মক্কা চুক্তি : সুরক্ষা নয়, ঝুঁকি

Posted: 20 সেপ্টেম্বর, 2026

বিশ্ব রাজনীতির এমন এক পটভূমিতে মক্কা চুক্তি সংগঠিত হলো যখন ‘গ্রেট আমেরিকা মেক এগেইন’-এর দাম্ভিকতার ধস নেমে চলেছে। আমেরিকার ডলার আর সামরিক শক্তির একক প্রভাবটা এখন যেন আর কাজ করছে না। খোদ আমেরিকার শাসকদের আত্মবিশ্বাসে ফাটল তৈরি হয়েছে। তাদের ক্ষমতার প্রতি মিত্রদের মধ্যেও ভরসাটা কমতে শুরু করেছে। এ অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতা থেকেই মিত্রদের নিজ নিজ স্বার্বভৌমত্বের সুরক্ষা দিতে আঞ্চলিক সামরিক জোট গড়ে তোলার আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি যার একটি উদাহরণ। কেউ মনে করছে, এ চুক্তি প্রাচ্যের ন্যাটোর মতো একটি চুক্তি। যদিও ন্যাটোর মতো সামরিক বাহিনীর কোনো কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে বলে মনে হচ্ছে না, তবে ভবিষ্যতে সেটা হতে পারে এমন ধারণা করা যায়। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির প্রবক্তারা এই চুক্তিকে ধর্মীয় মোড়কে রূপায়িত করতে চায়। ইতোমধ্যে আমাদের দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই চুক্তিকে ইসলামিক চুক্তির তকমা দিয়েছেন এবং আশাবাদ করছেন যে, বাংলাদেশকে কোনো পক্ষ থেকে এই জোটে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ দিলে তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে এবং অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। যদিও ইতিমধ্যে পাকিস্তান মক্কা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে উল্লেখ করছে যে, আপাতত জোটের পরিধি বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। ত্রিদেশীয় এই জোটের কাঠামোগত নীতিমালা চূড়ান্ত করেই নতুন সদস্য গ্রহণ করা হবে। চুক্তিটির মূল উদ্দেশ্য চুক্তির আওতায় যেসব দেশ থাকবে তাদের প্রত্যেকের স্বার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা ঐক্যবদ্ধভাবে রক্ষা করা হবে। জোটের সদস্য কোনো দেশ অন্য কোনো দেশ কর্তৃক আক্রান্ত হলে যৌথভাবে সেই আক্রমণ প্রতিহত করা হবে। এই ধরনের সামরিক চুক্তি পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কের ক্ষেত্রে প্রয়োজন থাকলেও বাংলাদেশের জন্য তা কতটা বাস্তবসম্মত, বিশ্লেষণ ও গভীর আলোচনার দাবি রাখে। যে দেশগুলো মক্কা যৌথ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে তাদের প্রত্যেকের স্থায়ীভাবে প্রতিপক্ষ রয়েছে, যা তাদের স্বার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। ভূ-রাজনৈতিক কৌশলে তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের সামরিক যৌথ চুক্তির প্রয়োজন থাকলেও বাংলাদেশের জন্য কতটুকু গুরুত্ব বহন করে, তা আলোচনার দাবি রাখে। এ ধরনের চুক্তি আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্বার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপদের সম্ভাবনাকে অনেক বেশি ঝুঁকিতে নিয়ে যাবে। প্রথমত, আমাদের কোনো স্থায়ী শত্রুপক্ষ নেই, যার কারণে আমাদের দেশের স্বার্বভৌমত্ব হুমকিতে আছে। দ্বিতীয়ত, এই জাতীয় জোটের সাথে কাজ করার আমাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তৃতীয়ত, ‘কারোর সাথে শত্রুতা নয় সবার সাথে বন্ধুত্ব’ এই পররাষ্ট্র নীতি থেকে আমাদের সরে আসতে হবে, যা স্থায়ীভাবে শত্রু সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াবে। চতুর্থত, যেসকল দেশ মক্কা চুক্তির সাথে যুক্ত রয়েছে, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে নিজেরা শক্তিধর। সৌদি আরবের রয়েছে অর্থসম্পদ, তুরস্কের আছে সামরিক প্রযুক্তি আর গোয়েন্দা তৎপরতার সক্ষমতা অন্যদিকে পাকিস্তান একমাত্র ইসলামিক দেশ, যার কাছে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র। বাংলাদেশের এমন কোনো সক্ষমতা নেই যা দিয়ে সে জোটের অন্য সদস্যদের মতো কাঠামোগত গুরুত্ব অর্জন করবে। কাজেই অংশীদারিত্বে মর্যাদার দাবিদার হওয়ার সক্ষমতার অভাবে বাংলাদেশেকে জোটের অন্যান্য অংশীজনের অনুগামী হয়ে থাকতে হবে। যে জোট আমাদের জাতীয় স্বার্থরক্ষা করবে না, যে জোটে অংশগ্রহণ দেশের বহুমাত্রিক ঝুঁকির জন্ম দিবে, সেই জাতীয় সামরিক জোটের সদস্য হওয়ার প্রত্যয় যুদ্ধের ঝুঁকি আর অর্থনৈতিক বিপদকে ডেকে আনবে। বরং এই জাতীয় জোট আমাদের সামরিকভাবে শক্তি অর্জনের প্রবণতাকে বৃদ্ধি করবে। ফলে দেশের সামরিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিতে আমরা বেশি গুরুত্ব দেব, যা আমাদের উন্নয়ন খাতকে সঙ্কুচিত করবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সৃষ্টি করবে। আমাদের দেশের অগ্রগতিতে এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপদ আমরা দেখছি, ধর্মভিত্তিক জোট গঠনের আগ্রহ রাষ্ট্র ও সমাজের সাম্প্রদায়িক চেতনাকে আরো প্রসারিত করবে। ঝুঁকিতে পড়বে প্রগতিমুখী রাজনীতিক ধারা এবং উন্নয়ন খাত। পুঁজিবাদী শাসন কাঠামো শোষিত শ্রেণি ও জনস্বার্থবিরোধী নীতিতে পরিচালিত হয়। তার বিরুদ্ধে সমাজে ক্রমাগত অসন্তোষ ও প্রতিবাদের যে ধারা সৃষ্টি হচ্ছে তাকে দমিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে এ ধরনের জোটকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মক্কা চুক্তিতে দেশ ও জনগণের কোনো স্বার্থ নেই, আছে পুঁবিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদী সমরাস্ত্র কারখানার মালিকের মুনাফা লুটের স্বার্থ। এটা শাসকশ্রেণির পেতে রাখা ‘বুবি ট্র্যাপ’-এখানে পা দেওয়া যাবে না। কোনো পক্ষ থেকে এই জোটে অংশগ্রহণের প্রস্তাব আসলেও তা নেতিবাচকভাবেই নিতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থরক্ষা করতে হলে, দেশে আজ লুটেরা ধনবাদী শোষণের ওপরে ভিত্তি করে যে ব্যবস্থা কাঠামো গড়ে উঠেছে, আসলে সেই কাঠামোর উচ্ছেদ করতে হবে এবং পুঁজিবাদী শোষণমুক্ত লুণ্ঠনমুক্ত জনস্বার্থ অনুকূলের একটা মানবিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এটাই সময়ের দাবি। শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদ করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যা শুধু মানবিক কল্যাণমুখী বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে কাজ করবে না, বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজ দেশকে যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে মুক্ত করে দেশের স্বার্বভৌমত্বের সুরক্ষাকে শক্তিশালী করে তুলবে।