জয়তু বিপ্লবী
কমরেড জসিমউদ্দিন মণ্ডল
Posted: 05 অক্টোবর, 2025
‘পার্টির ভিতরে জসিমউদ্দিন মণ্ডলের সাথে যে বন্ধুত্ব রয়েছে, তা আর কারো সাথে নাই। জেলখানার ভিতরে দু’জনের বন্ধুত্ব দেখে লোকজন বলতো মানিকজোড়। সে খুবই ভালো মানুষ। রেল শ্রমিক। শ্রমিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শ্রমিকের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আজীবন নিবেদিত প্রাণ। জীবনের একদিনের জন্যও কোথাও আপস করেনি। ভালো বক্তা। তার বক্তব্য শুনে আমজনতা অনুপ্রাণিত হয়। বিপ্লবী শ্রমিক নেতা। শ্রমিকশ্রেণি থেকে উঠে আসা নেতা। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। যেদিন কমিউনিস্ট পার্টিতে জসিমের মতো নেতা সংখ্যার দিক থেকে বেশি হবে সেদিন কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিকশ্রেণির অগ্রবাহিনী পার্টি হিসেবে গড়ে উঠবে। জসিম এবং আমার তুই তুই সম্পর্ক। জসিম আর বরুণ রায় এক বয়সি ছিলো। জসিম বক্তব্যে প্রায়ই একটা কথা বলেন, ‘এ সমাজ বড়োলোকের সমাজ, শোষকের সমাজ, গরিব মারার সমাজ– এই সমাজ ভাঙতে হবে এবং ভাঙ্গিতেই হবে।’ –বিপ্লবী কামাখ্যা রায় চৌধুরী
২০০৩ সালে পার্টি কংগ্রেসের সময় জসিম ভাইকে প্রথম দেখি, প্রথম কথা শুনি। তাঁর নাম জেনেছিলাম ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময়। কবির ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিলো– পার্টির মধ্যে সবচেয়ে ভালো বক্তব্য রাখেন কে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন বিপ্লবী জসিমউদ্দিন মণ্ডল। সেই থেকে তাঁর নামটা চেতনায় রয়ে যায়।
ঢাকার মুক্তাঙ্গনে পার্টির একটা সমাবেশে প্রথম তাঁর বক্তব্য শুনি। কবির ভাইয়ের কথা তখন বেশ মনে পড়ছিলো। জীবনে এই প্রথম কারো বক্তব্য শুনে বক্তব্যের ধারণাটা পালটে গিয়েছিলো। অদ্ভুত একটা ভালো লাগা তৈরি করেছিল– জসিম ভাইয়ের বক্তব্য। বক্তব্যের মধ্যে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের কথা, শুধু তাদের পক্ষের কথাই নয়, তাদের ভুল-ত্রুটির কথাও রয়েছে। অন্যদিকে পার্টির কথা, পার্টির কোথায় ত্রুটি হচ্ছে, কেন আগাচ্ছে না, কি করলে আগাবে– সে সব কথা। এত সহজ করে সবকিছু বক্তব্যে নিয়ে আসা যায়– এটা কল্পনাও করিনি।
এরপর ২০০৮ সালের পার্টি কংগ্রেসে জসিম ভাইয়ের সাথে কথা হয়, পরিচয় হয়। তারপর থেকে তিনি ঢাকায় আসলে নিয়মিত একটা যোগাযোগ হতো। ২০০৯ সালে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে যখন বিদায় নেই তখন ‘বিপ্লবীদের কথা’ নামে একটি ‘মাসিক’ পত্রিকা বের করি। ওই পত্রিকায় তৃতীয় সংখ্যায় জসিমউদ্দিন মণ্ডলের একটা বক্তব্যের অংশবিশেষ ছাপি।
