নারীর অভিধান থেকে ‘না’ শব্দটি মুছে
ফেলার দায়িত্ব নারীকেই নিতে হবে
Posted: 05 অক্টোবর, 2025
অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০২২ সালে ইরানের নীতি পুলিশ হিজাবের ফাঁক দিয়ে ক’গাছি চুল বেরিয়ে থাকার অপরাধে বাইশ বছরের নারী মাশাহ আমিনিকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করে মেরে ফেলেছিল। পোশাকের স্বাধীনতা চেয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সেদিন ইরানের রাজপথে নেমে এসেছিল।
আমরা দেখেছি, ২০২১ সালে ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নারীদের অবস্থা সংকটাপন্ন হতে থাকে। তালেবানেরা মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা নিষিদ্ধ করেছে। আফগানিস্তান বিশ্বে একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষা গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নারীদের কাজ করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। নারীদের জনসমাগমস্থলে যাওয়া খেলাধুলা করা বা বিউটি সেলুনে যাওয়া নিষিদ্ধ। বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় তাদের মুখ ও শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে হয় এবং একা চলাফেরা করতে দেয়া হয় না। এ সমাজে নারীকে পাথর মেরে বা বেত্রাঘাত করার মত শাস্তির বিধান রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট মতে শতকরা আশিভাগ আফগান নারীর জোরপূর্বক বিয়ে হয়। তালেবান সরকারের নারীবিদ্বেষী এ সকল আইনের কারণে অনেক নারী দেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্যদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
অবিভক্ত ভারত থেকে আজকের বাংলাদেশ; নারী বারবার তাঁর শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। দাস সমাজ থেকে আজ পর্যন্ত নারীর পথচলা কখনো সরল পথে অগ্রসর হতে পারেনি। প্রাচীন ভারতের সময় থেকে একুশ শতক এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে নারীর বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন শাস্ত্র, সামাজিক বিধান ও আইন। প্রাচীনকালের অমর্যাদাকর অবস্থান থেকে আজকের সময়ে নারীর জীবনে কিছুটা মুক্তি মিললেও সমমর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রশ্ন নারীর অভিধানে এখনও অধরা।
সমাজ প্রগতির ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় প্রাগ-আর্যদের সমাজ ও সভ্যতা উন্নততর ছিল। প্রাগ আর্য সমাজ ছিলো মাতৃতান্ত্রিক। আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা সম্মান পেয়েছে। নারীর মাতৃত্ব পেয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এশিয়া উপমহাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় মাতৃতন্ত্র থেকে পিতৃতন্ত্রে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় আর্যদের হাতেই। শুরু হলো দাস সমাজ ব্যবস্থা। সেই থেকে আজও পর্যন্ত নারী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
নারীকে নানা কৌশলে অবদমন করে চলেছে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবার। নারীর দেহের ওপর তার যে অধিকার রয়েছে তা মেনে নেয়নি বৈদিক শাস্ত্র। অন্যান্য ধর্মেও নারী সম্পর্কিত ভিন্ন ভিন্ন নিন্দা বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। আজও পর্যন্ত কী শাস্ত্রীয় বিধান, কী সমাজ বা রাষ্ট্র কারও কাছ থেকে নারীরা পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদা পায়নি। যত আইন-কানুন-সংস্কার সবই কেনো না কোনোভাবে নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
এ ভূখণ্ডের সামাজিক বাস্তবতায় দেখা গেছে নারী-পুরুষের সমতার প্রশ্নে সকল ধর্ম মতই নারী শিক্ষা, নারীর অধিকার বিষয়ে রক্ষণশীল আচরণ করেছে। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলসমূহও নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করতে আগ্রহ দেখায়নি। নারীর সাথে ‘না’ শব্দটির শত্রুতা যেন শেষ হবার নয়। নারীকে সম্পত্তিতে সমানাধিকার দেয়া যাবে না, নারীকে খেলতে দেয়া যাবে না, নারীকে অভিনয় করতে দেয়া যাবে না, নারীকে গাইতে-নাচতে দেয়া যাবে না, নারীকে আয়-রোজগার করতে দেয়া যাবে না, রাজনীতি করতে দেয়া যাবে না, পার্লামেন্টে সমান সুযোগ দেয়া যাবে না ইত্যাদি।
