পলিথিন-প্লাস্টিক প্রসঙ্গ পরিবেশ দূষণ কতটা সহনীয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মিহির বিশ্বাস : পরিবেশ দূষণ আজকাল মনোজগতে যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানুষের শুধু নয়; উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষেত্রেও তাদের জননকোষে এর প্রভাব পড়ে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। উদ্ভিদ ও প্রাণীর চারপাশ হলো পরিবেশ, যাতে সে জীবতাত্ত্বিক ধারা অব্যাহত রাখতে পারে। এর মধ্যে ক্ষতিকারক কোনো কিছুর অনুপ্রবেশে পরিবেশ দূষণ ঘটায়। শুধু তাই নয়, অন্য ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক নয় কিন্তু ঐ পরিবেশে ফরেন বডি বা বহিরাগত হিসাবে অংশগ্রহণ করে ঐ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে। পরিবেশের মূল ভিত্তি ভারসাম্য। ভারসাম্য নষ্টও পরিবেশ দূষণের মধ্যে পড়ে। দূষিত পরিবেশে রুগ্ন ও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মলাভ করে। অম্লজান নির্ভর অনুজীবের সংখ্যা কমে যায় এবং অম্লজান অনির্ভর অনুজীবের সংখ্যা বেড়ে যায়। এহেন পরিস্থিতিতে মাটি-বায়ু-জলের উর্বরতা শক্তি লোপ পায়। এবং এরূপ পরিবেশ দূষণ স্থায়ীভাবে পরিবেশের অবনমন বা স্থায়ী ক্ষতির সৃষ্টি করে। শিল্প-কলকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি হুকুম-দখলকরা হচ্ছে। ফলে কৃষিজমি ও বনাঞ্চলের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। আগে ১% হাওে প্রতিবছর কৃষিজমি কমে যেত। এখন এই হার অনেক বেড়ে গেছে। এভাবে কৃষিজমি ২% হারে কমতে থাকলে ৫০ বছর পর কোনও কৃষিজমি পাওয়া যাবে না। যা এককালের কৃষিপ্রধান দেশটি রুগ্ন ও পরনির্ভরশীল দেশে পরিণত হবে। বিদেশ নির্ভর ট্যাবলেট খেয়ে দিনাতিপাত করতে হবে। এটা কারও জন্য কাম্য নয়। বাংলাদেশে পলিথিনের অবস্থান: ৫৫ মাইক্রনের কম পাতলা পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে। কিন্তু আইনের ফাঁক গলে পলিথিনে ভরে গেছে নদী-নালা-খাল-বিল উপকূল। এমনকি বঙ্গোপসাগরের কোনও কোনও স্থানে পলিথিন-প্লাস্টিক ভয়াবহ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, সরকার পাটমোড়কীকরণ আইন জুট প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০ করে বাধ্যতামূলকভাবে জুটের ব্যবহার করতে হবে এবং পলিথিন প্যাকেট বর্জন করতে হবে মর্মে অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু সফলতা আসেনি বলা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ২০১৮ সালে ৮৩টি পলিথিন বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং ৪২.৫০ লাখ টন পলিথিন ব্যাগ জব্দ করা হয়েছে এবং ১৩.৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আবার এটাও জানা গেছে ২/১ টি কারখানা ছাড়া বাকিগুলো কারখানার বৈধ লাইসেন্স বা আইনগত ভিত্তি নেই, কিন্তু দেদারছে পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন করে যাচ্ছে। (দি.ইন্ডিপেন্ডন্ট) বুড়িগঙ্গাসহ নদীর তলদেশগুলোতে ১০ ফুট থেকে ১৬ ফুট পর্যন্ত পলিথিন ও প্লাস্টিকের আস্তরণ পড়ে গেছে। পরিবেশ দূষণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমালা এ কথা অনস্বীকার্য যে পরিবেশের সামগ্রিক উন্নয়ন না ঘটিয়ে এসডিজি অর্জন করা সম্ভব নয়। ১৭টি লক্ষ্যমালার মধ্যে ৯টি লক্ষ্যমাত্রাই পরিবেশকে কেন্দ্র করে গৃহীত হয়েছে। সুতরাং বলা যায়, পলিথিন-প্লাস্টিক দূষণ রোধ না করলে একটা বড় অংশের দূষণ বন্ধ হবে না। বিশ্বের দীর্ঘতম নদীসমূহ ও প্লাস্টিক দূষণ বিশ্বে পরিবেশ মান সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান: কয়েকমাস আগে সুজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের সাইডলাইনে ইপিআই সূচকের ১৮০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরেমের সঙ্গে যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটি ও কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি এনভায়রনমেন্ট পারফমেন্স ইনডেক্স তৈরি করেছে। প্রতি দুই বছর অন্তর এই পরিবেশের মান নিয়ে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। পরিবেশ মানের সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৯ দশমিক ৫৬। অবস্থান ১৭৯ নম্বরে বাংলাদেশে উপরের তিনটি দেশ হলো কঙ্গো (১৭৮), ভারত (১৭৭) ও নেপাল (১৭৬)। শুধুমাত্র বুরুন্ডির অবস্থান বাংলাদেশের নিচে। এনভায়রনমেন্ট পারফমেন্স ইনডেক্স এর স্বল্প স্কোরের অর্থ হল এই দেশগুলোকে পরিবেশের মান উন্নয়নে বিভিন্ন দিকে বিশেষ করে বাতাসের দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমণ হ্রাসে আরো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তালিকায় ৮৭ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে সবার ওপরে স্থান পেয়েছে সুইজারল্যান্ড। এরপর প্রথম পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, মালটা ও সুইডেন। শুধু তাই নয় তালিকায় প্রথম ১৫টি দেশের সবগুলোই ইউরোপের। আর যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে ২৭তম অবস্থানে। ইপিআই তৈরিতে বায়ুর মান, পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন, পানিসম্পদ, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, কৃষি, বনায়ন, মৎস্য সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, আবহাওয়া ও জ্বালানির মতো ২৪টি সূচককে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। কী করতে হবে? দূষণরোধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। আইন অমান্যকারীকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প অথবা কাছাকাছি জৈব-বিকল্প ব্যবস্থার প্রচলন ঘটাতে হবে। অপরিহার্য ক্ষেত্রে প্লাস্টিক দ্রব্য রিসাইকেল বা চক্রায়িতভাবে পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাটের ব্যাগে প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে। ২০০২ সালে আইন করে পলিথিন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ বিশ্বে নজির স্থাপন করেছিল। অগ্রসর বিশ্ব অবাক তাকিয়েছিল, বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ হয়েও কীভাবে পলিথিন নিষিদ্ধ করল। কিন্তু তা ধরে রাখতে পারল না। একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তি যাতে ছিল কিছু কিছু প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনুমোদন দেয়ার ছত্রাবরণ। আবার পলিথিনে বাজার সয়লাব হয়ে গেল। প্রায় অগোচরে প্রচারিত এই এসআরও প্রত্যাহার করার মধ্য দিয়ে আমরা এগুতে পারি। পলিথিন নিষিদ্ধ থাকলে বিকল্প বের হবে এবং এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ ওঁত পেতে আছে। আসুন সভ্য হই-প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব হই। পলিথিন-প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণ রোধ করি। তথ্যসূত্র: বিভিন্ন পত্রিকা, পুস্তক ও নিবন্ধ (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ)। লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও সদস্য সচিব, ম্যারিন এন্ড ফিসারিজ অ্যালামনি, চ.বি.

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..