৯৩ বছর বয়সে যাঁকে দেখা যেত পার্টি, রাজনীতি, সংগঠনের সাথে, মিছিলে, স্লোগানে, মিটিংয়ে, কংগ্রেসে ও সমাবেশে– তিনি জসিমউদ্দিন মণ্ডল। এমন বিপ্লবী, এমন ত্যাগী কমরেড, দেশপ্রেমিক, শ্রমিকনেতা, কিংবদন্তি বক্তাকে নিয়ে এদেশে বই হয় না, গবেষণা হয় না। অথচ এঁরাই ভারতের স্বাধীনতা এনেছিলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছিলো, স্বৈরশাসকের মসনদ ভেঙে এনেছিলো গণতন্ত্র। আমরা সেই স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সুসংহত না করে উলটো মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে লুটতরাজ, খুন-ধর্ষণ ও ধর্মান্ধরাজ্য কায়েম করেছি।
‘ভদ্রলোকদের দিয়ে হবে না। আমার মতো দাদওয়ালা, পা-ফাটা, হাতুড়ি পেটা, শাবল চালানো, বয়লার মারা, চাষা-ভূষা, শ্রমিক-মেহনতি মানুষ যতদিন পর্যন্ত পার্টিতে না আসবে ততদিন হবে না। এরাই বিপ্লব করবে, এদেরই বিপ্লব দরকার, ভদ্রলোকের না। কৃষক জানে কিভাবে ফসল ফলাতে হয়, শ্রমিক জানে কীভাবে শাবল চালাতে হয়, হাতুড়ি চালাতে হয়, কীভাবে গড়তে হয়-ভাঙতে হয়, তা তারা জানে, ভদ্রলোক জানে না। বহু হরতাল-ধর্মঘটই দেখেছি, রেললাইন উপড়ানো, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, সবকিছু অচল করে দেওয়া– এসবই শ্রমিকরা করেছে, ভদ্রলোকরা (পোশাকী কমিউনিস্ট) নয়।
দরখাস্ত করে, হুজুরের পানিপড়া দিয়ে, স্লোগান দিয়ে এই সমাজ একচুলও পরিবর্তন করা যাবে না। সমাজতন্ত্র ছাড়া কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। এই সমাজ বড়োলোকের সমাজ, শ্রমশোষণের সমাজ, এই সমাজ ভাঙিতে হবে এবং ভাঙিতেই হবে।
আমি জসিমউদ্দিন মণ্ডল, রেল শ্রমিক। রেলে বয়লার মেরেছি, টনকে টন বয়লার মেরেছি। স্বল্প মাইনে কাজ করেছি। এই হাত দিয়ে ব্রিটিশকে মেরেছি, পাকিস্তানকে তাড়িয়েছি, বহু জোতদার-জমিদারকে উচ্ছেদ করেছি। তোমরা না তরুণ, তোমরা না যুবক– তোমাদের ভয় কীসের! তোমরা পারবে না কেন? এই সমাজ, এই রাষ্ট্র ভাঙা ছাড়া মানুষের মুক্তি আসবে না। শ্রমিক আন্দোলন করেছি, পার্টি করেছি– এই বড়োলোকের সমাজ-রাষ্ট্র ভাঙার জন্য। এখনও পার্টি করি, মিছিল করি, মিটিং করি– এই সমাজ ভাঙার জন্য। এই পঁচা-গলা সমাজ ভাঙা ছাড়া মুক্তি আসবে না।
‘আমার জন্ম হয়েছিল এমন একটা পরিবারে, যেখানে জন্ম-তারিখ কিংবা জন্মসন ঘটাও করে লিখে রাখবার কোনো রেওয়াজ ছিলো না। আমার মা বলতেন, ‘সেই যে দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ শুরু হলো, তার ঠিক দশ বছর পর তোর জন্ম।’ তার থেকেই আন্দাজ করা যায়, ১৯১৪ সাল থেকে দশ বছর পরে অর্থাৎ ১৯২৪ (আনুমানিক) সালে আমি জন্মগ্রহণ করি (তবে তিনি অনেক ক্ষেত্রে ১৯২০ সাল উল্লেখ করেছেন)। আজকের কুষ্টিয়া জেলা তখন অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই নদীয়া জেলার কালীদাশপুর গ্রাম আমার জন্মস্থান। আমার বাবার নাম হাউসউদ্দীন মণ্ডল। ছেলেবেলায় দাদীর মুখে শুনেছিলাম, দাদী আদর করে তার প্রথম সন্তানের নাম রেখেছিলেন হাউস অর্থাৎ শখ। আমার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন।
আমরা ছয়ভাই, এক বোন। বড় বোনের নাম জমেলা। ভাইদের মধ্যে আমি প্রথম (জসিমউদ্দিন মণ্ডল), ২য় আব্দুল রব মণ্ডল, ৩র্থ আব্দুল হাননান মণ্ডল, ৪র্থ হাবিবুর রহমান, ৫ম কাশেম মণ্ডল, ৬ষ্ঠ আব্দুল করিম মণ্ডল।
