তেরেসাকে ডেকেছিলো যে
Posted: 05 এপ্রিল, 2026
রাস্তায় নেমে আবার কয়েক পা পিছিয়ে আসলাম, রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে হাতকে চোঙার মতো করে গলির উঁচু বিল্ডিংগুলোর দিকে ডাক দিলাম, তে-রে-সা!
কেউ একজন যাচ্ছিল। আমি আবার চিৎকার দিলাম- তে-রে-সা! লোকটা আমার কাছে এসে বলল, আরো জোরে ডাক দ্যান, নাইলে য়ুনবো না। লোকটাও আমার সাথে গলা মিলাল, এক- দুই-তিন- তে রে সা। এইভাবে আবার।
রাস্তা দিয়ে কিছু ছেলেপিলে যাচ্ছিল, হয়তো সিনেমা দেখে বা আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে ফিরতে ছিল, চিৎকার দিতে দেখে তারাও চলে আসল। তারাও গলা মেলাল। একজন বলল, এক, দুই, তিন সাথে সাথে সবাই একসাথে ডাক দিলো, তে রে সা। আবার, এক দুই তিন এইভাবে দেখতে দেখতে, আধাঘণ্টার মধ্যেই মেলা লোক জমে গেল। তাই সবাই মিলে একসাথে ডাক দেওয়াটা তখন আর সহজ ছিল না। কেউ যদি তে থেকে শুরু করে তো, কেউ সা দিয়া শেষ করে। হযবরল একটা অবস্থা। তখন সবাইকে কোনোরকম বুঝানো হলো, তে থেকে শুরুর সময় গলা হবে নিচে-লম্বা, রে তে গিয়ে আবার উঁচুতে এবং সা তে এসে আবার গলা নামিয়ে নিতে হবে। কাজ হলো এতে। অনেকদূর পর্যন্ত গেল ডাকটা। আবার শুরু করবো এসময় ঝগড়া লেগে গেল। একজন, মুখে মেছতার দাগ, ভীড় ঠেলে কোনোরকম কাছে আসলো, আচ্ছা আপনে কি নিশ্চিত, সে বাসায়? আমাকে জিজ্ঞেস করলো।
আমি মাথা নাড়লাম, না।
-এইডাতো ঠিক না! আরেকজন বিরক্ত, বাসার চাবি আনেন নাই?
আনললাম তো। এই যে।
-তয়, বাসায় যান না ক্যা?
সাথে সাথে আরো কয়েকজনের গলা- হ, ঘরে যান না ক্যা?
আমি বললাম, কেন যাবো? আমি তো অইখানে থাকি না। আমি থাকি শহরের আরেক মাথায়।
-তয়, ডাকতাছেন কারে?
আমি তো জানি না। শুনে লোকজন অবাক হলো।
-কী বলে! লোকজন আবার বিরক্ত হলো আমার উপর।
একজন, দাঁত দেখিয়ে খুব সুন্দর করে হাসলো- তাহলে বলেন তো, তেরেসা কইয়া কারে ডাকতাছেন?
বললাম, আপনি চাইলে আপনার পছন্দ মতোন অন্য কাউকেও ডাকা যেতে পারে ।
এবার লোকজন আরো বিরক্ত।
-আপনে কি আমাগো লগে মজা করতাছেন? মেছতার চোখে সন্দেহ।
না, না, তা কেন? আমি অন্যদের মুখের দিকে তাকালাম, সায় পাওয়ার জন্য। কিন্তু কেউই সায় দিলো না। অস্বস্তিকর অবস্থা।
একজন, দেখতে ভালোমতোন, বললো,-তাইলে আর একবার ডাকুম মাত্র, তারপর কিন্তু চইলা যামু-
তাই হল। আমরা আরেকবার ডাক দিলাম। এক দুই তিন- তে রে সা। ভালোমতোন হলো না। লোকজনও আস্তে আস্তে যাওয়া শুরু করলো।
আমিও রওনা দিলাম। যেতে যেতে শুনলাম, তখনও কেউ একজন তেরেসা বলে ডেকে যাচ্ছে। কোনো পাগল-টাগল হয়তো। ডেকেই যাচ্ছে।
বিবেক
যখন যুদ্ধ শুরু হলো, অন্যদের মতো লুইগি’রও ডাক এলো। যুদ্ধে যেতে হবে। লুইগি’ও রাজি হলো। সে গিয়েই যেখানে যুদ্ধের জন্য রাইফেল রাখা ছিলো, একটা তুলে নিলো, বললো,- আমি যাই, আলবার্তোরে খুন কইরা আসি।
সবাই অবাক, আলবার্তো কে?
