তাজরীন ট্র্যাজেডির ৮ বছর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সাভারের আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টের আগুন নিভে গেছে ৮ বছর আগে। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় তাজরীন ফ্যাশনের ভয়াবহ আগুনে ১১৪ শ্রমিক জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান। আর জীবন বাঁচাতে কারখানার জানালা ভেঙে লাফিয়ে পড়ে এবং বিভিন্নভাবে আহত হন আরও অন্তত ৩ শতাধিক শ্রমিক। যাদের বেশিরভাগই পঙ্গুত্ব নিয়ে এখন দিন কাটাচ্ছেন। শত শত শ্রমিকের স্বপ্ন ভস্ম হয়েছে তাজরীনের আগুনে। কিন্তু সেই পোড়া দাগ সেই দগদগে ক্ষত এখনো কমবেশি লেপ্টে আছে আহতদের শরীরে। এ দিনটি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে একটি ভয়াবহ স্মৃতির দিন। এটি ইতিহাসে কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। সেদিনের আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে শত শত শ্রমিকের বাঁচার আকুতি আর কান্না নাড়া দিয়েছিলো গোটা বিশ্বকে। নিশ্চিন্তপুর এলাকায় এখনো বেশকিছু শ্রমিক সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি। যথাযথ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু করাতে পারছেন না। অনেকে মানবেতর জীবনও যাপন করছেন। দুঃখের বিষয়, তাজরীন ট্র্যাজেডির ৮ বছর পার হলেও এখনো দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি। গত কয়েক বছরে শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে কারখানায় শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা না থাকা। বিগত কয়েক বছর ধরে সংঘটিত এমন অসংখ্য ঘটনায় শত শত শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন। কারখানায় কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক লাশ হয়ে ফিরছেন। কখনও আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন, কখনও হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে পদপিষ্ট হচ্ছেন আবার কখনওবা মারা যাচ্ছেন ভবন ধসে। এভাবে শ্রমিকদের জীবন বিপন্ন করা একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পর দেশজুড়ে তোলপাড় হয়। লোক দেখানোর জন্য তদন্ত কমিটি হলেও এত বড় বড় হত্যাকাণ্ডের জন্য কারও শাস্তি হয় না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মালিকদের ‘সচেতন অবহেলার’ জন্যই এসব দুর্ঘটনা ঘটে। দেশে চালু হয়েছে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরও মালিকদের যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ কাজ করছে। এসব সংগঠনের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে মালিকরা প্রতিনিয়ত রেহাই পাচ্ছেন। অসংখ্য শ্রমিকের প্রাণহানির পরও দায়ী মালিকদের বাঁচানোর জন্য সরকার পর্যন্ত সদাতৎপর। শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত তাজরীন ফ্যাশনের মালিক দেলোয়ার এখন জামিনে ছাড়া পেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সরকার নিজেকে শ্রমিকবান্ধব বললেও তাজরীনের মালিক দেলোয়ারের শাস্তির আওতার বাইরে থাকাই প্রমাণ করে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে সরকার আন্তরিক না। তাজরীন গার্মেন্টসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর দাবি ছিল মালিককে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখী করার। কিন্তু তা হয়নি, বরং তাকে বাঁচানোর জন্য সরকারের তরফ থেকেই নাটক সাজানো হয়েছিল। তাজরীনের মালিককে ছেড়ে দেয়ার ফলে অন্য মালিকরাও শ্রমিকদের নিরাপত্তায় যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ার সুযোগ পায়। আর এর ফলেই পরবর্তীতে ঘটেছে এমন আরো অনেক দুর্ঘটনা। এসবকে দুর্ঘটনা বলার কোনো সুযোগ নেই, বরং বলা উচিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বিচারহীনতার সুযোগে একের পর এক শ্রমিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। মালিকদের মুনাফার লোভের কারণে শ্রমিকরা কখনো আগুনে পুড়ে, কখনো ভবনচাপা পড়ে নির্মমভাবে মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। তাজরীনে জেনেশুনে শ্রমিকদের হত্যা করা হয়েছে। কারণ, প্রথমত ভবনটির নির্মাণ কৌশলে সমস্যা ছিল। দ্বিতীয়ত, ভবনটিতে ফাটল দেখা দিয়েছিল এবং সেখানে কাজ করাও ছিল বিপজ্জনক। তবু শ্রমিকদের রীতিমতো মাইকিং করে, লাঠির ভয় দেখিয়ে, পুরো মাসের বেতন কেটে নেয়ার হুমকি দিয়ে সেদিন কারখানায় কাজ করতে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। ফলে এত মর্মস্পর্শী একটি ঘটনা ঘটেছে। তাদের গার্মেন্টস কারখানায় হত্যাকাণ্ড সংঘটনের জন্য তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়নি। গার্মেন্টস শ্রমিকরা সঙ্গতভাবেই দাবি করছেন, একজন মানুষকে খুন করার জন্য যদি কোনো ব্যক্তির ফাঁসির আদেশ হয়, তাহলে চারশ মানুষকে খুন করার জন্য তো ওই ব্যক্তির চারশ বার ফাঁসি হওয়া উচিত। গার্মেন্টস কারখানাগুলো তিনতলা বা চারতলার বেশি হওয়া উচিত নয়। হলেও সেখানে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেয়া, নূন্যতম মজুরি আট হাজার টাকা করা, কাজের পরিবেশ উন্নত করা এবং সর্বোপরি শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা দেয়া জরুরি। পাশাপাশি গার্মেন্টস পল্লী তৈরি করতে হবে, যেখানে শ্রমিকদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..