বড় বোন জমেলা মারা গেছেন। ভাইদের মধ্যে হাবিবুর রহমান ও কাশেম মণ্ডল মারা গেছে। আমরা এখন ৪ ভাই বেঁচে আছি। আমাদের পরিবারের সবাই মুক্তিযোদ্ধা– পাকিস্তান-বিরোধী।’
‘ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যদিয়ে আমি শ্রমিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ি। লেখাপড়াটা ভালো করে হলো না। কিন্তু রাজনীতিটা নেশা হয়ে গেলো। শুধু রাজনীতি করলে হবে? তখন আমি ১৬-১৭ বছরের যুবক। পরিবার থেকে কাজে যুক্ত হওয়ার তাগিদ। একপর্যায়ে তাগিদ বেড়ে গেলো। তখন চিন্তা করলাম, আমি তো শ্রমিকের রাজনীতি করি, কাজে যদি যুক্ত না হই, তাহলে শ্রমিকের রাজনীতির কি কোনো মানে থাকে? এখন আর কারো তাগিদ নয়, নিজের রাজনৈতিক জানাবুঝার তাগিদ থেকে শ্রমিকের কাজে যুক্ত হলাম।’ –বিপ্লবী জসিমউদ্দিন মণ্ডল
ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বৈষম্য এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন জসিমউদ্দিন মণ্ডল। ১৯৪০ সালে মাসিক ১৫ টাকা মাইনেতে রেলের চাকরি নেন জসিমউদ্দিন মণ্ডল। চাকরির ওই বছর তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪১-৪২ সালের দিকে তিনি রেলের চাকরিতে প্রমোশন পেয়ে সেকেন্ড ফায়ারম্যান হন।
১৯৪২ সালে মরিয়মের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার স্ত্রী তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ জুগিয়েছেন সারাজীবন। তাদের পরিবারে পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলে জন্ম নেয়।
১৯৪৯ সালে ‘খুদ স্ট্রাইকের’ অপরাধে জসিমউদ্দিন মণ্ডল, দেলওয়ার, হামিদ আর রুহুলসহ মোট ছ’জনের নামে হুলিয়া জারি হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৫৪ সালে তিনি মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পর আবার তাঁকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হলো। এসময় রাজশাহী জেলে কিছুদিন থাকার পর তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বদলি করা হল। ১৯৫৬ সালে তিনি মুক্তি লাভ করেন। ১৯৬২ সালের দিকে আবার গ্রেপ্তার হলেন তিনি এবং ১৯৬৪ সালের দিকে মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতা চলে যান। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের সার্বিক মুক্তির লড়াই-সংগ্রামের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশেও তাঁকে জেল বরণ করতে হেেছ।
‘১৯৭৩-এ আমি যখন মস্কোতে যাই মানুষের মধ্যে যে অপরিসীম গতিময়তা দেখেছি, সমাজতন্ত্রের প্রতি যে অবিচল আস্থা লক্ষ্য করেছি সেটা মেকি বলে মনে হয়নি। তা হলে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সোভিয়েত সমাজের এই অবক্ষয় কি করে হলো, আমি ভাবতেও পারি না। আমার তো মনে হয়, সোভিয়েত জনগণের বর্তমানে সেই কবিতায় উচ্চারিত কথার মতোই অবস্থা হয়েছে, ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ও পারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস।’ হয়ত খোলা হাওয়ার প্রতি তাদের আস্থা হারাতেও বেশিদিন লাগবে না।’
