এ বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়লো যারা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন : শ্রমিক আন্দোলনে কমিউনিস্টদের প্রভাব বৃদ্ধি ১৯২০ সালের ৩০ অক্টোবর-২ নভেম্বর মুম্বাইয়ের এম্পায়র থিয়েটারে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করে অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)। ১৯২২ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন। ১৯২২ সালে যে ১০টি ইউনিয়ন নিয়ে বেঙ্গল ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠিত হয়েছিল তার কোনোটাতে শ্রমিক সদস্য ছিল না। অর্থাৎ শ্রমিক আন্দোলন ছিল অশ্রমিক পেশাজীবীদের হাতে। ১৯২৩-২৪ সাল থেকে প্রচেষ্টা শুরু হলেও ১৯২৬-২৭ সাল থেকে কমিউনিস্টরা জোরেশোরে ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনায় অংশ গ্রহণ করতে থাকে। সংস্কারবাদী নেতৃত্বের পরিবর্তে শ্রমিকরা নিজেরাই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে সাদরে গ্রহণ করছিল। চটকল, সুতাকল, ম্যাচ, ট্রাম কর্পোরেশনের সাফাইকর্মীদের বিদ্যমান সংগঠনগুলোতে সহজেই নেতৃত্বে আসীন হয়ে যান কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরা। তাঁরা নতুন নতুন ইউনিয়ন গড়তে থাকেন এবং শ্রমিকদের জঙ্গি আন্দোলন সংঘটিত করেন। বৈশ্বিক মহামন্দার ঠিক আগে আগে ১৯২৮-২৯ সালে বাংলা প্রদেশে শ্রমিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠে। এসময়ে চেঙ্গাইল-বাউরিয়া অঞ্চলে চটকল শ্রমিকরা কমবেশি ৩ মাস ধর্মঘট পালন করে। লিলুয়া রেলওয়ে ওয়ার্কশপে ৬ মাস শ্রমিক ধর্মঘট চলে। কলকতা কর্পোরেশনের সাফাইকর্মীরা সর্বাত্মক ধর্মঘট পালন করে। ১৯২৯ সালে চটকলে প্রথম সাধারণ ধর্মঘট সংঘটিত করে জুট ওয়ার্কর্স ইউনিয়ন। ১৯২৬ সাল থেকে এআইটিইউসির বঙ্গীয় শাখা প্রতি বছর মিছিল সমাবেশের মাধ্যমে মে দিবস পালন শুরু করে। এ সময়কালে অর্থনৈতিক দাবিসমূহের পাশাপাশি রাজনৈতিক দাবিও শ্রমিক মিছিলে উচ্চারিত হতে থাকে। ১৯২৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সাইমন কমিশন বয়কটের জন্য কংগ্রেস যে বিরাট মিছিল করেছিল সে মিছিলে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিক অংশ নিয়েছিল। ১৯২৮ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতাতে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি জানিয়ে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টি ও বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃতে ৫০ হাজার শ্রমিক মিছিল করে অধিবেশন স্থলে সমবেত হয়েছিল। এ ধরনের জঙ্গি শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অসংখ্য শ্রমিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। অসংখ্য ছাত্রকর্মী কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত হয়েছিল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির প্রথম সম্পাদক মন্মথ (মণি) চ্যাটার্জি ডক ইয়ার্ড শ্রমিক ছিলেন। কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সত্য ঘোষ বি এন আরের টালিক্লার্ক ছিলেন। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা ভারতের গভর্নর জেনারেলের নির্দেশে ১৯২৯ সালের ২০ মার্চ সারা ভারতে ৩১ জন বিশিষ্ট কমিউনিস্ট, শ্রমিক-কৃষক পার্টির নেতা, ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষকনেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে লেস্টার হাচিনসনকে গ্রেপ্তার করলে মোট অভিযুক্তের সংখ্যা হয় ৩২ জন। এদের মধ্যে বাংলা থেকে ছিলেন মুজফ্ফর আহ্মদ, ধরণী গোস্বামী, গোপেন চক্রবর্তী, গোপাল বসাক, রাধারমন মিত্র, শিবনাথ ব্যানার্জী, শামসুল হুদা ও কিশোরীলাল ঘোষ। ব্রিটিশ ছিলেন ৩ জন- ফিলিপ স্প্রাট, বেনজামিন ফ্রান্সিস ব্রাডলি, লেস্টার হাচিনসন। মামলার আর্জিতে বলা হয় “.. ১৯২১ সালে উক্ত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংগঠনটি ব্রিটিশ-ভারতে একটি শাখা সংগঠন গড়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, শওকত উসমানী, মুজফ্ফর আহ্মদসহ আরো কয়েকজনের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এইরুপ একটি শাখা গঠন করে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ ভারতের সার্বভৌম ক্ষমতা হতে রাজা-সম্রাটকে বঞ্চিত