যাত্রাপথে ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ কমবে কবে

Posted: 05 এপ্রিল, 2026

ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে কমলাপুর রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছি। পাশেই বসা মাঝবয়সী একজন। কথায় কথায় জানলাম তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি অফিসে কর্মরত। ঢাকা থেকে নীলফামারী অভিমুখে ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি দুর্ঘটনা কবলে পড়েছে, তাই রাত ১১টার পঞ্চগড় এক্সপ্রেস আসবে রাত ৩টার পর। ‘ভাই’ সম্বোধন করে জানতে চাইলাম–‘যাবেন কোথায়?’ উত্তরে বললেন, ‘যাবো আর কই ভাই..., ট্রেনের তো কোনো ঠিক নাই। যেভাবে মৃত্যু বাড়ছে, জানি না বাঁচবো না মরবো। মরতে তো হবেই, এখন শুধু একটাই চাওয়া–স্বাভাবিকভাবে যেন মরতে পারি।’ কর্মব্যস্ত নগর ‘ঢাকা’। তিলোত্তমা এই নগরে কাজের সন্ধ্যানে ছুটে আসেন মানুষ। সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় পরিশ্রম করেন দিনরাত। সচল রাখেন অর্থনীতির চাক। কিন্তু সেই শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষেরম ভাগ্যের চাকা কখনোই সচল হয় না। অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর জন্য যারা দিনরাত পরিশ্রম করে তাদের ভাগ্যে জোটে কেবলই বঞ্চনা, মৃত্যু আর জীবনযুদ্ধের আহাজারি। বাংলাদেশে ঈদ এলে এইসব মানুষেরা ছুটতে শুরু করেন গ্রামের পথে। নাড়ির টানে, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ-উৎসবের আমেজ ভাগাভাগি করতে শত ভোগান্তি সয়ে দীর্ঘ যাত্রাপথ পাড়ি দেন তারা। বিভিন্ন কারখানা, গার্মেন্টেসে কর্মরতদের একটি বড় অংশই উত্তরাঞ্চল ও ময়মনসিংহ বিভাগের। ভাগ্যের চাকা বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন লাখ লাখ এই কর্মজীবী জনগোষ্ঠী। ১২ মাসের লম্বা কর্মমুখর সময়ে দুটি ঈদ মানুষের জীবনে স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে। ৫ থেকে ৭ দিনের ছুটিতে সবাই বাড়ির মুখে পথ ধরে। যাত্রা হিসেবে বেছে নেয় রেল, বাস ও লঞ্চকে। প্রায় সবার কাছে রেল যোগাযোগ অন্যতম নিরাপদ বাহন হিসেবে পরিচিত। এজন্যে স্বল্প খরচে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে ট্রেনকে বেছে নেয় মানুষ। তবে, এবারের ঈদে নিরাপদ এই বাহনটি হয়ে উঠেছে ‘মৃত্যুগামী যান’ হিসেবে। স্বস্তির এই বাহনে টিকেট পাওয়া, নিরাপদে যাত্রা করা, স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি পৌঁছা সব যেন একটা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। অনলাইন টিকেটিং সিস্টেমে হয়রানি, লাইনচ্যূত, রেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা, শিডিউল বিপর্যয় আর যাত্রা বিলম্ব বাড়িয়ে তুলেছে যাত্রীদের হয়রানি। ইদযাত্রায় হয়রানি কমবে কবে, এমনটাই প্রশ্ন যাত্রীদের। এবারের ঈদযাত্রায় দেশবাসীর মনে ক্ষতের জন্ম দিয়েছে, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় বাসডুবি, নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের দুর্ঘটনা, কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষ, লঞ্চের ধাক্কায় বাবা-ছেলের মৃত্যু, সড়কপথে নানারকম এক্সিডেন্ট ও সহিংসতার খবর। এসব দুর্ঘটনা দেশবাসীকে শোকে বিহ্বল ও বাকরুদ্ধ করে তুলেছে। সবার প্রশ্ন- যাত্রাপথে এই ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ কমবে কবে? সড়ক ও জনপথ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন নেতাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই এগুলো কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করছেন তারা। বিশেষ করে, এবারের ঈদযাত্রায় মানুষের মনে গেঁথে থাকবে দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে পদ্মা নদীতে বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনা। যে ঘটনা সারা দেশবাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। পদ্মা নদীতে বাস তলিয়ে যাবার ঘটনায় ২৫ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে এই পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২৫ লাশের মধ্যে ১১ মহিলা, ৭ পুরুষ, এবং ৭ জন শিশু রয়েছে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ শেষ করে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। কিন্তু রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা আর অব্যবস্থাপনায় লাশ ফিরলো তাদের বাড়িতে। প্রতিবার ঈদের সময় সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। অথচ বাস্তবে পরিবহন সংকট, যাত্রীর তুলনায় যান কম, শিডিউল বিপর্যয়, বাড়তি ভাড়াসহ নানা রকমের অভিযোগ শোনা যায় ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে। ঈদের সময় মন্ত্রীদের নানা আলাপ শোনা গেলেও বাস্তবে তাদের কর্মপরিধির দেখা মেলে খুব কম। এজন্য সুস্থ ও স্বাভাবিক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন- দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও সঠিক তদারকি। সেভ দ্য রোডের তথ্য বলছে, গত মার্চ মাসে সড়ক-রেল ও নৌ-পথে ঝরেছে ৫৮৭ জনের প্রাণ। যা অন্যবারের তুলনায় অধিক। অথচ দেশের মানুষের আশা ছিল, নতুন সরকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিবে, সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সহিংসতা আর মৃত্যুর মিছিল এবারোও লম্বা হলো। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, অদক্ষ ও ক্লান্ত চালকদের দ্বারা পরিচালিত বাস-ট্রাক দুর্ঘটনা অতীতের ঈদের চেয়ে যেমন বেশি ঘটেছে, তেমনই নারী ও শিশু হতাহত ও নিহতর ঘটনাও ঘটেছে বেশি। বছর ঘুরে বছর আসে, ঈদ শেষে ঈদ আসে। কিন্তু মানুষের মৃত্যুর লাইন কখনো কমে না। যাত্রাপথে মানুষ স্বস্তি খুজে, বাঁচতে চাই। বাঁচাতে চাই স্বপ্নকে। লেখক : সাংবাদিক