বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও প্রাসঙ্গিক কথা
Posted: 05 অক্টোবর, 2025
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস, দিবসটিতে শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব কর্তব্য ও অধিকারের বিষয়টি নিয়ে কথা বলার দিন। প্রতিবারের মতো এবারও দিবসটি পালিত হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বাংলাদেশে তৃতীয়বারের মতো সরকারিভাবে দিবসটি পালিত হচ্ছে, তবে দুর্গা পূজার ছুটির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ থাকায় দিবসটি পালনে কিছুটা হলেও ছন্দ-পতন ঘটবে।
ইউনেস্কো প্রতিবারই দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। এছর দিবসটির প্রতিপাদ্য করেছে, “Recasting Teaching as Collaborative profession”। যার বাংলা করা হয়েছে, শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুণর্গঠন- যা শিক্ষক, বিদ্যালয় এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার- মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি করে।
১৯৯৪ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ সভায় ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দ্বিতীয় জন্মদাতা অথবা জাতি গড়ার কারিগর বলে বিবেচিত শিক্ষক সমাজের মান-সম্মান-ইজ্জ্বত ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার চিন্তাভাবনা থেকে দিবসটি পালনের উদ্যোগ। শিক্ষার অধিকার মানবিক এবং মৌলিক, বিষয়টি বিবেচনায় এবং জাতিসংঘের ঘোষণা বাস্তবায়নে ১৯৬৬ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃসরকার সম্মেলনের সুপারিশ থেকে বিশ্বের সকল শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা, সকল রাষ্ট্রের উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়ন, মানব সম্পদের পরিপূর্ণ বিকাশে সহায়ক কর্মসূচিতে স্বাক্ষর করেন জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেস্কো) মহাপরিচালক ও সম্মেলনের সভাপতি। সম্মেলনে যোগদানকারি সরকার প্রধান বা তাদের প্রতিনিধিরা সেটাতে স্বাক্ষর করেন এবং বাস্তবায়নের অঙ্গিকার করেন।
সে সম্মেলনে গৃহিত সুপারিশের মধ্যে প্রধান বিষয়গুলি ছিল- শিক্ষকদের মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিতকরণ, মাধ্যমিক স্তরে সরকারি-বেসরকারি সবার জন্য স্তর নির্বিশেষে শ্রেণি বৈষম্যহীন একই শিক্ষা নীতিমালা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন, পদোন্নতি, পেশাগত আচরণ ভঙ্গের শাস্তি, নারী শিক্ষকদের জন্য কর্মপযোগী পরিবেশ, শিক্ষকদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিধান। ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ২৬ ধারায় জাতিসংঘভুক্ত দেশগুলিতে সবার জন্য প্রাইমারি ও ইলিমেন্টারী শিক্ষা নিশ্চিত করবে, মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাবে আর মেধারভিত্তিতে উচ্চ শিক্ষায় সবার জন্য অর্থায়ন করবে।
সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে (২০০০-২০১৫) মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল এর ৮টি বিষয়ের মধ্যে ২ নম্বরে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য সরকারি বেসরকারি ও এনজিও স্কুলের মাধ্যমে সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য এসডিজিস (২০১৫-২০৩০) এর ৪র্থ নম্বরে কোয়ালিটি, ইনক্লুসিভ ইক্যুইটি এবং লাইফলং এডুকেশন বাস্তবায়নে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
কাজগুলি বাস্তবায়নে নিয়োজিত শিক্ষকদের দক্ষতা, আন্তরিকতা, সামাজিক মর্যাদা আর অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু এর কোনটিই নিশ্চিত হয়নি। প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষকের চাকরি শুরু হয় ৯ হাজার ৭০০ টাকার স্কেলে ১৫ হাজার টাকায়, প্রধান শিক্ষকদের ১০ গ্রেড বা ১৬ হাজার টাকা বেতন পেতে উচ্চ আদালতে যেতে হয়েছে। আর মাধ্যমিক স্তরে ১২ হাজার ৫০০ টাকার স্কেলে, ১০০০ টাকার মাসিক বাড়ি ভাড়া আর ৫০০ টাকার মেডিকেল সুবিধা দিয়ে ১১ হাজার ৭৫০ টাকার (১০ ভাগ কর্তনের পর) মাসিক বেতন দিয়ে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা উৎসব বোনাস পান মূলবেতনের ২৫ শতাংশ এবং কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ, আন্দোলনের কারণে উৎসব বোনাস ২৫ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ হলেও বাড়ি ভাড়া টাকার পরিবর্তে শতকরায় আসেনি।
