতিষ্ঠার নামে মানুষ জঙ্গি-সহিংস জীবন বেছে নিচ্ছে। এই যে জঙ্গি বা সহিংস জীবন, নাম-পরিচয়হীন কুৎসিত মৃত্যু, বোমার আঘাতে বিকৃত ছিন্ন-ভিন্ন শরীর এই কী মানুষের নিয়তি। যে অনন্ত শান্তির আশায় এই পথ বেছে নেয়া তাতো মৃত্যুতেও মিলছে না।
অবিভক্ত ভারত ভাগ হয়েছিল ধর্মীয়ভিত্তিতে। আর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল মানবতারভিত্তিতে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। গত ৪৬ বছরে বংলাদেশে মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞান মনস্কতার বদলে ক্রমেই জেঁকে বসেছে ধর্মান্ধতা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান শাসকগোষ্ঠী। রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা হয়েছে। ধর্মান্ধদের উন্মত্ততায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতি ধ্বংস হতে চলেছে। প্রগতিকামীরা বহুধা বিভক্ত। ফায়দা লুটছে মৌলবাদী ও ক্ষমতাসীনেরা।
সমাজতন্ত্রকে ঠেকাতে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রে পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষে মানুষে যে হানাহানি, বিভেদ, সংঘর্ষ চলছে তাতে আগামী ভবিষ্যতের মানবতাকে এক কঠিন সময় যে পার করতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জামাত, হেফাজত ইত্যাদি গোষ্ঠীর হাত ধরে এরই বিষবাষ্প বাংলাদেশেও পৌঁছেছে। জাতির ক্রান্তিকালে যে তরুণ সমাজ সর্বদাই আলোর পথ দেখায় সেই তরুণ সমাজকে কৌশলে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করা হচ্ছে। প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক-মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন-বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষেরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। বিবেকবান মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় চরম হুমকিতে।
শাসকশ্রেণি বাংলাদেশকে অতি সুকৌশলে সাম্প্রদায়িক ধর্মাশ্রয়ী অমানবিক এক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। এ মূহূর্তে বাংলাদেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক চরিত্র থেকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্রে তথা মুক্তিযদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে নেবার মত শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের অভাব রয়েছে। বর্তমান শেখ হাসিনার দল লুটেরা-বুর্জোয়াদের স্বার্থে পরিচালিত এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির সাথে আপোষ প্রত্যাশী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী একটি দলে পরিণত হয়েছে আর বিএনপিতো আরো প্রতিক্রিয়াশীল।
এদের ক্ষমতার কামড়া-কামড়িতে বিদেশি শক্তি তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বামপন্থিরা বহুধা বিভক্ত। এই বিভক্তি তাদের ক্ষমতাহীন, মর্যাদাহীন, লক্ষ্যহীন করে তুলেছে। একটি অংশ আদর্শ বিসর্জন দিয়েছে, সাথে সাথে প্রগতিশীলদের নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে। অতিবামেরা সব পথেই খুঁত খুঁজে চলেছেন।
নিজে ঠিক আর সব বেঠিক। তাদের শক্তি যে এখন শূণ্যের কোঠায় পৌঁছেছে তাতে কিছু আসে যায় না। যেকোনো মূল্যে একরোখা চরিত্র ধরে রাখতে হবে। ফলে সমাজ বদলের অঙ্গীকারের প্রশ্নে বামপন্থিরা এক নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও পথ নিয়ে তাদের বিভক্তি মানুষকে ক্রমাগত হতাশ করছে। অথচ জাতির এই ক্রান্তিকালে দরকার কমিউনিস্ট, বামপন্থি, প্রগতিশীল, সৎ ও দেশপ্রেমিক দল ও ব্যক্তির বৃহত্তর ঐক্য।
মানবতা পরাস্ত হলে হিংস্রতা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে হতাশ হয়ে ঘরে বসে কালক্ষেপণ করার মত সময় হাতে নেই । দানবের গতি সর্বদাই ক্ষিপ্র। মানবদের বাঁচতে হলে দানবের গতি থামাতেই হবে। নিজে স্বপ্ন দেখতে হবে,স্বপ্ন দেখাতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। এই পচা নষ্ট সমাজ ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য চাই রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী মানুষের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এটি কোনো সহজ কাজ নয়। এ কাজের পূর্বেই শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করা দরকার। সাথে সাথে প্রয়োজন গতানুগতিকতার বাইরে নতুন ধারার পার্টি, যার লক্ষ্য হবে যুক্তিবাদী মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের মধ্যে নিরন্তর কাজ করে একটি গণভিত্তিসম্পন্ন পার্টি গড়ে তোলা। এমন একটি পার্টিই পারে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তথা মানববাদে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি ও ব্যক্তিকে একত্রিত করে এক বৃহত্তর বলয় তৈরি করতে।
লেখক : সদস্য, সিপিবি, খুলনা জেলা কমিটি