সংগ্রামের স্মৃতিতে কমরেড মোহাম্মদ নাসের

এস এম চন্দন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে ড. মোহাম্মদ নাসের পুনরায় যোগ দেন ২০০০ সালে। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি রাজশাহী জেলা নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন, ২০১২ সালে জেলা কমিটির সভাপতি হন। আমৃত্যু তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি এক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উদীচীর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। রাজশাহীতে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ও সংস্কৃতি- দুটো শাখারই তত্ত্বাবধান করতেন কমরেড নাসের। তাঁর সাথে বৈঠকে বসার একটা আলাদা মজা ছিলো। তিনি গল্প করতেন, হাসতেন, ভুলে যেতেন যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বৈঠকে তাঁকে স্যার বলে সম্বোধন করলে মাঝেমাঝে শুধরে দিতেন, ‘আমাকে কমরেড বলুন। এখানে আমি কারও স্যার নই’। পুনরায় কাজে যোগ দেয়ার পরপরই পার্টির কাজে পুরো মনোনিবেশ করেন কমরেড নাসের। বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে ঘুরে প্রশিক্ষণ করিয়েছেন তিনি। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মাঝেও কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হন। পল্টনে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলার প্রতিবাদে ২০০১ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিশাল এক প্রতিবাদী মৌন মিছিল হয়েছিলো। এই কর্মসূচির মূল আয়োজক ছিলেন ড. নাসের। পরে কয়েকজন প্রগতিশীল ও বামপন্থি শিক্ষককে নিয়ে তিনি একটি প্ল্যাটফর্ম করেন। এর ব্যানারে একটা সেমিনার করা হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ে, যার আলোচ্য বিষয় ছিলো গ্যাস রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেতিবাচক, না ইতিবাচক। পরে যখন চারদলীয় জোট সরকার জোরেসোরে গ্যাস রপ্তানির কথা প্রচার শুরু করলো, তখন মূলতঃ নাসের স্যারের উদ্যোগ ও আগ্রহেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির শাখা গঠন করা হলো। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন তিনি এই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পর্যায়ক্রমে তিন মাস সদস্য-সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথম সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো আমাকে। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক। পরে এই কমিটি অনেক বছর ধরে অনেকগুলো বড় কর্মসূচি পালন করেছে। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলো ২০০৩ সালে ইরাকে ব্রিটিশ-মার্কিন-ন্যাটো বাহিনীর হামলার পর সাত দিন ধরে ক্যাম্পাসের ফোকলোর মাঠে যুদ্ধবিরোধী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো বাম ছাত্রসংগঠনসহ প্রায় সবগুলি সাংস্কৃতিক সংগঠন এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। তখন সদস্য-সচিব ছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট নেতা রাজিবুল ইসলাম কনক। ২০০৩ সালে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় বিশাল খাস সম্পত্তি বিল কালাই অবৈধভাবে ইজারা দেয়া হয় জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের নেতা ফরিজুল ইসলামকে। এর প্রতিবাদে বিরাট আন্দোলন পরিচালিত হয়, নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। এই আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সার্বক্ষণিকভাবে পাশে ছিলেন কমরেড নাসের। তিনি নিজে বাগমারায় গিয়েছেন। কর্মসূচি নেয়ার ব্যাপারে অগ্রণী দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া আন্দোলনে মূল ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে তৎকালীন জেলা সিপিবি সভাপতি মহসিন সরকার (তৎকালীন শুভডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান), বাগমারা উপজেলা সভাপতি বিজন সরকার (বর্তমানে গোবিন্দপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান) ও জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হকের