অবসর ও কল্যাণ তহবিলের কর্তনকৃত টাকা অবসরে যাওয়ার ৩-৪ বছরেও শিক্ষক-কর্মচারীরা পাচ্ছেন না। অবসরে যাওয়ার পর কাগজ-পত্র জমা হওয়ার ৬ মাসের মধ্যে তাদের পাওনা পরিশোধে উচ্চ আদালদের নির্দেশনা থাকার পর এ সমস্যার সমাধান হয়নি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী, গভর্নিংবর্ডির সদস্যদের শিক্ষকদের পিটিয়ে হত্যা, হামলা, গলায় জুতার মালা পরানোর মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছিল, এই সকল ঘটনার কোনো প্রকার বিচার না হয়নি। তার ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ঢালাওভাবে শিক্ষকদের উপর নির্যাতন, আইন বহির্ভূতভাবে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে- শিক্ষকরা মর্যাদাহানীর শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় গভর্নিংবডিতে সভাপতি হিসেবে দলীয় লোকের অংশগ্রহণ বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করেছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সৃষ্ট মনস্তাত্তিক দূরত্ব পাঠদান কাজের সংকটের বিষয়টি নতুন সমস্যা হিসেবে সামনে আসছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলি বাস্তবায়নে নীতি নির্ধারকদের যথেষ্ট আন্তরিকতা যেমন দরকার সেইসাথে আর্থিক বরাদ্দও প্রয়োজন, সেটা বিবেচনা করেই সংস্থাটি প্রত্যেক দেশকে তাঁর দেশের জিডিপির ৭% শিক্ষাখাতে ব্যয় করার তাগিদ দিয়েছিলো, যদিও তা কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশে ড. কুদরতই খুদার শিক্ষা কমিশন জিডিপির ৫ শতাংশ, পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ এবং ১০ বছরের মধ্যে শিক্ষাকে সরকারিকরণের তাগিদ দিয়েছিল, সেটাও কার্যকর হয়নি।
২০০৬ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকার-সম্মেলনে ইউনেস্কোভূক্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শিক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে আপাতত জিডিপি’র ৬ শতাংশ ব্যয় করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও তা কার্যকর হয়নি। এছাড়া ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইন্চনে এসডিজিস এর সম্মেলনে দ¦াদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার ব্যয় সরকার বহন করবে বলে সম্মতি জানিয়ে ছিলো, সেটাও বাস্তবায়িত হয়নি।
শিক্ষাখাতে বরাদ্দকৃত টাকার অংক কিছুটা শতাংশে বাড়লেও টাকার অবমূল্যায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে তার সুফল তেমন পাওয়া যায়নি। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৭ শতাংশ, ৬ শতাংশ ও ৫ শতাংশ বরাদ্দে বিভিন্ন সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেখানে বরাদ্দ ২.৪ শতাংশের উপরে ৫৩ বছরে কখনও উঠেনি। এসডিজিসএর আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে (২০১৫-২০৩০) কোয়ালিটি ইক্যুইটি ইনক্লুসিভ এবং লাইফলং এডুকেশন এবং মাধ্যমিক স্তরে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের বাস্তবায়ন করতে হলে পরিকল্পনা কমিশনের হিসেব মতে জিডিপির ৪.৪ শতাংশ টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করার পরে শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ ছিলো জিডিপির ১.৬৭ ভাগ। তবে ইতিবাচক খবর এই যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব বোনাস ২৫ ভাগের জায়গায় ৫০ ভাগ হয়েছে।
আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও সক্ষমতায় বাংলাদেশের কাছাকাছি এমনকি দুর্বল অনেক দেশও শিক্ষাখাতে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় করছে। শিক্ষাখাতে ভূটান ৪.৮, মালদ্বীপ ১১.২০, ভারত ৩.১ শতাংশ আর বাংলাদেশের অবস্থান ১.৬৭ (২০২৪/২৫)। বাংলাদেশের শিক্ষা ও শিক্ষকদের অবস্থান বিশ্বায়নের বিবেচনায় খুবই দুঃখজনক। দেশের ৯০ ভাগ শিক্ষা এখনও পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার মাধ্যমে। বাকী ১০ ভাগ সরকারি এবং প্রাইভেট শিক্ষার মাধ্যমে।
প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সেই কলংক এখনও শেষ হয়নি, পারফরমেন্সভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থা নেই, সময়ভিত্তিক পদোন্নতি এবং সারা চাকুরি জীবনে দুটির বেশী পদোন্নতি নেই, ফলে এ পেশায় মেধাবীদের অংশ গ্রহণ যেমন কম তেমনি পেশাগত মান বৃদ্ধির চেষ্টাও কম, ফলে কোয়ালিটি শিক্ষা বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি হচ্ছেনা।
শিক্ষক সংগঠনের অবস্থান : বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঐতিহাসিক ঘোষণা এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষকরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছে। তবে দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে স্বাধীন পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে বৃহৎ আন্দোলন সেই অর্থে হয়নি। জোটগত দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে থেকে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ নিয়ে এমপিওভূক্ত হয়ে বর্তমানে মূলবেতনের ১০০ ভাগের অধিকারী হয়েছেন। বাড়িভাড়া ১০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব বোনাস মূলবেতনের ২৫ ভাগ ও ১টি পদোন্নতির শিকলে আটকে আছেন। কোন কারণে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বকেয়া হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া বকেয়া পাওনা পাওয়া যায় না।
গভর্নিংবডি দলীয়করণ হওয়ায় সামাজিক মর্যাদায়ও শিক্ষকরা পিছিয়ে, এ অবস্থা থেকে শিক্ষক সমাজ মুক্তি পাওয়ার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার জাতীয়করণ, পৃথক নিয়োগ কমিশন, বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি চান। শিক্ষকরা শুধু ট্রেড ইউনিয়নের জায়গা থেকে তাদের ভূমিকা পালন নয়, জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে, দক্ষ, যোগ্য মানবসম্পদ তৈরিতে অবদান রাখতে চান। তাদের দিয়ে এই কাজগুলো করে নিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে, শিক্ষকদের একাডেমিক ফ্রিডমের আওতায় কারিকুলাম সিলেবাস প্রণয়ন পাঠদানের স্বাধীনতা প্রদান, শিক্ষা কাজের বাইরে অন্য কাজে যুক্ত না করাসহ পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিতকরণের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও রাজনীতিমুক্তকরণ নিশ্চিত করা এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য শিক্ষায় অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। ইউনেস্কো এবং সংবিধানের শিক্ষা প্রসঙ্গে সরকার যে অঙ্গীকার করেছেন তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষার মান বৃদ্ধিসহ বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য রক্ষা করা সম্ভব।
সেইসাথে আন্তর্জাতিক ডিকক্লারেশনে স্বাক্ষরকারী দেশ যাতে তা বাস্তবায়ন করে, সে বিষয়ে ইউনেস্কোর তদারকি থাকা দরকার। বিশ্বব্যাপী শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বৃদ্ধি পাক সেই সাথে শিক্ষক সমাজ ক্লাসরুমের পাঠদান কার্যক্রমসহ বস্তুনিষ্ঠভাবে দেশ জাতি ও দক্ষ মানুষ গড়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
তিনি অধিকার যেমন ভোগ করবেন সেইসাথে দায়িত্বও পালন করবেন সে জন্য দরকার জীবন্ত শিক্ষকের, বিদ্যালয়ের ভালো পরিবেশ এবং শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে আন্তঃসম্পর্কের উন্নয়ন হবে, সেই প্রত্যাশা সবার।
লেখকঃ অধ্যক্ষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি