বাজেটে উন্নয়নের মূলশক্তি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী যেন উপেক্ষিত না হয়

আবিদ হোসেন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শাসক শ্রেণি এদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা শ্রমজীবী মানুষকে উপেক্ষা করে পুঁজিপতি ব্যবসায়ী ধনিক শ্রেণির স্বার্থকেই রক্ষা করে সবসময়। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের নামে দেশের শাসনব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টে ফেলার প্রতিযোগিতায় শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও এদেশের শ্রমজীবী মানুষ বরাবরের মতো বর্তমানেও উপেক্ষিত। যেকোনো রাজনৈতিক দলের দর্শন বা মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে সেই দল সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্র পরিচালন-পদ্ধতি। জাতীয় সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধীদল মিলে দেশের বিস্তর আলাপ-আলোচনা হলেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্য অধিকার, শিক্ষার অধিকার, নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা, জননিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তার আলাপ একেবারেই অনুপস্থিত। অর্থনীতিতে কোনো খাতের গুরুত্ব কতখানি, তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। টমাস মান (Thomas Mun: ১৫৬১-১৬৪১) ও অ্যান্তোনিও সেরার (১৫৮০-১৬৫০) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘বণিকবাদের’ (Mercantilism) ধারণায় রফতানি বাণিজ্যকে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হতো। কোনো একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী হতে হলে কৃষির পরিবর্তে বাণিজ্য ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মাত্র ২২ বছরের জন্য (১৭৫৬-১৭৭৮) ফ্রান্সে ‘ফিজিওক্রাট’ নামে আরেকটি দলের আবির্ভাব ঘটে। ফ্রান্সিস কুনে (১৬৯৪-১৭৭৪) ও টারগট (১৭২৭-১৭৮১) ছিলেন এই মতবাদীদের স্থপতি। তাদের মতে, কৃষিই হলো একমাত্র উৎপাদনশীল খাত। কৃষির বাইরে শিল্প ও ম্যানুফ্যাকচারিং হলো ‘বন্ধ্যা’ (Sterile)। একমাত্র কৃষিই পারে উদ্বৃত্ত তৈরি করতে। ১ কেজি ধান থেকে ৫০০ কেজি ধান উৎপাদন করা সম্ভব, যা আর কোনো খাতে সম্ভব নয়। যদি পরিমাণের কথা বিবেচনা করি, তাহলে ফিজিওক্র্যাটদের যুক্তি অকাট্য। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতি মতবাদের প্রবক্তা এডাম স্মিথ (১৭৭৩-১৭৯০) ডাক্তারি পেশা, বিচারকের কাজ কিংবা অভিনয়কে ‘অনুৎপাদনশীল’ বলে বিবেচনা করেছেন। তারই উত্তসূরি জেবি সে (১৭৬৭-১৮৩২) উৎপাদশীলতার ভিন্ন সংজ্ঞা দেন। তার মতে, যা মানুষের কাজে আসে তার সবই উৎপাদন বলে বিবেচনা করা হয়। অর্থনীতিতে কোন খাতের গুরুত্ব বেশি এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে আমাদের দেশের মতো অস্থির রাজনীতি এবং অর্থনীতির দেশে প্রতিটি খাতই ভঙ্গুর দশায় পড়ে। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও বৃহৎ জনসংখ্যা এবং শ্রমশক্তির এদেশে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে শ্রমশক্তির উন্নয়নে। আগামী মাসেই ২০২৬-২৭ সালের অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। শোনা যাচ্ছে, অন্য যেকোনো অর্থবছরের চেয়ে আগামী বাজেটের আকার হবে অনেক বড়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। মার্চ-এপ্রিলের তথ্যানুযায়ী, এই বাজেটের আকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা রয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা (৫৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) নির্ধারণের সম্ভাবনা রয়েছে। ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে। ‘দারিদ্র্য হ্রাস’, ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি’, ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন’ এবং ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ’ বিষয়গুলো বাজেটগ্রন্থে লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যায় না। ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মধ্যে ১০টি লক্ষ্যমাত্রা এবং এর অন্তর্গত ৩৩টি টার্গেটের সঙ্গে কৃষিখাতের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে আমাদের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং খাদ্য উৎপাদকদের আয় ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বৃদ্ধি করা। তাই বাজেটে কৃষির জন্য শুধু থোক বরাদ্দ দিলেই হবে না। বাজেটে আগামী কয়েক দশকের ভবিষ্যৎ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনীতির বাংলাদেশের রূপরেখার প্রতিফলন থাকতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে জলাঞ্জলি দিয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার বিদায়ের আগ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ (এআরটি) স্বাক্ষর করেছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে, বাণিজ্য উপদেষ্টা অথবা পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে এবার সেক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এই নিরাপত্তা উপদেষ্টা এখন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই বাণিজ্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে একতরফা সুবিধা ও একক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার অজুহাতে এই চুক্তিতে সেদেশের চাহিদা মতো আমাদের দেশের ওপর শুল্ক ও শুল্ক-বহির্ভূত নানান অসম শর্ত চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এই চুক্তির ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক খাত কৃষি। এই চুক্তির ফলে অনেকগুলো স্বার্থবিরোধী শর্ত বাংলাদেশকে মেনে নিতে হবে। প্রয়োজন না হলেও টনপ্রতি ৩৫ ডলার বেশি দিয়ে তাকে আগামী পাঁচ বছর ধরে ৭ লাখ টন গম ক্রয় করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ২৬ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য তাকে কিনতে হবে, যার মূল্য দাঁড়াবে ১২৫ কোটি ডলার। তুলা, ফলমূল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য কেনার জন্য বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে ৩৫০ কোটি ডলার। বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কছাড় সুবিধা পাবে, কিন্তু এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ সুবিধা পাবে মাত্র ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্যে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঐ সব অধিকাংশ পণ্য রফতানির সুযোগ নেই। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এরূপ কোনো দেশের সাথে, অর্থাৎ চীন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে বাংলাদেশ কোনো বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না। এই শর্ত দ্বারা সরাসরি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। যেমন, সম্প্রতি জরুরি প্রয়োজনে রাশিয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি কিনতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। যে চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার হরণ করে তা যে আপাদমস্তক ‘অধীনতামূলক’ গোলামি চুক্তি, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না। যে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে তা রুখে দাঁড়ানো আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের প্রধান কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যা আমদানি করেছিল তার তা থেকে আদায়কৃত শুল্কের পরিমাণ ছিল ১২ শত কোটি টাকা। এই চুক্তি কার্যকর হলে আগামী ১০ বছর আমেরিকা থেকে এদেশে আমদানিকৃত ৬,৪১০টি পণ্যের মধ্যে ৬,০৩৮টি পণ্যের শুল্ক মওকুফ হয়ে যাবে এবং কেবল ৩৭২টি পণ্যের ওপর শুল্ক আদায়যোগ্য থাকবে, যা থেকে মাত্র ১০ কোটি টাকা শুল্ক আদায় হবে। বাকি ১,১৯০ কোটি টাকার শুল্ক মওকুফ করে দিতে হবে। অর্থাৎ, আমাদের শুল্ক আদায় বিপুল পরিমাণে কমে যাবে। অপরদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এখন গড়ে ১৫% হারে যে শুল্ক নেয় এ চুক্তির পর নতুন করে তার সাথে আরও ১৯% যোগ করে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৩৪% হারে নেবে। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যের ওপর ১৫ হাজার কোটির পরিবর্তে ৩৪ হাজার কোটি টাকা শুল্ক নিতে পারবে। ফলে, এ চুক্তি আমাদের দেশকে নিঃস্ব করে তার বিনিময়ে মার্কিনীদের সম্পদ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করবে। দেশের অর্থনীতিকে বাণিজ্য আমদানি নির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত করা হবে। ফলে উৎপাদনশীল খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুদূর ভবিষ্যতে কৃষি অর্থনীতি ভেঙে পড়বে। দেশের শ্রমশক্তির ৪৫ ভাগ কৃষি শ্রমশক্তি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। সারাদেশে বোরো ধানের ভরা মৌসুম চলছে। প্রতিবছরের মতো এবারও সরকার ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার বোরো ধান উৎপাদন খরচ বিগত বছরগুলোর চেয়ে বৃদ্ধি পেলেও এ বছর বোরো ধান ৩৬ টাকা কেজি দরে ৫ লাখ টন ধান, ৪৯ টাকা কেজি দরে ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল, ৪৮ টাকা কেজি দরে ১ লাখ টন আতপ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে গম কেনার সরকারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩ মে থেকে ধান ও গম এবং ১৫ মে থেকে চাল কেনা শুরু হয়ে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ক্রয় কার্যক্রম চলবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তে কৃষক তার ফসলের লাভজনক দাম থেকে বঞ্চিত হবে এবং সিন্ডিকেট চালের ব্যবসায়ীরা লাভবান হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, সারাদেশে ৪৮ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে এবার বোরো আবাদ হয়েছে। ফলন বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে লাগামহীনভাবে বাড়ে কৃষকের ফসল উৎপাদনের খরচ। বর্ধিত দামে সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক, ধান কাটা, মাড়াই শেষে বাড়ির উঠোন পর্যন্ত নিতে বা বাজারে বিক্রি করে যে দাম পায় তাতে কৃষকের ত্রাহী অবস্থা। উৎপাদন খরচ আর বিক্রির সাথে কোনো হিসাব মিলাতে পারে না কৃষক। মহাজনী এনজিওদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে, রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে-ভিজে, বজ্রপাতে মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে কৃষক ফসল ফলায় আর বারবার লোকসান গোনে। ব্যাপক উৎসাহে ধান কাটতে গিয়ে প্রতিবছর বজ্রপাতে মৃত্যু হয় অসংখ্য কৃষকের। গত ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত মোট ৩৮৬৭ জন কৃষকের প্রাণ ঝরেছে বজ্রপাতে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৭২ জন। বজ্রপাত নিরোধ বা পূর্ব সতর্কতার মাথামোটা প্রকল্প গ্রহণ করে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে ঠিকই, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং প্রাণহানি প্রতিবছর বেড়েই চলছে। চলবে... লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, কৃষক সমিতি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..