ক্লারা জেটকিন লাল সালাম

Posted: 13 মার্চ, 2016

মনীষা চক্রবর্ত্তী: শ্রেণি সংগ্রামের লড়াইয়ে নারী নেতৃত্বের এক অসাধারণ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী কমরেড ক্লারা জেটকিন। ১৮৫৭ সালের ৫ জুলাই জার্মানির ছোট গ্রাম সাক্সসনায় তার জন্ম। পিতা গটফ্রেড আইজেনার ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও ধর্মপ্রাণ প্রোটেসস্ট্যান চার্চ সংগঠক ও দক্ষ বেহালা বাদক। মা জোসেকিন ভেইটালে আইজেনার একজন সুশিক্ষিত প্রগতিশীল নারী। এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই ক্লারা জেটকিন বেড়ে উঠেন। একদিকে পিতার সঙ্গীত চর্চার পাশাপাশি মায়ের পুঁথি চর্চা তার মনোগজতে এক উন্নত ক্ষেত্র তৈরি করে। স্কুল কলেজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি পাঠ করেছেন যে সকল বই তার মধ্যে রয়েছে বায়রন, ডিকেন্স, সেক্সপিয়র, শিলার, গ্যাটে, হোমার সহ আরও অনেকে। ১৮৭৪ সালের দিকে জার্মানির নারী আন্দোলন ও শ্রম আন্দোলনের সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সভ্য হবার যোগ্যতা অর্জন করেন। ওই সময়ে তিনি রাশিয়ান বিল্পবী ওসিপের সাথে পরিচিত হন। প্রেম, বিশ্বাস ও ভালবাসার এক আবেগঘন মুহূর্তে উভয়ে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের প্রথম সন্তান ১৮৮৩ সালে জন্ম নেয় ম্যাক্সিম জেটকিন। ২য় সন্তান ১৮৮৫ সালে কোনস্টাইনটিন জন্ম নেয়। পারিবারিক জীবনে অনেক অভাব-অভিযোগ রোগ-ব্যাধি সবকিছুই তিনি ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে মোকাবিলা করেন। একদিকে সংসার অন্যদিকে দেশ ও জাতির মুক্তি আন্দোলন। উভয় ক্ষেত্রেই তার দায়িত্ববোধ সমান্তরাল পর্যায়ে চালিয়ে গেছেন। ১৮৮৯ সলে দীর্ঘদিন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ওসিপ জেট জেটকিন মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৯০ সালে পার্টির নতুন নাম হয় সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জার্মান। স্বামীর মৃত্যুর শোক উপেক্ষা করে তিনি সেই পার্টির কাজে এগিয়ে আসেন। এ সময়ে সহযোদ্ধা হিসেবে যাদের কাছে পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন- রোজা লুক্সেমবার্গ অন্যতম। ক্লারা ও রোজার মিলিত কর্মকাণ্ড নারী আন্দোলন ও শ্রমজীবী জনতার মুক্তি আন্দোলনকে আরও বেগবান, সুদূর প্রসারী ও সমগ্র দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এছাড়া প্যারিসে অবস্থানকালে আরও দুই মহান ব্যক্তিত্বকে কাছে পান। একজন মার্কস তনয়া লরা ও তার স্বামী পল গ্রাফার। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত হয় তার পত্রিকা ‘ইকুয়েলিটি’ বা ‘সমতা’। ক্লারার সম্পাদনায় পত্রিকাটি প্যারিসের নারী জাগরণের ক্ষেত্র অসামান্য অবদান রাখে। যেই পত্রিকার মাধ্যমে শুধুমাত্র জার্মান নয়, সমগ্র বিশ্বের নারী সমাজ সমাজতন্ত্র বির্নিমাণের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং এক বৈপ্লবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র কোনস্টাইনটেন সমতা পত্রিকা প্রকাশনায় মাকে সহযোগিতা করেন। ১৮৯১ হতে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ পত্রিকার সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১০ দালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নারীদের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করে প্রস্তাব রাখেন, প্রতি বছর ‘৮ মার্চ’ বিশ্বের সকল দেশের নারীসমাজ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালন করবে। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো আন্দোলন করা যাবে না বলে যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় তিনি তার প্রতিবাদ করেন। ১৯১৫ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করেন। বুদ্ধিবৃত্তিক সৃষ্টিশীল চর্চার মধ্য দিয়েও সমাজের ভেতর যে একটা সংস্কৃতিগত প্রগতিশীল রূপান্তর আনা যেতে পারে সে ব্যাপারেও ক্লারা জেটকিন বেশ সচেতন প্রয়াস নিয়েছিলেন। ১৮৯১ সালে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হল ‘ইকুয়েলিটি’ বা ‘সমতা’ নামক নারীদের একটি পত্রিকা। ওই পত্রিকার মাধ্যমেই ক্লারা নারীদের সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করার পাশাপাশি তাদের ন্যায্য অধিকারের লড়াইগুলোর নানান বিশ্লেষণ ও সমাজে তার প্রভাবে সুফলগুলো প্রচার করতে থাকেন। এই পত্রিকা সমগ্র জার্মানসহ সারা বিশ্বের নারীদেরকে এক সমাজতান্ত্রিক সমতার পৃথিবী গড়ার স্বপ্নে একত্রিত ও অনুপ্রাণিত করতে থাকলো। অধিকারের জন্য লড়াই করার প্রেরণা হয়ে উঠেছিল মুখপত্রটি। নারী ভোটাধিকারের লড়াইও তখন সমান তালেই চলছিল তার নেতৃত্বে। এই সকল সংগ্রামী কাজের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে অনেক বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ১৯০৭ সালে আয়োজিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। এর পরবর্তীতে ১৯১০ সালে কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রী নারী সম্মেলনে নারীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এবং নারীমুক্তি ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রামকে আরও শক্তিশালী করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যে ক্লারা জেটকিনই ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব করেন। জেন্ডার বিভাজন তৈরির জন্য নয়, নারীদের যে সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে সেটিকেই তুলে ধরে এবং প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছেন এবং সে লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল মেহনতি মানুষের মুক্তির সাথে নারীরমুক্তিও যে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত সেই বার্তা ও সংগ্রামকে ছড়িয়ে দিতে আজীবন লড়েছেন সুদৃঢ়ভাবে। ১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব জার্মান গঠিত হলে তিনি তার সাথে যুক্ত হন। ১৯২০ সালে তিনি কমরেড লেনিনের ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে নারীর ভূমিকা ও তার শ্রেণি সংগ্রাম এবং নারীমুক্তি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করেন। উত্তরও পেয়েছেন যথাযথ। ১৯৩২ সালে প্রবীণ সদস্য হিসেবে রাইখস্ট্যাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এডলফ হিটলার ক্ষমতায় এলে পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। তিনি তখন ১৯৩৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে চলে যান। ১৯৩৩ সালের ২০ জুন তিনি মস্কোতে মৃত্যুবরণ করেন। মস্কোর ক্রেমলিনে তাঁকে সমাহিত করা হয়।