আমরা দেখছি উনিশ শতক থেকে নারী তার অধিকারের জন্য সোচ্চার হয়েছে। নারী তার যোগ্যতা দিয়ে বার বার প্রমাণ করেছে লিঙ্গীয় পরিচয় মানুষের প্রধান পরিচয় নয়। নারীরা চাইলে সকল কাজই করতে পারে। তবে একথাও ভুলে গেলে চলে না ধর্মের নানা সহজিয়া ধারার মত নারীকে বহুভাবে তার যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ করে দিয়েছে। প্রগতিশীল পুরুষ সহযাত্রীর হাত ধরে নারীরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে। সব ধরনের শিক্ষা ও পেশায় নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। পরিবারের সহযোগিতায় খেলাধুলায় অংশ নিয়ে নারীরা দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছে। তা সত্ত্বেও ‘না’ শব্দটি কিছুতেই যেন নারীর পিছু ছাড়ছে না।
এদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল নারী সমাজ। স্বাধীনতার পরে প্রথম সংবিধানে নারীদের সমানাধিকারের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। কিন্তু যারা ক্ষমতায় গেছে কেউ কথা রাখেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ গ্রামেগঞ্জে বিভিন্ন মাজারে হামলা, ওরসে হামলা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু হামলা, ডাকাতি, দখল, লুটপাট, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। যে কোনো গণঅভ্যূত্থানের পর সুযোগসন্ধানী দুর্বৃত্তশ্রেণির মানুষেরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। এর সাথে চলছে ধর্মকে ব্যবহার করে নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা।
বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মধ্যে নারী সংস্কার কমিশন একটি। নারী সংস্কার কমিশন নারীদের বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে কয়েকটি ধাপে বেশ কিছু সুপারিশ সন্নিবেশিত করে যখন তাদের রিপোর্ট জমা দিল তখন কিছু মানুষ ধর্ম গেল-গেল বলে নগ্ন-অশ্লীল কায়দায় নারীদের ওপর হামলে পড়লো। নারীকে অধিকার দিলেই নাকি পাপাচারে দেশ ভরে উঠবে। দেখে শুনে মনে হয় নারীদের অপমান-অপদস্ত-হেয় বা ছোট করার মধ্যেই ‘পুরুষতন্ত্রের হ্যাডম’ লুকিয়ে থাকে।
বাংলাদেশ তো কোনো ধর্মীয় প্রজাতন্ত্র নয়, এখানে কোনো নায়েবে আমির বা মহাপ্রভু বা ধর্মগুরু রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন না। তাহলে বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা এমন রক্ষণশীল ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হলো কীভাবে!
আমাদের দেশের আইন আদালত নাগরিকদের সমানাধিকারের কথা বলে। কিন্তু বাস্তবে দেশের প্রশাসন থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি, পরিবার থেকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কোনোকিছুই নারীর স্বাধীনতা ও পূর্ণ বিকাশের পক্ষে নয়। আজও পর্যন্ত আমাদের পরিবার ও সমাজ পুরুষের অনুগত এবং নারীর স্বাধীনতা, সম্মান ও অধিকারের প্রশ্নে নেতিবাচক। সমাজ ও পরিবারে ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপিত হয় কেবল নারীর ক্ষেত্রে। পুরুষতন্ত্র ধর্ম রক্ষার নামে নারীকে ছোট করা, আঘাত করা, অসম্মান করা, তার চাল-চলন, শিক্ষা, পোষাক, চাকরিজীবন, ব্যক্তিজীবন সবকিছুকেই গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা করে।
অথচ বছরের পর বছর এদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সরকারি এমন কোনো সেবা সংস্থা পাওয়া যাবে না যেখানে ঘুষ ছাড়া কার্যসিদ্ধি হয়। চর দখল, নদী-পাহাড়-বন দখলকারীর অভাব নেই। সরকারি বিভিন্ন পদে থেকে সাধারণ মানুষের গচ্ছিত টাকা থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংক ফাঁকা করে পাচার করে দিয়েছে এদেশের ক্ষমতাসীনেরা। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দাপটে ও কারসাজিতে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন, নাভিশ্বাস উঠেছে এদেশের খেটে খাওয়া কোটি কোটি মানুষের। কৃষক কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না। এ সবই অন্যায় কাজ এবং কোনো ধর্মই এই অবস্থাকে অনুমোদন দেয় না। কিন্তু এ নিয়ে ধর্মকে যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তাদের টুঁ শব্দটি নেই। এখনও পর্যন্ত হাসিনা সরকারের দুর্নীতি-দুঃশাসনের ফিরিস্তি জেনেও অধিকাংশ নাগরিক ও এসব গোষ্ঠী মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। তারা পুরুষত্ব দেখাচ্ছেন কেবল নারীর ওপরে। এরা ধর্ম রক্ষার নামে কথায় কথায় মাদ্রাসার ছাত্রদের ব্যবহার করে, ধর্মীয় পোষাক পরে জমায়েতের কেন্দ্র হিসেবে মসজিদের মতো পবিত্র ধর্মীয় উপাসনালয় ব্যবহার করে।
নারীদের খেলাধুলা থেকে শুরু করে যে কোনো ধরণের সৃষ্টিশীল কাজের বিরোধিতায় পুরুষতান্ত্রিক ধর্মান্ধগোষ্ঠী সবসময় তৎপর থাকে। তারা এটা বুঝতে চায় না দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর সকল ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশের যে কোনো ক্রান্তিকালে নারীরা তাদের সর্বোচ্চ শক্তি সাহস ও প্রজ্ঞা নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়। ২৪ এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যূত্থানের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এতো বড় গণঅভ্যূত্থানের পরে নারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আন্দোলনের সময় নারীদের যতটা মূল্যায়ন করা হয় আন্দোলন শেষ হলে তাদের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়া হয়। এভাবে চলতে পারে না।
সিডও সনদে সংরক্ষিত দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ তুলে নেয়ার জন্য এদেশের প্রগতিশীল নারী সমাজ বহুকাল যাবৎ তাগাদা দিয়ে আসছে। কিন্তু কোনো সরকারই তা আমলে নেয়নি। আমরা জেনেছি এ বছরেও সিডও সনদে সংরক্ষণ রেখেই বাংলাদেশ আলোচনায় অংশ নিতে গেছে। যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
কিছু মানুষ বরাবরই নারী প্রগতিকে ভয় পায়, নারীর চিন্তাশীলতা-বুদ্ধিমত্তাকে আটকে রাখতে চায়, নারীর স্বাধীনতা ও অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করে অরাজকতা তৈরি করার চেষ্টা করে থাকে। বস্তুত তারা এ কাজ করে নিজেদের স্বার্থে।
বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা বহুমাত্রিক সামাজিক বন্দোবস্তের। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার স্বার্থে ঐ সকল গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে নারীদের বারবার লক্ষ্যবস্তু করতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সে সময় আমরা পেছনে ফেলে এসেছি। এখন একটি বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ গঠনের আলোচনা জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। কোনো গোষ্ঠী চাইলেই তাদের মতামত চাপিয়ে দেবে এটা হতে পারে না। জুলাই অভ্যূত্থান স্পষ্টভাবেই সে বার্তা দিয়েছে। স্বৈরশাসন বিদায়ের পর কেউ যদি ভাবেন তারা স্বাধীন অর্থাৎ বাধাহীনভাবে যে কোনো স্বেচ্ছাচারী কাজ করবেন তাহলে সেটা খুব ভুল হবে। স্বেচ্ছাচারিতা এ সমাজ কখনও মেনে নেয়নি। সরকারের উচিত হবে এ ধরণের অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমাজে নারীর পক্ষে সুস্পষ্ট বার্তা দেয়া।
আমাদের মনে রাখা দরকার যারা নারীদের সবকাজেই ‘না’ জুড়ে দেন তারাও এ সমাজের মানুষ। একুশ শতকে এসে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে প্রচার মাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার সময়ে কেন তারা এ আচরণ করছেন। এটা কী কেবলই দৃষ্টিভঙ্গিগত, নাকি রাজনৈতিক, নাকি অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে তা অনুসন্ধান করা দরকার। সাথে সাথে যারা ভাঙচুরের মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনা সরকারের জরুরি কর্তব্য।
এ অবস্থা পরিবর্তনে প্রথমত সোচ্চার হতে হবে নারীকেই। পূর্বসূরিদের হাতে হাতে রেখে একুশ শতকের নারীর অভিধান থেকে ‘না’ শব্দটি মুছে ফেলতে নারীকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি এ কাজে নিশ্চয়ই সহযাত্রী হবেন।