-আমার শত্রু।
আলবার্তোকে বুঝানো হলো, এই শত্রু না। তোমাকে আরো বড় শত্রু খুনের জন্য ডাকা হয়েছে। দেশের শত্রু।
-জানিতো সব। অই হালাও কম না! অইসব যুদ্ধ-ঠুদ্ধের লাইগা না, শুধু অই হালারে খুনের জন্যই আমি রাজি অইছি। ও একটা বদমাইশ। আরেকটা মাইয়ালুকসহ আমারে ঠকাইছে। আমি ছাড়মু না। কি, বিশ্বাস অ্য় না? তাইলে ঘটনাডা বলি-
-আচ্ছা, আগে ঘটনাটা শুনি-
-কমু, তার আগে কন, অই হালা কই, আগে হালারে শেষ কইরা আসি।
-তা তো জানি না।
-কুনো বেপার না, খুইজ্যা নিমু আমি।
-না, সম্ভব না এটা, আগে তোমারে যুদ্ধে যেতে হবে, তারপর বাকি কাজ-
-তাইলে ঘটনাডা কই। অই হালা কিন্তু আসলেই বাটপার, তুমরা ঠিকই করছো ওর লগে যুদ্ধ শুরু কইরা, হুনো এইবার-
কিন্তু কেউই তার কথায় কান দিলো না।
লুইগিও নাছোড়বান্দা: মাফ করো, ওর বদলে আর কাউরে মারলে আমার নিজের লগেই বেঈমানি অইবো, আমার দরকার ওরে-
সবাই ততক্ষণে অস্থির, এই সময় একজন বলল, আচ্ছা আগে যুদ্ধটা শেষ হোক, তারপর যারে খুশি তারে-
-তাইলে, আমারে বাদ দেন-
না, সম্ভব না। তোমাকে যুদ্ধে যেতে হবে।
এরপর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলো। লুইগিও যুদ্ধে গেলো। সে আশায় আশায় থাকে, যদি আলবার্তোকে পাওয়া যায়, অন্তত তার ঘরের কাউকে- কিন্তু সে পায় না। সে যুদ্ধে মানুষ মারে। কর্তৃপক্ষ পুরস্কার দেয়। কিন্তু সে খুশি হয় না। তার মন খারাপ থাকে। সে ভাবে, লাভ কী এতো মানুষ মেরে, যদি আলবার্তো বেঁচে থাকে! এরমধ্যে সে যুদ্ধের জন্য একটার পর একটা পুরস্কার পায়। ব্রোঞ্জ, রোপ্য, স্বর্ণ, সব। তারপরও সে খুশি হতে পারে না। তার মন খারাপ হয়। শুধু শুধু মানুষ খুন তার ভালো লাগে না।
যুদ্ধ শেষ হয়নি। তার আগেই লুইগি আলবার্তোর খবর পেয়ে যায়। সে সাথে সাথেই, তার সব দামি দামি পুরস্কার নিয়ে লুকিয়ে শত্রুর দেশে ঢুকে যায়। যুদ্ধে যারা মারা গেছে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের তার সব পুরস্কার দিয়ে আসে। এরপরই ফিরে এসে আলবার্তোকে খুন করে। ভাবে, দেরিতে হলেও তো পারলাম। খারাপ কি! এজন্য সে গ্রেপ্তার হয়। জেলে যায় এবং বিচারে তার ফাঁসির রায় হয়।
ফাঁসির আগে সে বলে, আমার নিজের বিবেকের লাইগাই এই খুনডা কোরতে অইছে।
কিন্তু কেউই তার কথা শোনেনি।