তিনি ১৯৯৩ সালে সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে সিপিবি’র উপদেষ্টা মনোনীত হন। আমৃত্যু এ দায়িত্ব তিনি পালন করেন।
কমরেড জসিম মণ্ডল বাংলাদেশ রেল শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সহসভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা ছিলেন।
৬ আগস্ট ২০১৫, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অফিসের ছাদে বিপ্লবী জসিমউদ্দিন মণ্ডলের সাক্ষাৎকার আকারে জীবনী সংগ্রহের সময় তিনি বলেন,
‘আমার একটা ইচ্ছা হলো– ক্ষুদিরামের একটা মঞ্চ বানাবো। ক্ষুদিরামের ফাঁসির মঞ্চ–আমার বাড়ির সামনে। বাড়িতে ঢোকার পথে। ওই মঞ্চের বেদিতে বিপ্লবীদের নাম লিখে রাখবো। আর আমি যদি মরে যাই, তাহলে তুমি (শেখ রফিক) বানাবা। এটা তোমার কাছে আমার দাবি’।
‘একজন কমিউনিস্টকে ‘মানুষ’ হতে হয়। যে ‘মানুষ’ না সে কমিউনিস্ট হতে পারে না। নামের মানুষ তো সবাই। কামের (কাজ) মানুষ ক’জন! কমিউনিস্ট ক’জন! মানুষের মানবিক গুণাবলি থাকলেই সে ‘মানুষ’ হয়। কিন্তু কমিউনিস্ট হতে গেলে তার আরো বেশি গুণের দরকার হয়।
ইচ্ছে করলে মানুষ যে কেউ হতে পারে। কিন্তু সবার পক্ষে কমিউনিস্ট হওয়া সম্ভব না। কমিউনিস্ট হতে হলে তাকে সর্বক্ষেত্রে কমিউনিস্ট হতে হয়। তার চাল-চলন-কথাবার্তা-আচার-আচরণ-পোশাক-আশাক-ত্যাগ-তিতিক্ষা সবকিছুতে কমিউনিস্ট হতে হয়। তাকে দেশপ্রেমিক হতে হবে, কষ্ট করতে হবে, জেল খাটতে হবে। বিপ্লবের সময় আপনজনের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে। যেমন কমিউনিস্ট পার্টির বহু নেতা ৩০, ২০, ১৫ বছর জেল খেটেছে। আমি নিজেও ১৭ বছর জেল খেটেছি। ১৫ বছর জেল খাটা বহু লোক পার্টিতে আছে– যেটা অন্যকোনো পার্টিতে নেই। সমাজে বহু মানুষ রয়েছে। তাদের জীবনেও সে ইতিহাস নেই।
একজন কমিউনিস্টকে সবসময় মানুষের সার্বিক মুক্তির আন্দোলনে নিয়োজিত থাকতে হয়। শ্রেণিচেতনার ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। কথা ও কাজে মিল রেখে চলতে হয়। সবকিছুতেই সাধারণের স্বার্থ দেখে তাকে কাজ করতে হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণিচেতনা ধারণ করে কমিউনিস্ট হওয়া তো দূরের কথা মানুষও হওয়া যায় না! কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের পার্টি এখনও মধ্যবিত্ত শ্রেণির পার্টি। এটা কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের কমিউনিস্ট পার্টি হয়ে উঠতে পারেনি। নেতৃত্বেও তাই। যতদিন না এই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে ততদিন এভাবেই চলবে।’
অনলবর্ষী বক্তা কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল ২ অক্টোবর, ২০১৭ ঢাকার হেলথ এন্ড হোপ হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক