কমরেড হেনরি অ্যালেগ

ঋদ্ধ অনিন্দ্য গাঙ্গুলী :

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

হেনরি অ্যালেগ। নামটা চেনা লাগলেও চট করে ধরে ফেলা কঠিন। সেটা যেমন নানাভাবেই আমাদের সাথে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ছল-চাতুরির কারণে, আবার তেমনই এই মানুষটির অসম্ভব প্রচারবিমুখ এক জীবনের দরুনও বলা যেতে পারে। হেনরি অ্যালেগের সবথেকে বড় পরিচয়, তিনি একজন সাংবাদিক। সাংবাদিক শুনলে ঠিক যেমনটি মনে হয়, দেখতে-শুনতে তেমনটি না হলেও এই মানুষটি সম্ভবত ইতিহাসের সবথেকে সফল এবং কর্তব্যপরায়ণ সাংবাদিকদের একজন। অবশ্য, জীবনভর অ্যালেগের করে যাওয়া সাংবাদিকতার চর্চাটি আপাতদৃষ্টিতে কতটা সাংবাদিকতা আর কতটা সংগ্রাম তা বিচার করা কঠিন হতে পারে। কারণ “সংগ্রাম” আর “সাংবাদিকতা”- দু’টি শব্দকে তিনি আলাদা করে দেখেননি কখনোই। ১৯২১ সালে লন্ডনের একটি শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেয়া হেনরি আমৃত্যু লড়াই করেছেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে, গণমানুষের মুক্তির পক্ষে। প্যারিসে বেড়ে উঠলেও বুকের ভেতর লেখালেখির স্বপ্ন নিয়ে অ্যালজেরিয়ায় পাড়ি জমান ১৯৩৯ সালে। সে সময় অ্যালজেরিয়ার মানুষ ফরাসি উপনিবেশবাদের অধীনস্ত এবং ভয়ঙ্করভাবে নিপীড়িত। সারা দেশজুড়ে সংঘবদ্ধ হচ্ছে মুক্তিকামী মানুষ। হাওয়ায় ভাসছে দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের সম্ভাবনা আর তার প্রস্তুতির সুর। গণমানুষের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা আর তাদের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি প্রবল সংহতি অনুভব করতে থাকেন অ্যালেগ। দ্রুতই জড়িয়ে পড়েন অ্যালজেরিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে। মুক্তিসংগ্রামকে তরান্বিত করতে মানুষকে সংগঠিত করার চেষ্টায় নামেন। তবে তাঁর বুকের ভেতর লালন করা লেখালেখির অপার ইচ্ছাকে তিনি এই সময়কালে দমিয়ে রাখেননি। হেনরি অ্যালেগের কলম চলতে থাকে। নিজের কাক্সিক্ষত পেশা সাংবাদিকতায় লেগে পড়েন তিনি। কলমই হয়ে ওঠে অ্যালেগের প্রধানতম হাতিয়ার। লিখে চলেন তিনি। তাঁর লেখা দ্রুতই মনোযোগ কাড়ে সমগ্র অ্যালজেরিয়ায় মুক্তিকামী মানুষের। ১৯৫১ সালে হেনরি অ্যালেগ “অ্যালজার রিপাবলিক”-এর সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ফরাসি ভাষার অ্যালজেরিয়ান এই জাতীয় দৈনিকটি সে সময় ছিলো হাতে গোনা অল্প কয়েকটি সংবাদপত্রের একটি, যারা অ্যালজেরিয়ায় ফরাসি উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখতো। খুব স্বাভাবিকভাবেই অ্যালজেরিয়ায় মুক্তিসংগ্রাম যখন তুঙ্গে, ঠিক সে মুহূর্তে পত্রিকাটির প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। তবে থেমে থাকেন না অ্যালেগ। লিখে চলেন ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা এল’হিউম্যানাইট-এ। রোজ আরো বেশি করে গণমানুষের পত্রিকার পাতায় এক ভরসাস্থল হয়ে ওঠেন তিনি। একইসঙ্গে শাসকদের বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তির নাম হয়ে ওঠেন হেনরি অ্যালেগ। ঠিক এরকম একটি সময়ে, ১৯৫৫ সালে হঠাৎই একদিন তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। বলা বাহুল্য, অ্যালেগকে গুম করে ফেলা হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা। ১৯৫৭ সালের ১২ জুন সহযোদ্ধা মরিস অডিনসহ তাঁকে গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। অ্যালেগ আর অডিনকে গ্রেফতার করতে আনা হয়েছিলো সে সময়কার কুখ্যাত “দশম প্যারাশ্যুট ডিভিশন”-এর এক প্লাটুন সৈনিককে। ১৯৫৬ সালে ফরাসি সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠা করা এই বাহিনী ছিলো আকাশপথে বিশেষ পারদর্শী। সর্বোচ্চ ট্রেনিং নিশ্চিত করে এদের বানানো হয়েছিলো অ্যালজেরিয়ানদের মুক্তিসংগ্রামকে রুখে দেয়ার উদ্দেশ্যে। নিরীহ দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করতে এই বাহিনীর আগমন বিস্মিত করেছিলো সবাইকে। কারাগারে অকথ্য নির্যাতনের স্বীকার হন হেনরি অ্যালেগ এবং মরিস অডিন। নির্যাতনের এক পর্যায়ে অডিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পুলিশ রেকর্ডে এই মৃত্যুকে “পলায়নকালে নিহত” বলে লেখা হয়। এদিকে অডিনের মৃত্যুর পরপরই কারাগারের একটি ঘরে আলাদা করে ফেলা হয় অ্যালেগকে। অ্যালেগের বুকে তখন বন্ধু হারানোর শোক, বিষণ্ন মন, কিন্তু প্রচণ্ড ক্রোধ তার শরীরজুড়ে। অ্যালেগের ওপর অত্যাচারের মাত্রা কমে না। কিন্তু পুলিশের ওপর কড়া নির্দেশ ছিলো, কোনোভাবেই যেন তিনি মারা না যান। কারণ ধারণা করা হতো, অ্যালেগের পেট থেকে বেরিয়ে আসবে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নাম-ঠিকানা আর তথ্য। কিন্তু অ্যালেগ অটল। কখনো তাঁকে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়, কখনো মাথা চেপে ধরে রাখা হয় বরফশীতল জলে অথবা কখনো চলে ওয়াটার বোর্ডিং নামের ভয়ংকর মধ্যযুগীয় নিপীড়ন। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতেন অ্যালেগ, কিন্তু মুখ ফুটে নাম বলতেন না সহযোদ্ধাদের। এ অবস্থায় কয়েদিদের অধিকারগুলো থেকেও বঞ্চিত করা হতো তাঁকে। কারাগারের ডাক্তারদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো, তারা কেউ দেখতে আসতে পারবেন না অ্যালেগকে। এই পন্থায় কাজ না হলে অন্য পন্থা ভাবতে শুরু করে পুলিশ। হুমকি দেয়া হয় তাঁর স্ত্রী, পরিবারকে। কিন্তু অ্যালেগ তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েন না। কারাগারে বসেই অ্যালেগ লিখতে থাকেন। তাঁর কারা-অভিজ্ঞতা ও মুক্তিসংগ্রামের নানা ঘটনা তিনি জেলে বসেই লিখতেন। তাঁর কারাগারের লেখাগুলো একটি বই আকারে ছাপা হয় ১৯৫৮ সালে। “দ্যা কোশ্চেন” নামের এ বইটি প্রকাশ করে লা’মিনিট নামের একটি ফরাসি বামপন্থি প্রকাশনা সংস্থা। ১১২ পৃষ্ঠার এই বইটি দ্রুতই ফ্রান্স আর অ্যালজেরিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বইটি অনুবাদ হয় বহু ভাষায়। অ্যালজেরিয়ার গণমানুষের ওপর ফরাসি বাহিনীর পৈশাচিক অত্যাচারের নানা বিবরণ জানতে শুরু করে বিশ্ববাসী। আন্দোলন, সংহতি দানা বাঁধতে থাকে সমগ্র বিশ্বব্যাপী। স্বাভাবিকভাবেই বইটি ফরাসি শাসকদের প্রতি বড় ধরনের হুমকির কারণ হয়ে ওঠে, এবং বইটির প্রকাশ বন্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ বই নিয়ে সব রকমের আলাপ নিষিদ্ধ করা হয় ফরাসি গণমাধ্যমগুলোতেও। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেকখানি। ইতোমধ্যেই ষাট হাজার কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছে “দ্যা কোশ্চেন”, বিক্রির অপেক্ষায় দোকানিদের হাতে হাতে আরো এক লক্ষ ত্রিশ হাজার কপি। কাজেই এই বইয়ের কাটতি বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় ফরাসি সরকারের পক্ষে। সমগ্র ফ্রান্স আর অ্যালজেরিয়া জুড়ে যেখানেই বিক্ষোভ আর আন্দোলন, সেখানেই কথায়, স্লোগানে, বক্তৃতায় উঠে আসে বইটির কথা। মুক্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করতে বইটি ব্যাপক ভূমিকা রাখে দেশজুড়ে। ১৯৬২’তে স্বাধীন হয় অ্যালজেরিয়া। বীরের বেশে নিজের বিপ্লবভূমিতে ফিরে যান হেনরি অ্যালেগ। গণমানুষ তাঁকে বরণ করে নেন মুক্তির নায়ক হিসেবে। ১৯৬৫ সালে ফ্রান্সে ফিরে এসে সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। জীবনভর কলম হাতে যুদ্ধ করে যাওয়া এই অকুতোভয় সংগ্রামীর জীবনাবসান ঘটে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই, ৯১ বছর বয়েসে, প্যারিসে। লেখক : সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ছাত্র ইউনিয়ন, জাবি সংসদ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..