কোভিড-১৯ এর জিওপলিটিক্স

এম এম আকাশ :

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কোভিড-১৯ নিয়ে বিশ্বে এক নতুন ভূ-রাজনীতির উদ্ভব হয়েছে। “ভূ-রাজনীতি” বিষয়টি সকলের কাছে পরিষ্কার নয়। প্রথমে তাই তার একটি স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন প্রয়োজন। খুব সংক্ষেপে আমরা বলতে পারি, “ভূ-রাজনীতি হচ্ছে সেই রাজনীতি যা ভৌগলিক অবস্থান দ্বারা বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারিত হয়।” স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, কোভিড-১৯ হচ্ছে একটি বিশেষ মরণঘাতি ভাইরাস যা প্রাকৃতিকভাবে বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়ে প্রাণীদেহকে আশ্রয় করে পৃথিবীর চারিদিকে ছড়ায়। তদুপরি মানবদেহে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রমণ করে এবং অনেকক্ষেত্রেই অনিবার্য মৃত্যু ডেকে আনে। এটা আরো মারাত্মক এজন্য যে, এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কৃত হয়নি। তাহলে এর সঙ্গে “ভূগোল” বা “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের” যোগটা কী এবং কোথায়? প্রথমত সবাই আমরা জানি, রোগটির প্রথম উদ্ভব হয়েছিল চীনের উহান অঞ্চলে। সুতরাং চীনের ভেতরে এটা ছড়িয়েছে এবং তারপর তা পাশাপাশি অন্যত্র ছড়িয়েছে। কারণ “উহান” থেকে ওই রোগ বহনকারী চীনা ও বিদেশিরা চীন ও পৃথিবীর সর্বত্র গমনাগমন করেছেন। সেখান থেকেও আরো গমনাগমন হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সমগ্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভূ-রাজনীতির সম্পর্কটি কোথায়? আমরা জানি, সারা বিশ্ব আজ বহু মেরুতে (Multi Polar World) বিভক্ত। একটি মেরুর কেন্দ্র চীন, যে কিনা এককভাবে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং Belt and Road (BAR) উদ্যোগের মাধ্যমে সারা বিশ্বে তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। আমরা জানি বাংলাদেশেও এই প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশে এসে ৩০ বিলিয়ন ডলার নানা অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের কথা বলে গেছেন। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুতে বিশ্ব ব্যাংক এর অপরাগতাকে চীনা “সাহায্য/বিনিয়োগ” প্রতিস্থাপিত করেছে। আমাদের পাট খাতও নবায়নের জন্য চীনারা প্রস্তুত বলে জানিয়েছিল। শুধু বাংলাদেশ নয়, চীনকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, সিংহল, ইত্যাদি দেশগুলিও অগ্রসর হচ্ছে। কোথাও ফল ভাল হয়েছে, কোথাও খারাপ। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় এসব দেশ ছাড়াও আরেকটি বৃহৎ দেশ হচ্ছে ভারত। যার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক “Love and Hate” সম্পর্কের মতো। আর ভারত আমাদের বাংলাদেশের তিন দিকের সীমানাতেই বিশালাকারে অবস্থান করছে। ভৌগলিকভাবে এটাও সত্য! এই যে দক্ষিণ এশীয় ভূগোল তার ফলে আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত করে আসছে ও ভবিষ্যতেও করবে। সুতরাং একটি ভূ-রাজনীতির মধ্যেই আমরা ছিলাম। কভিড-১৯ এখানে নতুন অভিঘাত ফেলছে কি-না সেটাই ভাল করে বিচার করে দেখতে হবে। আমরা জানি, আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে “আমরা কারো শত্রু নই, সকল দেশই আমাদের বন্ধু”। আমরা হব “প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড।” আমরা কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিকতাবাদী হিসেবে বিশ্বের সকল শোষিত মানুষ ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মিত্র। তাই বিশেষভাবে চীন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ইত্যাদি সকল দক্ষিণ এশীয় দেশের জনগণই আমাদের ঘনিষ্ট বন্ধু এবং সকল দেশের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমতা ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার আকাঙ্ক্ষা আমরা পোষণ করি। সে হিসাবে আমরা এসব দেশগুলির মধ্যে যারা এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিমালা মেনে চলবেন তাদের সঙ্গে জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে, কোনো যুদ্ধজোটে না জড়িয়ে আমরা আমাদের ভূ-রাজনীতিকে পরিচালিত করবো। এখন পর্যন্ত যতদূর দেখা যায় বর্তমান সরকারের ঘোষিত কার্যকলাপ প্রকাশ্য আচরণ অনেকটা তাই। তবে সামরিক প্রশিক্ষণ ও সামরিক এক্সারসাইজের ক্ষেত্রে কখনো কখনো আমাদের সামরিক বাহিনী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারত-চীন-অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা ইত্যাদি অনেক দেশের সঙ্গেই নানা রকম সম্পর্ক অব্যাহত রেখে এসেছেন। তবে কোনো যুদ্ধজোটে সরাসরি বাংলাদেশ কখনো অংশীদার হয়নি। নিকট অতীতে কোভিড-১৯ মহামারিকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে একটি অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে আমেরিকা অভিযোগ তোলে যে, চীন এর জন্য দায়ী। পরে ইউরোপ অভিযোগ তুলেছিল যে, চীন এই অসুখের কথা যথাসময়ে জানায় নি এবং চীনের এই গোপনীয়তাই একটি অপরাধ হয়েছে, কারণ তার ফলে তারা যথাসময়ে সতর্ক হতে পারেন নি। যতদূর মনে পরে ফ্রান্স এটা জোরেশোরে বলেছিল। তবে এখন এ অভিযোগে ভাটা পড়েছে। ডঐঙ বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই মহামারির মূল কারণ প্রাকৃতিক। এর প্রসারের প্রক্রিয়াও নির্ভর করছে আশ্রয়দানকারী প্রাণীর প্রাকৃতিক সংস্পর্শের ওপর। সুতরাং যে দেশ যত ভালভাবে নিজেকে সংক্রমণকারী এজেন্টের হাত থেকে প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত রাখতে পারবে সে এ থেকে তত মুক্ত থাকবে। সে হিসেবে দেখা যাচ্ছে কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ন রাষ্ট্র হিসেবে চীন ও ভিয়েতনাম এই মহামারি দমনে সবচেয়ে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেছেন, কিউবার কথাও সবাই বলে থাকেন। সচেতন গণতান্ত্রিক জনশৃঙ্খলার মাধ্যমেও যে এই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব তা দেখিয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট শাসিত গণতান্ত্রিক রাজ্য “কেরালা”। দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলাদেশে প্রস্তুতির অভাব, জন-অসচেতনতা, অবিশ্বাস্য দুর্নীতি, অবহেলা, সরকারের নানা ব্যর্থতা, ইত্যাদি নানা কারণে এক্ষেত্রে ব্যর্থতার মাত্রা লজ্জাকরভাবে বেশি হয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার এখনো কম এবং গ্রামগুলি তুলনামূলকভাবে কম আক্রান্ত হয়েছে, এ কথাও সত্য। সুতরাং কোভিড-১৯ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং দেশীয় রাজনীতিতে দু’রকম অভিঘাতের জন্ম দিয়েছে–: প্রথমতঃ চীনের সঙ্গে চীন বিরোধী রাষ্ট্রগুলোর উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। ফলে মাঝামাঝি অবস্থানরত রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে ভূ-রাজনীতির পরিমণ্ডলে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেয়েছে। এই টানাপোড়েনে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মাঝামাঝি থাকার চেষ্টা করছে। অন্ততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বাংলাদেশ একতরফা ঝুঁকে পরেনি আর ভারত ও চীনের মধ্যে ইধষধহপব করে চলছে বলে মনে হচ্ছে। আরেক দিকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা আরোপের ক্ষমতা বেশি বলে রোগের সংক্রমণ রোধের ক্ষমতা তাদের বেশি হতে পারে এরকম কিছু সাফল্যের দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। তবে সচেতন শৃঙ্খলা বা গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা বা গণ-অংশ গ্রহণের মাধ্যমেও শৃঙ্খলা যে সম্ভব তার নিদর্শনও দেখা যাচ্ছে (দ্র: কেরালা)। তবে কোভিড-১৯ এর টিকা নিয়ে এখন একটি প্রতিযোগিতা চলবে। কে এই টিকা প্রথম আবিষ্কার করতে পারবে এবং কে তা নিয়ে ব্যবসা করবে অথবা কতটুকু জনস্বার্থে তা ব্যবহৃত হবে তার একটি “ভূ-রাজনীতি” বর্তমানে ঘনিয়ে এসেছে। তবে এটা নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি। কোভিড-১৯ আরেকটি বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, সেটি হচ্ছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটি কিভাবে পরস্পর সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলা যায়– সে দিকে দৃষ্টিপাত করা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভোগবাদী চিন্তা, উগ্র মুনাফার লোভ, ইত্যাদি পুঁজিবাদী প্রবণতাগুলি প্রাকৃতিক সংকটকে ত্বরান্বিত করছে এবং তার সঙ্গে কোভিড-১৯ এর সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষতঃ এটা দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি Pandemic এর Frequency বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাশাপাশি জলবায়ু সংকট তীব্র হচ্ছে। এই দুই এর মধ্যে সম্পর্ক থাকাটা অস্বাভাবিক নয় বলে বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন। সুতরাং সারা বিশ্বে পরিবেশবাদী আন্দোলন এক Multiclass Movement হিসেবে, সমগ্র মানবজাতির মুক্তির জন্য আন্দোলন হিসেবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এর অভিঘাত এসে লাগছে। এ ব্যাপারেও জড়তা কাটিয়ে উঠে কমিউনিস্টদের সৃজনশীল চেতনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায় যে, কোভিড-১৯ ভূ-রাজনীতিতে নতুন শক্তি সমাবেশ ও নতুন শক্তি ভারসাম্য সৃষ্টি করতে চলেছে। যুদ্ধেও আশংকাও বাড়িয়ে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের চেষ্টা করতে হবে যাতে যুদ্ধ এড়িয়ে, শান্তি বজায় রেখে, পরিবেশ বাঁচিয়ে, জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণ নিশ্চিত করে মানবমুক্তির দিকে সারা বিশ্বের কল্যাণকামী জনগণ সচেতনভাবে এগিয়ে যান। যারা মুনাফার যুপকাষ্ঠে বা ভোগবাদের লালসায় বা অধিপত্যবাদী অহংকারের পায়ে বিশ্ববাসীকে বলি দিতে চাচ্ছেন– তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..