একুশ শতকের মতাদর্শ-রাজনীতি ও সংগঠন

ডা. মনোজ দাশ :

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মতাদর্শ ছাড়া নির্দিষ্ট সামাজিক ব্যবস্থা বজায় রাখা অথবা পরিবর্তনের কাজ এগিয়ে নেয়া যায় না। প্রত্যেকটা শ্রেণির মতাদর্শ পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক পরিবেশ আর বিশেষ নির্দিষ্ট দ্বন্দ্ব বিরোধগুলিকে প্রতিফলিত করে এবং তুলে ধরে নিজস্ব অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক করণীয় কাজগুলোকে। সমাজের সামনে উপস্থিত সামাজিক সমস্যাবলি মোকাবিলা করার জন্য বিজ্ঞানসম্মত মতাদর্শ থাকা দরকার। মার্কসবাদ হচ্ছে বাস্তবতা সম্পর্কে যথার্থ এবং বিষয়গত জ্ঞানের আলোকে স্থাপিত বিজ্ঞানসম্মত মতাদর্শ। একুশ শতকে সৃষ্টিশীলভাবে এই মতাদর্শের ভিত্তিতেই মাকর্সবাদীদের রাজনৈতিক লাইন ঠিক করতে হবে এবং সেটা বাস্তবায়নের জন্য উপযোগী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। সমাজতন্ত্রের কিছু মডেলের বিপর্যয়ের পরে বুর্জোয়া সমাজতাত্ত্বিকরা সমাজতন্ত্রের মার্কসবাদী তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করতে চেষ্টা করেন। আর একুশ শতকে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সারা দুনিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে বা নেই এমন কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে কর্মরত মার্কসবাদীদের মধ্যে সংস্কারবাদ, একলেকটিকাল, গোঁড়া এবং সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনী– এই চার ধরনের মতাদর্শিক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। সংস্কারবাদীরাও সমাজতন্ত্র চায়। কিন্তু মার্কসীয় চিন্তা-পদ্ধতি অনুযায়ী নয়। এদের মধ্যে অনেকেই সৎভাবে সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন। তারা সমাজতন্ত্র নিয়ে নানা ধরনের সংস্কারবাদী ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। বার্নেস্টাইনের সংশোধনবাদ ও কেইনসের অর্থনৈতিক তত্ত্ব ‘এসব ধারণার’ তত্ত্বগত উৎস ও উপাদান। প্রথমত, বৈচিত্র্য ও গণতন্ত্রের নামে নানাবিধ ভাবনা ও ধারা এখানে একত্রিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে বিপ্লবী ধরনের কোনো গণতন্ত্র নয়, বুর্জোয়া ধরনের বহুদলীয় ব্যবস্থা ও সরকার পরিবর্তনকে সমর্থন করে তারা। তৃতীয়ত তারা মনে করেন উৎপাদনের উৎসের পুঁজিবাদী ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তন না ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব।...এদের একটি বড় অংশ শ্রেণিসংগ্রাম ও বিপ্লব এড়িয়ে সংস্কার ও স্বতঃস্ফূর্ততায় পুঁজিবাদের সমাজতন্ত্রে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেন। মূলগতভাবে এদের দৃষ্টিভঙ্গি সামাজিক সংস্কারবাদ থেকে আলাদা কিছু নয়। মার্কসবাদে নতুন অবদান রেখেছেন বলে উল্লসিত এ ধরনের তাত্ত্বিকদের একটি অংশ মনে করেন একুশ শতকে কমিউনিস্ট পার্টি আর ভাবাদর্শের পার্টি নয়। তারা ভাবাদর্শগত বহুত্ববাদ, যাকে অন্যভাবে বলা যায় ভাবাদর্শহীন পার্টির ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। এসব মার্কসবাদীদের মধ্যে অনেকেই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এঙ্গেলসকে মার্কসের প্রতিপক্ষ, বা এঙ্গেলসের প্রশ্নাতীত সততা থাকা সত্ত্বেও, মার্কস ও এঙ্গেলসের চিন্তা মৌলিকভাবে অভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও এঙ্গেলসকে ‘সম্পাদনার মাধ্যমে মার্কসের বিকৃতিসাধক’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। সংস্কারবাদীদের এটা একটা পুরোনো অভ্যাস। একুশ শতকে এটা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের এটার বিরোধিতা করতে হবে। মার্কস থেকে লেনিনকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটি প্রবণতাও আছে এদের কারো কারো মধ্যে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হচ্ছে পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্কসের মৌলিক ধারণাকে লেনিন আরো শক্তিশালী করেছেন। স্তালিনের ঐতিহাসিক ইতিবাচক ভূমিকাকে যেকোনো মূল্যে এরা ছোট করতে চায়। এই প্রবণতারও বিরোধিতা আমাদের করতে হবে। স্তালিন ফেরেস্তা ছিলেন না। তাঁর ভুলগুলিকে যেভাবে দেখানো হয়, সেটা অনৈতিহাসিক। সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে মাও সেতুং-এর বিরাট অবদান থাকার পরও এদের অধিকাংশই মাও সেতুংকে সম্পূর্ণ বর্জন করার পক্ষপাতি। সংস্কারবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে একুশ শতকে বিপ্লব তো দূরের কথা, যেসব দেশের পার্টির মধ্যে সংস্কারবাদীরা তাদের অবস্থান মজবুত করে ফেলেছে সেসব দেশে বিপ্লবী পার্টি গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সমাজতন্ত্রের কিছু মডেলের বিপর্যয়ের পর একুশ শতকে মার্কসবাদী পরিচয়ে, কিন্তু দ্বান্দ্বিকতাকে পাশ কাটিয়ে কিছু একাডেমিসিয়ান অধ্যাপক বুর্জোয়া ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মিলিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থার উদ্ভবের তত্ত্ব হাজির করেন। দর্শনে এই ধারার নাম একলেকটিকস। বিদ্যমান দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করে যান্ত্রিকভাবে, নীতিগত সঙ্গতিবিধান ছাড়াই পরস্পরবিরোধী তত্ত্ব ও ভাবনাকে মিলিয়ে ফেলবার তত্ত্ব ও প্রয়োগশৈলীই একলেকটিকাল মার্কসবাদ হিসেবে বিভিন্ন দেশের পার্টিতে আত্মপ্রকাশ করছে। এই ধারার সমাজতন্ত্রীরা মনে করেন আমাদের সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত মালিকানার অনুপাত নিয়ে চিন্তিত না হয়ে বরং ভাবা প্রয়োজন যে, উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পাচ্ছে কি-না। এ ধরনের উন্নয়নের তত্ত্ব রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও শ্রম অনুযায়ী বণ্টনের মার্কসীয় ধারণার সাথে যুক্ত নয়। লক্ষ্য হিসেবে এই চিন্তা গ্রহণ করার কোনো সুযোগ কমিউনিস্ট পার্টিগুলির নেই। এই একুশ শতকেও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে একদল গোঁড়া অনুসারীও আছেন। এরা একপেশেভাবে মার্কসবাদের সর্বজনীন সত্যের ওপর জোর দেন, সুনির্দিষ্ট বাস্তবতাকে অবহেলা করেন। প্রথমত এই গোঁড়ামি হচ্ছে একপেশে ছকে বাঁধা চিন্তা, যা অধিবিদ্যাগতভাবে পরিবর্তনমান অবস্থা ও সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিচার না করে অন্ধ বিশ্বাসে তত্ত্বের স্রফে পুনরাবৃত্তি করে। এজন্য জীবনের সঙ্গে ও জনসাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত গোঁড়ামির মধ্যে অদ্বান্দ্বিকভাবে ভাবার একটা প্রবণতাও থাকে। সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে স্তালিনের বিরাট ঐতিহাসিক অবদান আছে। এটাকে শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করতে হবে। কিন্তু গোঁড়া অনুসারীরা অদ্বান্দ্বিকভাবে মনে করেন, স্তালিনের আমলে কোনো ত্রুটিই হয়নি, ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় আসার পরেই কেবলমাত্র সব বিপর্যয়ের শর্ত তৈরি হয়েছিল। মাও-এর কোনো ভুল নাই। যদিও সাধারণভাবে নীতি ও মর্মবস্তুর দিক দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছিল সঠিক পদক্ষেপ, কিন্তু সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সমর্থনে গোঁড়া মার্কসবাদীদের সব বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত এই গোঁড়া মার্কসবাদের কিছু ইতিবাচক তাৎপর্যও আছে। এই ইতিবাচক তাৎপর্য প্রকাশিত হয় নয়া উদারবাদ, সংস্কারবাদ ও একলেকটিক্যাল মার্কসবাদের মতো ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে তাদের তীব্র সমালোচনার মধ্যে। সংশোধনবাদ, একলেকটিকাল মার্কসবাদ ও গোঁড়ামি কোনোটিই নয়, একুশ শতকে সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে আমাদের মার্কসবাদের সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। প্রথমত একুশ শতকে মার্কসবাদের সৃষ্টিশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে তাদের রণনীতিকে আরো সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার দরকার হতে পারে। কিন্তু মূল কাজ হবে গৃহীত রণনীতিকে খণ্ডিতভাবে নয়, সামগ্রিকভাবে অনুসরণ করা। তার একটি অংশ মানবো, কিন্তু অন্য অংশ মানবো না, সেটা হবে না। কমিউনিস্ট পার্টির সব পর্যায়ের নেতৃত্বকে রণনীতির সবটাই মানতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি দেশের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার সাথে মার্কসবাদের সর্বজনীন সত্যকে দ্বান্দ্বিকভাবে সমন্বিত করে সৃষ্টিশীলভাবে সমাজতন্ত্র নির্মাণের একটি মার্কসীয় কাঠামো আমাদের তৈরি করতে হবে। একুশ শতাব্দিতে সমাজতন্ত্র কখনোই কোনো কিছুর কার্বন কপি হবে না। আবার তা অতীতের সব কিছুকে নাকচ করে দেবে না। তার সাফল্যগুলিকে তা ধারণ করবে। চূড়ান্ত ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ও রূপান্তর অনিবার্য হলেও একুশ শতকে এই পর্ব বিভিন্ন উপপর্বের মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মাধ্যমে জয়ী হওয়ার অবস্থা তৈরি হতে পারে। এজন্য রণনীতিকে সফল করার জন্য প্রয়োজন হবে সংগতিপূর্ণ রণকৌশলের। রণকৌশল হবে রণনীতিরই একটি অংশ এবং তার অধীন হয়ে তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ করাই হবে এর কাজ। নেতৃত্বের একটি অংশ রণনীতি-রণকৌশলকে সামগ্রিকভাবে না দেখে নিজের মতো করে চলতে অভ্যস্ত। আংশিকভাবে নয়, গৃহীত রণনীতি-রণকৌশলের সামগ্রিক মূল্যায়ন ও লক্ষ্য অনুযায়ী সবাইকে চলতে হবে। কমিউনিস্ট, বামপন্থি, শ্রমজীবী এবং সমস্ত প্রগতিশীল অংশের কর্তব্য হল নিজ নিজ দেশে শ্রেণিসংগ্রামকে তীব্রতর করার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রণকৌশলের মাধ্যমে রণনীতির বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা। সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধূ প্রয়োজনীয় মতাদর্শিক-রাজনৈতিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেই হবে না। একুশ শতকের নতুন বাস্তবতায় আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করার জন্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। প্রথমত, একুশ শতকেও আমাদের জন্য দিকনির্দেশকারী মতাদর্শ হবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সর্বজনীন সত্যের সাথে সঙ্গতি রেখে উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল উপায়ে ‘মূর্ত অবস্থাসমূহের মূর্ত বিশ্লেষণের’ মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় তত্ত্বও (যথার্থ রণনীতি-রণকৌশল-সমাজতন্ত্র নির্মাণের মার্কসীয় কাঠামো) গড়ে তুলতে হবে। মার্কসবাদকে পথ নির্দেশক হিসেবে গণ্য করার অর্থ মার্কসবাদের সর্বজনীন নীতিগুলির সাথে স্থানীয় বাস্তবতাকে মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে বিচার করা, নতুন অভিজ্ঞতাগুলিকে একত্রিত করা। মার্কসবাদ একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যা অন্যান্য ভাবনার সাথে আদান প্রদানে বিশ্বাসী। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মার্কসবাদও বিকশিত হয় এবং স্থায়ী তত্ত্বগত দৃঢ়তা নিয়ে বাস্তব জীবনে পথ নির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে থাকে। দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে ‘পার্টি’ নামক প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক হাতিয়ার আমাদের গড়ে তুলতে হবে। মার্কসবাদ লেনিনবাদের বিশ্বজনীন সত্যের সাথে নিজ দেশে বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগের সমন্বয়ে সক্ষম একটি বিপ্লবী পার্টি অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির ভিত্তিতে এমন একটা পার্টিকে গড়ে তুলতে হবে যা প্রতিনিয়ত জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে, যাতে জনগণ নিজেরাই নতুন সমাজ গড়ার সংগ্রামে এগিয়ে আসে। ‘আমরাই সঠিক’- এই ভাবনা নিয়ে শুধু ওপর থেকে কাজ চালাবার চিন্তা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। আমলাতান্ত্রিকতা পার্টি কর্মী ও জনগণের কর্মোদ্যোগকে ব্যাহত করে। তাই আমাদের গণতান্ত্রিকতা ও কেন্দ্রিকতার দ্বান্দ্বিক আঙ্গিক ঐক্যের যথার্থ প্রয়োগের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে হবে। কেন্দ্রিকতা দু’প্রকার। জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত সমস্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী বিশ্ববীক্ষাকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠে আদর্শগত কেন্দ্রিকতা। আদর্শগত কেন্দ্রিকতা হচ্ছে, পার্টিসদস্যদের মধ্যে যে বুর্জোয়া চিন্তা-চেতনা থাকে, তাকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তা-চেতনা দিয়ে নাকচ করে জীবনের সব ক্ষেত্রে শ্রমজীবী শ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা। আর সংগঠন আন্দোলনের সব দিক ঘিরে গড়ে ওঠে সাংগঠনিক কেন্দ্রিকতা। শৃঙ্খলা-যৌথতা-কাজের ঐক্য-লক্ষ্যের ঐক্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই সাংগঠনিক কেন্দ্রিকতা গড়ে ওঠে। কেবলমাত্র আদর্শগত কেন্দ্রিকতার ওপর ভিত্তি করে সাংগঠনিক কেন্দ্রিকতা গড়ে উঠলেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সংগঠনের মধ্যে কাজ করতে পারে। বিপ্লবী কর্মী ছাড়া একুশ শতকে এই কাজ অগ্রসর করা যাবে না। এমন বিপ্লবী কর্মী আমাদের থাকতে হবে যারা সাংগঠনিক-রাজনৈতিক-বৈষয়িক ও টেকনিক্যালভাবে সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম গড়ে তোলার নানা জটিল সমস্যা নিয়ে কাজ করতে উপযুক্ত। পার্টি সদস্যদের উচ্চ নৈতিকতার অধিকারী হতে হবে। যারা পার্টি সদস্য তাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে যে নতুন সমাজের জন্য তারা সংগ্রাম করছে তার আদর্শ ও মূল্যবোধ অমর্যাদার মধ্যে না পড়ে। একুশ শতকের এই জটিল জগতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে আমাদের। যৌথভাবে চিন্তার নির্মাণ ও সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। গণসংগঠন ও নাগরিক সংগঠনগুলোকেও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গণসংগঠনগুলো নিছক পার্টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যম নয়। আবার তথাকথিত স্বাধীন সংগঠনও নয়। এসব সংগঠন যাতে তাদের নিজস্ব সংগ্রামের কর্মসূচি বিকশিত করতে পারে সেজন্য এসব আন্দোলনের পরিধি বাড়াতে হবে। একই সাথে গণসংগঠনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণও থাকতে হবে। সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে জয়ী হওয়ার জন্য সবচাইতে বেশিসংখ্যক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। শুধু শ্রমজীবী নয়, বৈষম্যের শিকার সকল সামাজিক গোষ্ঠীর স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। প্রাণ-প্রকৃতি-পৃথিবীকে বাঁচাতে পরিবেশ কর্মীদের সাথে একযোগে কাজ করতে হবে। সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে মার্কসবাদ মানবজাতিকে দিয়েছে এক মহান মতাদর্শিক গাইডলাইন। প্রতিক্রিয়াশীল ও ডানপন্থিরা তাকে ধ্বংস করতে চায়। সংশোধনবাদীরা সুক্ষ্ম মারপ্যাঁচে তাকে সংস্কারবাদের মধ্যে নিক্ষেপ করে। তারা ভাবাদর্শগত বহুত্ববাদের নামে ভাবাদর্শহীন পার্টির ধারণা সামনে নিয়ে আসেন। গোঁড়ামি ও মতান্ধতা তাদের আপ্তবাক্যের মধ্যে মার্কসবাদ ও সংগঠনের প্রাণরস শুষে নেয়। তাই একুশ শতকে সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে দরকার হবে উচ্চ মার্কসবাদী মতাদর্শিক মান, সত্যিকার উদ্ভাবনী শক্তি ও সৃজনশীলতা এবং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিমুখিনতার আলোকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির ভিত্তিতে একশিলাভূত গণভিত্তিসম্পন্ন একটি বিপ্লবী পার্টি। লেখক : সভাপতি, সিপিবি, খুলনা জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..