কমরেড হাবীব ইমন সংগ্রাম, সৃজন ও প্রগতির এক দীপ্ত প্রতিচ্ছবি

হাফিজ আদনান রিয়াদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা শারীরিক অস্তিত্বের চেয়েও বেশি দেদীপ্যমান হয়ে ওঠেন তাঁদের কর্মে, চিন্তায়, মননে এবং অদম্য প্রাণশক্তিতে। আমাদের কমরেড হাবীব ইমন ছিলেন তেমনই একজন। নানান ঘাত-প্রতিঘাতে পোড় খাওয়া, অদম্য স্পৃহা আর কর্মস্পন্দনে ভরপুর এক তরুণ বাম রাজনৈতিক নেতা, কমরেড হাবীব ইমন। প্রতিকূলতাকে বারবার জয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সংগ্রাম, সৃজন ও প্রগতির এক উজ্জ্বল প্রতীক। জন্ম ও শৈশব : লড়াইয়ের শুরুটা শুরু থেকেই ১৯৮৩ সালের ৭ এপ্রিল নোয়াখালীর মাইজদীতে তাঁর জন্ম। মা খালেদা পারভীন ও বাবা মো. খলিল উল্ল্যাহ। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। তাঁর পুরো নাম মো. হাবিব উল্ল্যাহ ইমন। সময়ের পরিক্রমায় যা সংক্ষিপ্ত হয় হাবীব ইমন নামেই। জন্মগতভাবে ক্রাউজন সিনড্রোম (ঈৎড়ুঁড়হ ফরংবধংব) নামের একটি বিরল রোগে আক্রান্ত হয়েও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। এই রোগ তাঁর দৃষ্টি ও শ্বাস-প্রশ্বাসে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করে। শৈশব থেকেই অসংখ্য অস্ত্রোপচার, শারীরিক জটিলতা ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন এক দৃঢ়চেতা সংগ্রামী মানুষ হিসেবে। তাঁর ‘জীবন নিজেই এক অনুপ্রেরণার গল্প’ - বলে যায়, ইচ্ছাশক্তির কাছে যে কেনো বাধাই অতিক্রমযোগ্য। শিক্ষা ও পেশাজীবন : জ্ঞানের সন্ধানে নোয়াখালীর মাইজদীতেই তার বেড়ে ওঠা। অরুণ চন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে নোয়াখালী জেলা স্কুল ও নোয়াখালী সরকারি কলেজে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ ছিল গভীর। শারীরিক অসুবিধা ও পারিবারিক আশঙ্কার নানা বাধা উপেক্ষা করে তিনি মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি (এমবিএ) অর্জন করেন। নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে তিনি সবসময় শাণিত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ বদলের অন্যতম হাতিয়ার হলো সত্য ও তথ্যের প্রচার। ঢাকা মেইল, সংবাদ প্রকাশ, সমাজকালসহ অনলাইন ও একাধিক জাতীয় দৈনিকে সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখার মাধ্যমে তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন। একজন কলাম লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে তিনি ছিলেন সোচ্চার ও নির্ভীক। এ কারণেই তিনি ছিলেন সমাদৃত। রাজনৈতিক জীবন : আপসহীন, একনিষ্ঠ ও দুর্বিনীত সাহসী প্রাণ ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হাবীব ইমন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। তিনি কখনো দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া বা পিছু হটার মানুষ ছিলেন না। তিনি দলের ভেতর তার সৃজনশীলতা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় সবার নজর কাড়েন। তিনি বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। এর আগে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি ও খিলগাঁও থানার সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগরে যুব ইউনিয়নের সংগঠন বেশ অগ্রসর হয়। ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। পার্টির বিভিন্ন সাংগঠনিক পর্যায়ে তিনি খিলগাঁও থানার সহ-সাধারণ সম্পাদক ও সাহিত্য শাখার সম্পাদক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল লেখকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রকাশনা ও গবেষণা সম্পাদক। রাজনৈতিক আদর্শে দৃঢ়তা, সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সহযোদ্ধাদের প্রতি আন্তরিকতা, তাকে এক নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বে পরিণত করেছিল। রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি ছিলেন আপসহীন, আর মানবিকতায় ছিলেন গভীরভাবে উজ্জ্বল। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক চর্চা: বহুমাত্রিক সৃজন হাবীব ইমন শুধু সংগঠক বা রাজনীতিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব। দুই বাংলার বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কবিতা লিখতেন। তার কবিতায় ব্যক্তিজীবনের বেদনা, শারীরিক জটিলতার যন্ত্রণা, সমাজ বাস্তবতা এবং প্রগতিশীল চেতনার শক্তিশালী প্রকাশ রয়েছে। তিনি নোয়াখালী আবৃত্তি একাডেমির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাকে তিনি কখনো শুধু নিভৃতবাসের সাধ বলে মনে করেননি; বরং তাকে ব্যবহার করেছেন জনমানুষের মুক্তির চেতনা ছড়িয়ে দিতে। সাহিত্যের তিনি ব্যবহার করেছেন প্রগতির চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার হাতিয়ার হিসেবে। ‘স্পর্ধা সবসময়ে’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। ‘বিজয়ফুল’-সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। গ্রন্থসম্ভার ও সাহিত্যকীর্তি তার সৃজনশীল ও মননশীল কাজের স্বাক্ষর বহন করে অসংখ্য প্রকাশিত গ্রন্থ। প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সমাজতন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব, অমাবস্যাকাল ও যুবকদের দায়, লেখা-অলেখা। তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ও আদর্শ পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন, যার প্রমাণ তার জীবনীগ্রন্থ কিশোরদের বঙ্গবন্ধু ও মুখছবি। ইতিহাসগ্রন্থ একুশে ফেব্রুয়ারি আঁধারে বাঁধা অগ্নিসেতু, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: দূরের মানুষ আমি দূরেই থেকে যাচ্ছি, কবি হয়ে জন্মাতে চাইনি, আমাদের ষোড়শী মাস্টারপাড়া, এক ভগ্ন অনুপ্রবেশকারীর পদ্য, কালো মেয়ের প্রতি ভালোবাসা, ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে গল্পগ্রন্থ। রচনা করেছেন জলনৌকা ও মুক্তিযুদ্ধের আগুনমুখো গল্প। সাক্ষাৎকারগ্রন্থ শীর্ষেন্দু-শংকর-সমরেশের মুখোমুখি ও বৈঠকি আলাপে কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাহিত্য ও রাজনীতি মেলানোর এক অনন্য প্রয়াস। এছাড়াও তার সম্পাদিত গ্রন্থ ‘অধ্যক্ষ আবদুল জলিল: স্মৃতিজল সুধায় আজন্ম’। পরিবারের কান্ডারি হাবীব ইমন পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে শত সীমাবদ্ধতা নিয়েও সবসময় পরিবারে ভূমিকা রাখতে চাইতেন। তার পরিবারের সদস্যরা তার প্রতি ভালোবাসা থেকেই চাইতেন, তিনি সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক। চাপমুক্ত থাকুক। কিন্তু তাকে বিরত রাখা সম্ভব ছিল না। পরিবারের প্রতিটি সদস্য কোথায় কি করছে, কার কি প্রয়োজন, ঘরের কোথায় কি আছে; না আছে সব ছিল তার নখদর্পণে। তাঁর এই যে সবার প্রতি মনোযোগ, ভালোবাসা, আন্তরিকতা সব কিছুই ছিল নির্ভেজাল। সম্মাননা ও প্রয়াণ লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮ সালের ২০ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মোৎসব উপলক্ষে আয়োজিত ছাত্র-যুব উৎসবে তিনি সম্মাননা লাভ করেন। এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিকে নয়, তার ধারাবাহিক প্রগতিশীল চর্চাকেই মূল্যায়ন করে। হাবীব ইমন ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, সংবেদনশীল এবং সমাজ-সচেতন এক মানুষ। তিনি একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কলাম লেখক, কবি ও সংগঠক, যিনি চিন্তা ও কর্মে ছিলেন সমান দৃঢ়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অর্থনৈতিক অসঙ্গতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন এসবের কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। তার অকাল প্রয়াণ প্রগতিশীল যুব আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে এক অপূরণীয় ক্ষতি। প্রগতিশীল সাহিত্যাঙ্গন হারিয়েছে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। তবে তার চিন্তা, লেখনি ও সৃজনশীল সব অবদান তাকে বাঁচিয়ে রাখবে কালান্তরে। আমাদের কমরেড হাবীব ইমন বেঁচে থাকবেন তার স্বপ্ন, সংগ্রাম আর রচনাবলিতে। লাল সালাম, প্রিয় কমরেড ইমন। লাল সালাম। লেখক : সাবেক সভাপতি, যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..