করা। ... কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তার উদ্দেশ্যকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফিলিপ স্প্রাট, বেনজামিন ফ্রান্সিস ব্রাডলিসহ নানা ব্যক্তিকে ভারতে পাঠিয়েছিল ... মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ব্রিটিশ ভারতের ভিতর ও বাইরের ন্যায় মীরাটে একটি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। উক্ত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মীরাটে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টি গঠন করেন এবং তার একটি সম্মেলনও করেন।” ১৯২৯ সালের ১২ জুন মীরাট ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা শুরু হয়। ১৯৩৩ সালের ১৬ জানুয়ারি রায় হয়। মামলার রায়ে বাংলার বন্দিদের মধ্যে মুজফ্ফর আহ্মদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ধরণী গোস্বামীর ৭ বৎসর দীপান্তর, গোপেন চক্রবর্তীর ৫ বৎসর দ্বীপান্তর, রাধারমন মিত্র, গোপাল বসাক, শামসুল হুদা প্রত্যেকের ৪ বৎসর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। বাকী দু’জন শিবনাথ ব্যানার্জী ও কিশোরীলাল ঘোষ কমিউনিস্ট না হওয়ায় বেকসুর খালাস পান। ১৯৩৩ সালের আগস্ট মাসে উচ্চ আদালতে আপিলে মুজফ্ফর আহ্মদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হ্রাস করে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অন্যদের সাজাও হ্রাস পায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কমিটি মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার কারণে বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত হওয়ার উদ্যোগ অংকুরেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মুজফ্ফর আহ্মদ, শামসুল হুদা মামলায় কারান্তরীণ। ১৯৩০ সালে কলকাতার গাড়োয়ান ধর্মঘটে রাজদ্রোহমূলক ইশতেহার লেখার অপরাধে গ্রেফতার হন আব্দুল হালিম। আব্দুর রাজ্জাক খাঁনও সেসময় বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ হন। বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার আদি চার কারিগরের অনুপস্থিতিতেই অখিল বন্দোপাধ্যায়, রণেন সেন, অবনী চৌধুরী, রমেন বসু ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কমিটি (কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অংঙ্গ)’ ইংরেজিতে ক্যালকাটা কমিটি অফ কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সেকশন অফ কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে আব্দুল হালিম উদ্যোগে যুক্ত হন। ১৯৩১ সালের আগস্ট মাসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে যুক্ত হন সোমনাথ লাহিড়ী। ১৯৩১ সালের নভেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ৬ সদস্য বিশিষ্ট ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কমিটি (কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অংঙ্গ)। কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন আব্দুল হালিম। কমিটির মুখপত্র হিসেবে আব্দুল হালিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সাপ্তাহিক চাষী-মজুর’। কলকাতা কমিটির পক্ষ থেকে তাদের কর্মকাণ্ডের বিবরণী এবং ভারতবর্ষে বিদ্যমান কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রচেষ্টা ও বিফলতার বিবরণী দিয়ে একটি দলিল মস্কোতে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক-কমিন্টার্ন সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। ১৯৩৩ সালে কমিন্টার্নের পত্রিকা ইন্টারন্যাশনাল প্রেস করেসপন্ডেন্স-‘ইনপ্রিকর’ এ ভি. বসাক এর নামে ’বর্তমান ভারতের অবস্থা’ শিরোণামে ছাপা হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি গঠন ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত সময়কালে নিম্নলিখিত কয়েকটি কারণে কমিউনিস্ট পার্টির শক্তিবৃদ্ধি ঘটে। ১৯২৮-৩৪ সালে বাংলায় যে বিপ্লব প্রচেষ্টা চলে তাতে বাংলার জাতীয় বিপ্লবীরা বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটান। বিভিন্ন অ্যাকশানের মাধ্যমে বহু ব্রিটিশ রাজকর্মচারীকে হত্যা করা হয়। এসকল মামলায় যেমন- মেছুয়াবাজার বোমা মামলা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন মামলা, ডালহৌসি স্কোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণ মামলা, টেগার্ট হত্যা, লোমান হত্যা, পেডি হত্যাসহ বিভিন্ন গুপ্তহত্যা মামলায় হাজার হাজার বিপ্লবী যুবক গ্রেপ্তার হন এবং বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ হন। জাতীয় কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনে ১৯৩০-৩১ সালে ৯০ হাজার এবং ১৯৩২-৩৩ সালে ১ লাখ ২০ হাজার আন্দোলনকারীকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বাংলার বন্দিরা আন্দামান সেলুলার জেল, দেউলি, বকসা, হিজলী, মেদিনীপুর, প্রেসিডেন্সী প্রভৃতি জেলে বন্দী ছিলেন। এসব জেলখানার ভিতর গড়ে উঠেছিল কমিউনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। বন্দিদের অনেকেই বন্দিজীবন কাটিয়ে ছিলেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের নিবিড় পাঠ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। কারাভ্যন্তরে মার্কসবাদ মতাদর্শ গ্রহণকারীরা জেল থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের নিয়োজিত করলেন শহরাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনে এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলনে। ১৯৩০-৩৪ সালে অনেকগুলো বড় বড় কৃষক আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলন হয়। এ আন্দোলনগুলো থেকে অনেক শ্রমিক, কৃষক কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৬-১৯৩৫ সালে বাংলায় অনেকগুলো কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে উঠে এবং ১৯৩৫ এর মধ্যে অধিকাংশগুলোই কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আব্দুল হালিমের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যুক্ত হয়ে যায়। কয়েকজন অনুগামীসহ সৌম্যেন ঠাকুর এবং এম এন রায়পন্থী দল- র‌্যাডিকেল হিউম্যানিস্ট পার্টি ছাড়া বাংলার প্রায় সবগুলো মাকর্সবাদী গ্রুপ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে মিশে যায়। ১৯৩৩ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতা কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা কমিটি’ করা হয়। এটিই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির প্রথম রুপ। সম্পাদক নির্বাচিত হন রাজাবাগান ডক ইয়ার্ডের শ্রমিক মন্মথ (মণি) চ্যাটার্জি। ১৯৩৪ সালের ২৩ জুলাই ব্রিটিশ রাজ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে কলকাতার ১৩টি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন গণসংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। নিষিদ্ধঘোষিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির প্রথম সম্মেলন গোপনে ১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার বেহালায় অনুষ্ঠিত হয়। সম্পাদক নির্বাচিত হন গোপেন চক্রবর্তী। দ্বিতীয় বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনও গোপনে অনুষ্ঠিত হয় চন্দননগরে ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে। ৫০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন নৃপেন চক্রবর্তী। অন্যান্য সদস্যরা ছিলেন মুজফ্্ফর আহ্মদ, আব্দুল হালিম, সোমনাথ লাহিড়ী, রণেন সেন, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ও গোপেন চক্রবর্তী। ১৯৩৯ সালে পাঁচুগোপাল ভাদুড়ীকে সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণসংগঠনসমূহের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ১৯৪৩ সালের ১৮-২১ মার্চ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তৃতীয় সম্মেলন কলকাতার ওয়ালিংটন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত হয়। ভবানী সেন সম্মেলনে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক রিপোর্ট উত্থাপন করেন। সম্পাদক নির্বাচিত হন ভবানী সেন। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে সীমিত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলায় ২৫০ আসনের বিপরীতে ১৯ জন প্রার্থী দেয় পার্টি। পূর্ববঙ্গে ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রার্থীরা হলেন, ময়মনসিংহ মণি সিংহ, কিশোরগঞ্জ (মুসলিম আসন) ওয়ালী নেওয়াজ থান, দিনাজপুর (তফশিলি আসন) রুপনারায়ণ রায়, দিনাজপুর গুরুদাস তালুকদার, রংপুর (তফশিলি আসন) নির্মলেন্দু বর্ধন, রংপুর হরিকান্ত সরকার, চট্টগ্রাম কল্পনা (দত্ত) যোশী, পূর্ব ত্রিপুরা (কুমিল্লা, মুসলিম আসন) মহম্মদ ইয়াকুব ও ঢাকা ব্রজেন দাস। ৩ জন কমিউনিস্ট প্রার্থী জয়লাভ করেন। পূর্ববঙ্গ থেকে জয়লাভ করেন রুপনারায়ণ রায়, শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত রেল আসন থেকে জ্যোতি বসু, দার্জিলিং থেকে রতন লাল ব্রাহ্মণ। ১৯৪৭ সালের ৪-৬ অক্টোবর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির চতুর্থ এবং অবিভক্ত বাংলার শেষ সম্মেলন কলকাতায় পার্টি দপ্তরের ছাদে প্যান্ডেল টানিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন ডা. রণেন সেন। এ কমিটিতে পূর্ববঙ্গের চার জন সদস্য ছিলেন- মণি সিংহ, নেপাল নাগ, খোকা রায়, মণিকৃষ্ণ সেন। অন্য দুই সদস্য কৃষ্ণবিনোদ রায় ও মনসুর হাবিবুল্লাহ ১৯৫০ সালে ২৪ এপ্রিলে রাজশাহী জেল হত্যাকাণ্ডের সময়ও পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে ছিলেন। ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের সময় বাংলায় পার্টির সদস্য ছিলেন ২৫০ জন, ১৯৪৩ সালে তৃতীয় সম্মেলনের সময় সদস্য ছিলেন ৩,০০০ জন এবং ১৯৪৭ সালে চতুর্থ সম্মেলনের সময় সদস্য ছিলেন ১৯,২৫০ জন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি, কেন্দ্রীয় কমিটি কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলার প্রাথমিক অভিযুক্ত ১৩ জনের একজন উত্তরপ্রদেশের সত্যভক্ত ১৯২৫ সালের ২৫-২৮ কানপুরে কমিউনিস্ট সম্মেলন আহ্বান করেন। মাওলানা হসরৎ মোহানী ছিলেন অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যান। ২৫ ডিসেম্বর ছিল উদ্বোধনী পর্ব। ২৬ ডিসেম্বর কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার বিষয় আলোচনা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সিদ্ধান্ত হয় পার্টির নাম হবে ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’। অন্য সিদ্ধান্তে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। সম্মেলনে ৩০ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠিত হয়। ১৬ জন সম্মেলনে নির্বাচিত হয়। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এস ভি ঘাটে ও জে পি বাগেরহাট্টা। ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় সর্বভারতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন আব্দুল হালিম, রণেন সেন, সোমনাথ লাহিড়ী। মুম্বাই থেকে উপস্থিত ছিলেন ড. গঙ্গাধর অধিকারী, এস জি পাটকর, নাগপুর থেকে এম এল জয়মন্ত, পাঞ্জাব থেকে গুরুদিৎ সিং, উত্তর প্রদেশ থেকে পি সি যোশী। সম্মেলনে ড. গঙ্গাধর অধিকারী সর্বসম্মতিক্রমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সম্মেলনে উপস্থিত সকলকে নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। ১৯৩৪ সালে মুম্বাইয়ে সুতাকল শ্রমিকদের ধর্মঘট সংঘটিত করায় ডা. অধিকারীকে গ্রেপ্তার করে বিজাপুরে অন্তরীণ রাখা হয়। অধিকারীর পরে এস ভি ঘাটে সাধারণ সম্পাদক হন। একই বছর ঘাটে কারান্তরীণ হলে এস এস মিরাজকর সাধারণ সম্পাদক হন। এস ভি ঘাটে, এস এস মিরাজকর, সোমনাথ লাহিড়ী এই তিনজনকে নিয়ে পলিটব্যুরো গঠিত হয়। ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে যোগদানের জন্য মস্কো যাওয়ার পথে সিঙ্গাপুরে গ্রেপ্তার হন মিরাজকর। তখন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয় সোমনাথ লাহিড়ীকে। ১৯৩৬ সালের শুরুতে ইকবাল সিংসহ লাহিড়ী মুম্বাইয়ে গ্রেপ্তার হয়ে যান। দুই বছর জেল খেটে বের হয়ে পার্টির সদর দপ্তরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন পি সি যোশী। ১৯৩৬ সালে লক্ষেèৗয় কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় অজয় ঘোষ, ভরদ্বাজ, ড. অধিকারী ও পি সি যোশীকে নিয়ে পলিটব্যুরো গঠিত হয় এবং পি সি যোশী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পার্টির গোপন সদর দপ্তর কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪২ সালের ২৩ জুলাই পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যহৃত হওয়ায় মুক্ত পরিবেশে ১৯৪৩ সালের ২৩ মে থেকে ১ জুন মুম্বাইয়ে পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। ১৩৯ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসে উপস্থিত ছিলেন। কংগ্রেসে পূরণচাঁদ যোশী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..