অবদান অনস্বীকার্য। আন্দোলন চলাকালে এলাকার গাঙ্গোপাড়া হাটে এক বিরাট কৃষক-মৎস্যজীবী সমাবেশে কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খানও উপস্থিত ছিলেন। আরেকদিন উপজেলা প্রশাসন ঘেরাও কর্মসূচিতে প্রয়াত প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ মনিরুজ্জামান এসেছিলেন। বিল কালাইয়ে দুর্বার আন্দোলনের মুখে অবৈধ ইজারা বাতিল করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের দখল প্রতিষ্ঠার ঘটনা তৎকালীন সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। নাটোরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাতিজা গামা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (লাল পতাকা) নামের নকশালী শক্তির হাতে নিহত হয়। পরে ওই পার্টির পক্ষ থেকে প্রচারিত লিফলেটে গামাকে সমাজবিরোধী ও নারী নিপীড়ক আখ্যা দিয়ে এ ধরনের শ্রেণিশত্রু খতম চলবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। রাজশাহী নগরী ও বাগমারা উপজেলায় বিএনপি নেতা আবদুল হামিদ মরুসহ বেশ কয়েকজনকে জবাই করে হত্যা করে এই কমিউনিস্ট পার্টি। এরকম পরিস্থিতিতে নকশাল অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের সৃষ্টি সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের বিকৃত মানসিকতার পৈশাচিক বর্বরতা শুরু হয় ২০০৪ সালের মার্চে। জামায়াতুল মুজাহেদিন বাংলাদেশ- জেএমবি’র সশস্ত্র তা-বে যখন বাগমারায় প্রগতিশীল দলগুলো আত্মগোপনে। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রতিবাদে বাগমারায় প্রক্যাশে সমাবেশ ও মিছিল করে দলটি। এর পরপরই বাংলা ভাইয়ের সমস্ত কর্মকাণ্ড যে ইসলাম ধর্মের পরিপন্থি, তা ঘোষণা করে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে পত্রিকায় খোলা চিঠি পাঠান কমরেড নাসের। প্রয়োজনে বাহাসে অবতীর্ণ হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের ঠিকানাও দিয়ে দেন তিনি। ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষটির এই অমিত সাহস সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো রাজশাহীর সচেতন জনগণকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। সেনা নিয়ন্ত্রিত ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ এর আগস্ট ছাত্র বিক্ষোভে আকস্মিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা আর কারফিউ জারির পর দিশেহারা হয়ে যায় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। সেই সময়ে স্যারের কাজলার বাসাটি হয়ে উঠেছিলো তাদের আশ্রয়স্থল। ছাত্র ইউনিয়নের ৪ ছাত্রীকর্মী এবং একজন অভিভাবক দুইদিন ছিলেন সে বাসায়। ওই সময়ে রাষ্ট্রের দায়ের করা মামলাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ শিক্ষকসহ বেশ কজন ছাত্রকে আসামি করা হয়। সেসব মামলা পরিচালনার ব্যাপারে প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যাড. গোলাম আরিফ টিপুর (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌশুলী) সাথে যারা আলোচনা করেছিলেন, কমরেড নাসের ছিলেন তাঁদের একজন। মামলার আসামি, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবু সায়েম (বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ের সিপিবি নেতা) এর বাবা রাজশাহীতে এসেছেন। পুত্রচিন্তায় মুহ্যমান মানুষটিকে নাসের স্যার চমৎকারভাবে বুঝিয়েছিলেন যে, সায়েম এখন শুধু তাঁর ছেলে নয়, আমাদের সবার ছেলে, সবার ভাই, সবার বন্ধু। সায়েমের বাবা ছেলের জন্য আলাদা উকিল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেও স্যারের আশ্বাসবাণীতে সেটি বাদ দিলেন। তাঁর সে বিশ্বাস অবশ্য বৃথা যায়নি। সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেকেই পরে মুক্তি পেয়েছে। সায়েমের সাজা হয়ে যাওয়ার পর কী করতে হবে, সেটিও ঠিক করা হয়েছিলো কমরেড নাসেরের কাজলার বাসায়। কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত ছিলো, ক্ষমা না চেয়ে কৌশলে রাষ্ট্রপতির কাছে মুক্তির আবেদন জানানো হবে। সেটাই করা হয়। কমরেড নাসেরের ভাবনার একটা বড় জায়গা জুড়ে ছিলো পানি। তিনি প্রায়ই বলতেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি বেধেই যায়, তাহলে তা বাধবে পানির জন্য। তাই তিনি বাংলাদেশের ২৩০টি নদীর মধ্যে ভারত হয়ে প্রবেশ করা ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনা ও আন্দোলনে রাখার তাগিদ দিতেন বারবার। তিস্তায় পানি সংকট কিংবা ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প স্যারের ভাবনারই প্রাসঙ্গিকতা প্রকাশ করে। স্যার মনেপ্রাণে ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক তিনি ছিলেন। নিজ দেশ আর সংস্কৃতি আত্মীকরণের উজ্জ্বল উদাহরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি বিজ্ঞান ভবনের নাম প্রথম, দ্বিতীয়- এভাবে রাখার পরিবর্তে যেসব বাঙালি বিজ্ঞানী ছিলেন একাধারে দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবাদ-সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, তাঁদের নামে রাখার দাবি ছিলো তাঁর, যেমন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মেঘনাদ সাহা প্রমুখ। তিনি প্রায়ই বলতেন, চে গুয়েভারাকে চেনার সাথে সাথে আগে সূর্যসেনকে চিনতে হবে। পাশাপাশি একজন মার্কসবাদী হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদী ধ্যান-ধারণাও ছিলো সমুজ্জল। রোজাভায় সংগ্রামরত নারী কমরেডদের সংবাদগুলি তিনিই প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে এনেছেন। তাঁর বিভিন্ন লেখায় ও আলোচনায় বারবারই এসেছে প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান, মায়ানমার, এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশে দেশে নিপীড়িত মানুষগুলোর প্রতি একাত্মতার কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খুলনার পাটকলগুলো বন্ধ করে দিয়ে চরম সংকট তৈরি করা হয়েছিলো। পাটকল খুলে দেয়ার দাবিতে রাজশাহীতে বসবাসরত খুলনা-বাগেরহাটের নাগরিকদের পক্ষ থেকে একটি স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছিলো প্রধান উপদেষ্টা বরাবর। এই কাজে উৎসাহী অংশগ্রহণকারী অনুপ্রেরণা প্রদানকারী ছিলেন কমরেড নাসের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাইট শিফট্ চালু ও চার্জ-ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে ২০১৪ সালে বিরাট ছাত্র আন্দোলন। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রশাসন আর তার অনুগত ছাত্র সংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসের মুখে বানচাল হয়েছিল। দোসরা ফেব্রুয়ারি ছাত্র সমাবেশে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের বর্বর হামলার সময় হাতে গোণা কয়েকজন শিক্ষক দৌড়ে এসেছিলেন আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের কাছে। শহীদ শামসুজ্জোহার মত তারা বুক পেতে দিয়ে প্রিয় শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে মানববর্ম হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ড. মোহাম্মদ নাসের তাঁদের অন্যতম। তখন এরকম গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিলো যে, তিনিসহ আর যারা দাঁড়িয়েছেন, সকলের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে সেরকম কিছু শেষ পর্যন্ত হয়নি। নাসের স্যারের কাছে আমার ব্যক্তিগত কিছু ঋণের প্রসঙ্গ টেনে লেখা শেষ করবো। আমি এম.এ ক্লাসে পড়ার সময় ছাত্র শিবিরের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলাম। পঁচিশ দিন পর আমাকে হাসপাতাল থেকে খুলনায় বাড়িতে নেয়ার পরও স্যার বাসার ল্যান্ডফোনে আমার খবর নিতেন। শ্রদ্ধেয় কমরেড মোহাম্মদ নাসের গত হয়েছেন ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। মেধাবী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিসংখ্যানবিদ, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, লেখক, সংগঠক, সমাজসেবক, গুণী শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতা, প্রেমময় স্বামী, বন্ধুপ্রতিম পিতা- একই মানুষের মাঝে এতসব গুণাবলী সবার মাঝে থাকে না। কিন্তু কমরেড নাসেরের মধ্যে তা ছিল। আর এজন্যই তিনি স্মরণীয়, নমস্য। লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..