দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে ২০২৪ সালে সারাবিশ্বে ৭ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা টানা চার বছর ধরে বেড়েছে। দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। দুর্যোগে বাস্তুচ্যুতির বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। মূলত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এসব বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টার (আইডিএমসি) প্রকাশিত বৈশ্বিক অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত প্রতিবেদন-২০২৫-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালে দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ লাখ। এর আগের বছর (২০২৩ সালে) দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ লাখ। ওই বছরও বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল পঞ্চম। দুর্যোগ ছাড়াও দেশে গত বছর সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ২ হাজার ৮০০ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে আইডিএমসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইডিএমসি বলেছে, গত বছরের বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট বন্যায় ১৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশেষ করে সিলেট বিভাগে শুধু জুন মাসেই ৭ লাখ ২৩ হাজার জনকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূমির ওপরের অংশের পানি শোষণ করার মতো পর্যাপ্ত অবস্থা না থাকা এবং নালা ও খালে পানিপ্রবাহে বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বন্যার তীব্রতা বাড়িয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা রেকর্ড ৮ কোটি ৩৪ লাখে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা জার্মানির মোট জনসংখ্যার সমান। এই বাস্তুচ্যুতির প্রধান কারণ ছিল সংঘাত, সহিংসতা ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ। অপরদিকে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে সারাবিশ্বে সংঘাত ও সহিংসতার কারণে ৭ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশেষ করে সুদান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, গাজা, লেবানন ও ইউক্রেনের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের ফলে ১১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা একক দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সংঘাতে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এবং প্যারামিলিটারি র্যা পিড সাপোর্ট ফোর্সেস জড়িত। এই সংঘাতের ফলে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যসেবা সংকট ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে জামজাম শরণার্থী শিবিরে পরিস্থিতি ভয়াবহ, যেখানে প্রতি দুই ঘণ্টায় একটি শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার অভাবে এই শিবিরে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও দাবানলে ২০২৪ সালে ৪৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন নতুন বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, প্রবল বর্ষণ ও বন্যায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দক্ষিণ সুদানে প্রবল বৃষ্টিপাত এবং লেক ভিক্টোরিয়ার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাপক বন্যা দেখা দেয়। এই বন্যায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং ৬৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। বিশেষ করে সাড অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যেমন আনুয়াক, দিনকা, শিলুক ও নুয়ের জনগণ এই বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশ্বব্যাপী বাস্তুচ্যুত শিশুদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সুদানে ৫৩ শতাংশ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি শিশু, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এই শিশুদের মধ্যে অনেকেই অপুষ্টি, রোগ ও শিক্ষার অভাবে ভুগছে। এই অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া অপর্যাপ্ত। মানবিক সহায়তা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও মানবাধিকার রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। এই সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..