তন্ত্রে-মন্ত্রে সাধন ক্রিয়া বা বিষ নাশক গালাগালি

আহমদ সিরাজ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

প্রত্যেক সমাজ বা দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে লোক মানুষের একটা লৌকিক জীবন দ্বারা আছে। দেশে দেশে তার ভিন্নতা থাকলেও গল্প কাহিনি, ঘটনার পরম্পরায় কোন মিল খুঁজে না পাওয়া গেলেও শেষ বিচারে একটা অবিভাজ্যতা আছে। আমাদের বাঙালি ও বাংলা ভাষা সাহিত্যে লোক মানুষের একটা বিশাল ভাণ্ডার আছে, যা লোক সাহিত্য হিসাবে দেশের সর্বত্র ও অঞ্চল বিশেষেও আছে, যা বাংলা লোক সাহিত্যের সমগ্রহের অংশ হয়ে আছে। এক্ষেত্রে লোকসাহিত্যে দেবী মনসার কাহিনি চরিত্রে, স্থান নিয়ে আছে। বাংলা সাহিত্যে এই কাহিনিকে ঘিরে মনসামঙ্গল কাব্য রূপ লাভ করেছে। যার একটা সামাজিক পটভূমিকা আছে এবং তাতে নারীর জীবন, মনসার চাঁদ সওদাগরের হাত থেকে পূজা পাওয়ার নিমিত্ত তার বহুতর ছলনা, ষড়যন্ত্র অর্থাৎ যত প্রকারের প্রতারণা তার সকল কৌশল অবলম্বন করে চাঁদ সওদাগরের ছয় পুত্রকে সর্পাঘাতে নিধনসহ পুত্র লক্ষ্মীন্দর ও বেহুলা চরিত্রে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। তবুও মনসা চাঁদ সওদাগরের স্বীকৃতি পেতে হাল ছাড়েনি বা চাঁদ সওদাগরের হাত থেকে স্বীকৃতি আদায়ে প্রত্যয়ী থেকেছে। এই মনসা দেবীর বন্দনা, আবেদন-নিবেদন, ভর্ৎসনা, তিরস্কার তথা গালাগাল দিয়েও পরবর্তী সময়ে লোক মনসা প্রত্যয় হয়ে উঠেছে মনসা পূজা বা মনসা সদয় হলে সর্পাঘাতের শরীর থেকে বিষ নামানো যায়। লোক মানস এই চিকিৎসায় একটা বিকল্প হিসাবেও দেখেছে। তখন মনসাস্তুতি, গীতি, বন্দনা মন্ত্র হিসাবে যুগে যুগে একটা ঐন্দ্রজালিক মন্ত্রের ভাষা হিসাবে যেন, বিষ নামানোর কার্যকর হিসাবে পরিগণিত হয়ে এসেছে। লক্ষ্য করার বিষয় এক্ষেত্রে মানুষ অচেতন অবস্থায় নির্বাক হয়ে গেলেও তাকেও বিশেষ ছোঁয়া বা আক্রান্ত হিসাবে ওঝা, তন্ত্র মন্ত্রে সুস্থ করার সক্ষমতায় তাড়িত থেকেছে। অচেতন মানুষের সচেতন হয়ে উঠার কোন চিকিৎসা তখন না থাকায় মানুষের বিশ্বাস ছিল, অপয়াজাত, বিষাক্ত বাতাস, এমনকি সাপের দর্শন ইত্যাদি দ্বারা মানুষের জীবন বিপদগ্রস্ত হয়, লৌকিক এমন বিশ্বাস থেকে লোকজন তখন ওঝা এর আশ্রয় নিয়েছে, কোন কোন সময় যে বিপদমুক্ত হয়নি এমন নয়। এই হিসাবে অঞ্চল ভেদে বিষ নামানোর মন্ত্রের প্রক্রিয়ায় ওঝা তৈরি হয়েছে। বিশেষত সনাতন হিন্দু সমাজের নিম্নবর্ণের ভেতর ওঝা গুনিন বেশি দেখা গেছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণের মন্ত্র হিসাবেও রোগ নিরাময়ের কাজ করেছে। লোকজনের বিশ্বাস এভাবে তৈরি হয়েছে, লোক চিকিৎসা। অধুনা অগ্রসর সমাজেও লোক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভেষজ লতা, পাতা, তন্ত্র-মন্ত্র যুক্ত হয়ে ঔষধি হয়ে উঠেনি তা বলা যাবে না, আগে মানুষের একটা সরল আস্থা বিশ্বাস থেকে শক্তির মহিমায় বিশ্বাস রেখেছে। এখন এগুলোকে চাতুর্য্যের সঙ্গে এক শ্রেণির ধূর্ত লোক চিকিৎসার নামে মানুষের জীবনে ক্ষতিও বয়ে আনছে। তবুও লোক চিকিৎসার একটা ক্ষেত্র এখনও পড়ে আছে। তাতে সর্পাঘাত, অচেতন, অবশ, নির্বাক, অবস্থা থেকে মুক্তিলাভে বিষ নামানো বা মনসামন্ত্র গ্রামে-গঞ্জে ক্রিয়াশীল আছে। এখানে ওঝার মুখ থেকে উঠে আসা মন্ত্রের নমুনা কিছু উদ্ধৃত্ত করা হলো। ওঝা হরেন্দ্র শব্দকর এর মুখ থেকে পাওয়া- ‘ও বিষ দৌড়ে লাম রে/ কালিয়া নাগের বিষ/ দৌড়ে লাম রে/ পাহাড়িয়া পুঙ্গার বিষ/ দৌড়ে লাম রে/ পথের পুঙ্গায় পাইছে তারে/ যাওরে ছাড়িয়া/ আকুটা পুঙ্গার বিষ/ দৌড়ে লাম রে/ স্বর্গ পাতালের বিষ/ যাও নালে নালে/ যে নাইলে আইছো বিষ/ সেই নালে যাও/ সকল জেগা ছাড়িয়া বিষ/ মাঝায় করলো ভর/ ও বিষ দৌড়ে লাম রে/ আছুদা ছিনালের বিষ/ যাও নালে নালে/ কইতানি গো পদ্মাবতী/ তর লাজের কথা/ পদ্মবনে গিয়া তুমি/ কইলায় কিলা কিতা।’ এভাবে বিষ নামানোর জন্য আবেদন-নিবেদনের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করে, বিষের দেবীর দুষ্ট চরিত্রের বর্ণনা দিতে ওঝা পিছপা হয় না। লজ্জা শরমের হাত থেকে বাঁচতে হলে বিষ নামা থেকে দেবীর উদ্যোগী হতে হবে। ওঝার এমন অদ্ভুত বিশ্বাস আছে, তারা চেষ্টার এক পর্যায়ে এমন সব অশ্লীল গালাগাল ব্যবহার করেন যেন, বিষ কাল বিলম্ব না করে শরীর থেকে দৌড়ে দিয়ে পালায়। এভাবে আরো এক ওঝা অনিলের কণ্ঠ থেকে উঠে আসে এভাবে- ‘কালা কালন্ত বিষ/ কালাতর জাতি/ শনিবারে মঙ্গলবারে/ তর উৎপত্তি/ আও বিষ নালে/ ছাকিয়া ফালাইমু তরে/ ব্রহ্মার জালে/ বিষ নাম নাম রে/ সাউয়া ছুদানির বিষ/ ওঝান নাল দরে/ কালা কালন্ত বিষ/ কালা তর জাতি।’ এছাড়া বিষ নামানো ক্ষেত্রে কদর্য অশ্লীল শব্দের পাশাপাশি বন্দনাও আছে, তাতে আকাশ, বাতাস, স্বর্গ, মর্ত্যে, নদী পাহাড়, পর্বত দেবতাসহ, দিক দিগন্ত, বন্দনা করে তারই মন্ত্র পাঠ শুরু করা হয়। এক্ষেত্রে মহাদেব বা শিবের অবস্থান পাওয়া যায়। শিব পুরাণে বড় দেবতা হলেও তার একটা গণ চরিত্র থাকার কারণে সর্বত্র অবস্থান গণ্য হয়েছে। নিম্ন বর্ণ থেকে উচ্চ বর্ণেও শিবের ব্যাপকতা থেকেছে। মন্ত্রের ভেতর গালাগাল যুক্ত হওয়ার কোন মাহাত্ম্য হয়ত আছে। ইতি নেতি, শুভ-অশুভ বলে কথা আছে। মন্ত্রের মধ্যে এভাবে গালাগাল যুক্ত হওয়া মানে শক্তির বিরুদ্ধ হিসাবে আঘাত হওয়াতে চেতনানাশক হিসাবে ক্রিয়া করে কি না এমন বিশ্বাস আছে। দেখা গেছে শান্ত, ধীর, স্থির স্বভাবের কাউকে গালি দিলে সেই শান্ত স্বভাবের ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে অঘটন এমনকি খুনের মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে। শব্দের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আছে, যা শরীর ও মনের উপর রেখাপাত করে। বস্তু তান্ত্রিক দিক থেকেও মনের উপর দেহের প্রভাব রয়েছে, ওঝা, গুণিনের অশুভ শব্দ বার বার উচ্চারণ অচেতন রোগী চেতনায় স্পন্দিত হয়ে উঠলে, রোগীর চেতনা ফিরে আসতে পারে। এই অর্থে গালাগালের একটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সমাজে দৈনন্দিন ক্রিয়া কর্মে পরিবারে, স্নেহ মমতার পাশাপাশি পুত্র-কন্যা, পিতামাতার রাগ অভিমান, গালাগাল ব্যাহত হয়ে থাকে। যা পুত্র-কন্যার জীবন পরিবর্তনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এটাও এক প্রকার মন্ত্রের মতো যা বচন হিসেবে গণ্য হয়ে উঠতে পারে। ওঝা, মাহাত যুগ যুগ ধরে মন্ত্র নামে শব্দ, গীত বন্দনা করে, লোকের রোগ বালাই উপশমে ভূমিকা পালন করে। এর বাস্তব কোন সারবত্তা না থাকলেও শব্দের মহিমা বা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সমাজ মনস্বত্বে কি প্রভাব রাখে তাও কিন্তু এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এই গালাগাল থেকেও যে কত মামলা মোকদ্দমা, রক্তপাত, মৃত্যু ঘটে থাকে তার ইয়ত্তা নেই। মানুষের জীবনে গালাগাল নিয়ে গবেষণার হয়ত সুযোগ আছে। ওঝা, মাহাত, গুনিন, সাধু সন্ন্যাসের ভেতর শব্দের যে, মাহাত্ম্য পড়ে আছে তা অধুনা সমাজে ভিন্নরূপে হলেও গালাগাল এর গুরুত্ব বহন করছে যা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গালি বা গালাগালের এত মাহাত্ম্য থাকলে তার একটা মনস্তাত্বিক শক্তি অবশ্যই আছে, তাহলে হাসপাতালে যে সমস্ত রোগী হাত পা শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে পড়ে আছে তেমন রোগী হতাশ হয়ে হাত পায়ের চেতন অবস্থা ফিরে পাওয়ার আশা ত্যাগ করে আছে। তেমন রোগীর কানে কানে গালাগাল ছুড়ে দিয়ে মনের গতি, প্রকৃতি, রাগ তৈরি করা গেলে, শরীরের অবশ অঙ্গে উত্তেজনা অর্থাৎ রোগীর ভেতর ক্ষোভ রাগ থেকে শরীরের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। তেমন কোনকিছুই অযৌক্তিক বা অবৈজ্ঞানিক নাও হতে পারে!

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..